নৈশ সেবাসদন
এখানে সকল প্রকার প্রাচীন ও দুরারোগ্য
নেশার বিলাতি মতে চিকিৎসা করা হয়।
সাইনবোর্ডের আয়তন এবং সেবাসদনের বাড়িটি দেখে মহিমাময়ের মনে বেশ সম্ভ্রমের ভাব এল। তিনি গেটের কাছে গিয়ে দাঁড়াতে একজন উর্দিপরা দারোয়ান দরজা খুলে দিল এবং অফিসঘর কোথায় সেটা অঙ্গুলি নির্দেশ করে দেখিয়ে দিল।
সুড়কি বাঁধানো সড়ক দিয়ে গাড়িবারান্দার নীচে একপাশে অফিসঘরে পৌঁছালেন মহিমাময়। সামনে টানা বারান্দা, তার মাঝবরাবর সিঁড়ি উঠে গেছে দোতলায়।
বারান্দার দুপাশে একেক ঘরের পাশে একেক রকম বস্তুর নাম লেখা–কোথাও লেখা গাঁজা, কোথাও ভাং, কোথাও সিদ্ধি, বাংলায় এবং পাশাপাশি ইংরেজি অক্ষরে এগুলির লাতিন নাম লেখা। দোতলায় সিঁড়ির পাশে তিরচিহ্ন দিয়ে লেখা আছে মদ, পাশে ইংরেজিতে লেখা কোহল সেকশন, সঙ্গে ব্র্যাজেট ওয়াইন, লিকার এটসেট্রা। অফিসঘরে বেশ কয়েকজন লোক কাজ করছেন, একজন মহিলা টাইপমেশিনে মাথা দিয়ে ঘুমিয়ে আছেন। অন্য এক মহিলা একটা সাদা টেলিফোনে ফিসফিস করে কার সঙ্গে যেন খুব অন্তরঙ্গ কথা বলছেন।
অফিসের অধীশ্বরের নাম কুঞ্জলাল। তিনিই অফিসের বড়বাবু। মহিমাময়কে খুব আদর করে বসিয়ে কুঞ্জলাল জানতে চাইলেন, আপনার সমস্যাটা কীরকম? কঠিন, তরল না বায়বীয়?
কবে সেই বিহ্বল প্রথম যৌবনে কলেজে পদার্থবিদ্যার ক্লাসে এই রকম একটা বিভাজনের কথা শুনেছিলেন মহিমাময়। তিনি স্মৃতি উদ্ধার করে জিজ্ঞাসা করলেন, কঠিন, তরল এসব মানে কী?
কুঞ্জলাল বললেন, আপনাকে তো রোগী মনে হচ্ছে না?
মহিমাময় বললেন, না, আমি আমার বন্ধুর জন্যে খবর নিতে এসেছি।
কুঞ্জলাল বললেন, তা হলে এবার বলুন, আপনার বন্ধুটি কঠিন, তরল না বায়বীয়? অবশ্য ডাক্তার মল্লিকের কাছে একসঙ্গে দুটো-তিনটে উপসর্গ হলেও কোনও অসুবিধা হয় না।
মহিমাময়ের মুখ দেখে কুঞ্জলাল বুঝতে পারলেন তার কিছুই হৃদয়ঙ্গম হচ্ছে না। তখন বিশদ করে বললেন, আপনি তো নেহাৎ শিশু মশায়। কঠিন হল আফিম, ট্যাবলেট এইসব। তরল হল মদ, সিদ্ধি, আর বায়বীয় হল গাঁজা, চরস।
কুঞ্জলালের হেঁয়ালি শেষ হলে মহিমাময় যেটুকু খবর সংগ্রহ করতে পারলেন তার থেকে বোঝা গেল পনেরো দিনের চিকিৎসায় প্রায় তিন হাজার টাকা খরচ হবে। বিফলে মূল্য ফেরত নয়, তবে এখনও পর্যন্ত কেউ বিফল হয়ে ফেরেনি।
ইতিমধ্যে গাঁজার ঘর থেকে একটি গাঁজাখোর মেয়ে ছোট এক গাঁজার কলকেতে ধোঁয়া টানতে টানতে বেশ কয়েকটা ফিকে নীল রিং ঠোঁট দিয়ে ছুঁড়ে অফিসঘরের মধ্যে এল। মহিলাকে দেখেই মহিমাময় চিনতে পারলেন, একটি বিখ্যাত সাবানের জনপ্রিয় মডেল মমতাজ চৌধুরী।
অফিসঘরের হাওয়ায় গাঁজার রিংগুলি মিলিয়ে যাওয়ার আগেই শ্রীমতী মমতাজ অন্তর্হিত হলেন। তাঁর অন্তর্ধানপথের দিকে কিছুক্ষণ নিষ্পলক তাকিয়ে থেকে চোখ থেকে বাই-ফোকাল চশমাটা নামিয়ে পকেটের রুমাল দিয়ে চোখ এবং চশমা দুই মুছে নিয়ে কুঞ্জলাল বললেন, মমতাজ দেবী মাত্র তিনদিন এসেছেন। আগে দৈনিক দেড়শো গাঁজার ধোঁয়ার রিং ছাড়তেন, এই তিনদিনেই রিং-এর সংখ্যা একশো দশে এসে নেমেছে। পনেরো দিনের মাথায় ভ্যানিশ হয়ে যাবে। এমন সময় একটা গাড়ি এসে বারান্দার নীচে দাঁড়াল। সঙ্গে সঙ্গে সবাই সচকিত হয়ে উঠল। যে ভদ্রমহিলা টাইপমেশিনে মাথা দিয়ে ঘুমোচ্ছিলেন, তিনি তাড়াতাড়ি মেশিন থেকে মাথা তুলতে গিয়ে তাঁর চুলের বেণীটা মেশিনের কি-বোর্ডে আটকিয়ে গেল। যে মহিলা টেলিফোনে এতক্ষণ অন্তরঙ্গ বাক্যালাপ চালাচ্ছিলেন তিনি দুম করে ফোনটা বিনা নোটিশে ছেড়ে দিলেন।
ডাক্তার মল্লিক অফিস কক্ষে প্রবেশ করলেন। তার চোখে পুরনো আমলের বড় বড় গোল কাঁচের নিকেলের ফ্রেমের চশমা, এটাই হাল আমলের মার্কিনি ফ্যাশান। সেই সঙ্গে লালগোলাপি গেঞ্জি, তার পিঠে বড় বড় কালো অক্ষরে লেখা OH-HO-OH-HO, শব্দগুলোর চারপাশে সবুজ লতাপাতা। ডাক্তার মল্লিককে দেখে খুব ভক্তি হল মহিমাময়ের। খুব বিশ্বাস হল যে ইনি পারবেