এত সব দিক সামলিয়ে সেই সঙ্গে আনাজ, তরকারি, মাছ, দুধ, ধোবা-নাপিত সব মিটিয়ে মদ খাওয়ার পয়সা সংগ্রহ করাই কঠিন হয়ে পড়েছে। মহিমাময় চিন্তা করেন, চিকিৎসা করে জয়দেবের যদি নেশা ছুটে যায় তা হলে আমিও চিকিৎসা করে মদ খাওয়া ছাড়ব।
সুতরাং সমস্ত ব্যস্ততার মধ্যেও শুধু বন্ধুত্বের খাতিরে নয়, অনেকটা কৌতূহলবশতও জয়দেবকে এক সন্ধ্যায় দেখতে গেলেন মহিমাময়। তখন জয়দেবের সেবাসদনে বাস বারোদিন হয়েছে, আর দিন তিনেক বাকি আছে মুক্তির।
সন্ধ্যা সাড়ে সাতটা নাগাদ সেবাসদনের দরজায় পৌঁছালেন মহিমাময়।
দরজার বাইরে ড্রেনের একপাশে একটা কালভার্টের উপরে সেবাসদনের বড়বাবু কুঞ্জলাল বসে রয়েছেন। তিনি অতি ঘন ঘন বিষম হেঁচকি তুলছেন। তার আশেপাশে সেবাসদনের আরও দু-চারজন কর্মচারী ইতস্তত বসে বা দাঁড়িয়ে। তারাও ক্রমাগত হেঁচকি তুলছে।
সমস্ত ব্যাপারটা দেখে কেমন খটকা লাগল মহিমাময়ের। অবস্থাটা খুব জটিল মনে হল তার।
তিনি গেটের দিকে এগোলেন, দেখলেন সেদিনের সেই উর্দিপরা দারোয়ান গেটের হাতল ধরে কোনও রকমে বহু কষ্টে দাঁড়িয়ে আছে। এ লোকটাও ঘন ঘন হেঁচকি তুলছে। প্রত্যেকবার হেঁচকি তোলার ফাঁকে ওরে বাবা, মরে গেলাম, বাবারে এই সব কাতরোক্তি করছে।
মহিমাময় ভয়ে ভয়ে অতি সন্তর্পণে সেবাসদনের ভিতরে প্রবেশ করলেন। গাড়িবারান্দায় এবং ভেতরের প্যাসেজে মিটমিটে পঁচিশ পাওয়ারের আলো জ্বলছে। সেই মৃদু আলোয় মহিমাময় দেখতে পেলেন গাড়িবারান্দার নীচে এবং উপরে দোতলায় বেশ কয়েকজন দাঁড়িয়ে রয়েছে, তাদের মধ্যে মহিলাও রয়েছে, সেদিনের মমতাজ দেবীও রয়েছেন মনে হল।
এখানেও সকলের মধ্যে সেই একই বৈশিষ্ট্য, সবাই ভয়াবহ হেঁচকি তুলছে। সমবেত হিক্কা ধ্বনিতে চারদিক গুঞ্জরিত হচ্ছে। ফাঁকে ফাঁকে যথারীতি কেউ কেউ বিকট সব উক্তি করছে। মহিমাময় সবচেয়ে সামনের লোকটিকে জয়দেবের কথা জিজ্ঞাসা করলেন। লোকটির পরনে ডোরাকাটা স্লিপিং সুট, নিশ্চয় এখানকার রোগী। একটা বিশাল হেঁচকিকে গলাধঃকরণ করে লোকটি বলল, জয়দেববাবুকে নিতে এসেছেন?
এই প্রশ্নে বিস্মিত হয়ে মহিমাময় বললেন, নিয়ে যাব কেন? জয়দেব ভাল হয়ে গেছে? ওর তো এখনও তিন দিন বাকি আছে!
আর একটি হেঁচকি তুলে লোকটি বলল, আরও তিন দিন? সর্বনাশ! সেবাসদন যে উঠে যাবে।
আর কথা না বাড়িয়ে মহিমাময় আগের দিনের দেখামতো কোহল সেকশনের দিকে পা বাড়ালেন। নিশ্চয়ই ওখানে জয়দেবের দেখা পাওয়া যাবে।
কোহল সেকশনে জয়দেবের দেখা পাওয়া গেল। ছোট ঘরের মধ্যে একটা খাট। তারই একটির প্রান্তে বালিশে হেলান দিয়ে জয়দেব বসে রয়েছেন। রীতিমতো গুম হয়ে। এবং আশ্চর্যের বিষয়, খাটের অন্য প্রান্তে ডাক্তার মল্লিকও বসে রয়েছেন। বড় বড় গোল চশমার কাঁচের নীচে তার চোখ দুটো খুব বেশি গোল দেখাচ্ছে। তিনিও গুম মেরে থাকার চেষ্টা করছেন, কিন্তু পারছেন না। হেঁচকি এসে বাধা সৃষ্টি করছে।
একমাত্র ব্যতিক্রম জয়দেব। মহিমাময় ভাল করে লক্ষ করে দেখলেন, জয়দেব কোনও হেঁচকি তুলছেন না।
সমস্ত ব্যাপারটা অত্যন্ত বেশি গোলমেলে মনে হল মহিমাময়ের। ঠিক কী ঘটছে, ঘটেছে, কেন ঘটেছে কিছুই বুঝতে পারছেন না। দরজার কাছে গোটা দুই বেতের চেয়ার রয়েছে, তারই একটা টেনে নিয়ে মহিমাময় জয়দেবের খাটের সামনে গেলেন। কিন্তু ডাক্তার মল্লিকের সঙ্গে কথা বলার সুযোগ হল না, পর পর কয়েকটি অতিদ্রুত হেঁচকির ধাক্কায় তিনি উঠে দাঁড়ালেন এবং ও গড, ও গড বলতে বলতে দ্রুত বারান্দার দিকে চলে গেলেন।
এখন জয়দেব আর মহিমাময়, দুই পুরনো বন্ধু, এই শহরের দুই প্রাচীন মাতাল পরস্পরের মুখোমুখি।
না, কোনও ডুয়েল বা দ্বন্দ্বযুদ্ধ নয়। জয়দেব মহিমাময়ের দিকে তাকিয়ে একবার মুচকি হাসলেন। মহিমাময়ও হাসলেন। মহিমাময় একবার মাথা ঘুরিয়ে পাশের ঘরের দিকে তাকালেন। জয়দেব বুঝতে পেরে বললেন, কেউ নেই। সব বাইরে গিয়ে কোথাও হেঁচকি তুলছে। তারপর উদার কণ্ঠে মহিমাময়কে বললেন, একটু মদ খাবি? জিনিসটা চোলাই কিন্তু খাঁটি চোলাই।
খাটের নীচ থেকে দুটো কাঁচের গ্লাস আর একটা রবারের ব্লাডার হামাগুড়ি দিয়ে বার করে আনলেন জয়দেব। বন্ধুর উপহার বিনা বাক্যব্যয়ে গ্রহণ করলেন মহিমাময়। দুজনে প্রাণের আনন্দে পান শুরু করলেন।
মদ খেতে খেতে দুই বহুদিনের প্রাণের বন্ধুর মধ্যে বহু কথা হল। হেঁচকির প্রসঙ্গও এল। হেঁচকি ব্যাপারটা সোজা নয়। হেঁচকির জন্যে ওষুধ লাগে।
ডাক্তার মল্লিক মার্কিন দেশ পরিত্যাগ করার সময় কয়েক বোতল হেঁচকির ওষুধ নিয়ে এসেছেন। ব্যাপারটা বে-আইনি কিনা, তা নিয়ে এঁদের দুজনের কেউই চিন্তিত নন। মহিমাময়কে জয়দেব মদ খেতে খেতে যা বললেন তা চমকপ্রদ। ঘটনার বিবরণ শুনে স্তম্ভিত হয়ে গেলেন তিনি।
নেশা ছাড়ানোর ব্যাপারটা খুবই সোজা। শুধু ওই একটু হেঁচকির ওষুধ চাই। হেঁচকি সারানো নয়, হেঁচকি করানোর ওষুধ। জিনিসটা দেখতে সাদা টুথ পাউডারের গুঁড়োর মতো। ওই গুঁড়ো সামান্য একটু কোনও কিছুর সঙ্গে মিশ্রিত করে দিলে অবিশ্রান্ত হেঁচকি উঠতে থাকবে। এই ওষুধের আবিষ্কারক নাকি ডাক্তার মল্লিক স্বয়ং। তবে সব কেমিক্যাল এদেশে মেলে না। ডাক্তার মল্লিকের বিধান হল, যে যা নেশা করছে করুক, কোনও আপত্তির কারণ নেই। শুধু ওই নেশার সামগ্রীর সঙ্গে, সে হুইস্কি বা হেরোইন যা হোক না কেন, তার সঙ্গে এক বিন্দু ওই সাদা পাউডার মিশিয়ে দিতে হবে। আর গাঁজা জাতীয় ধোঁয়াটে নেশায় কলকেতে বা সিগারেটে একটু দিয়ে ধোঁয়ায় টেনে নিলেই কাজ হবে।
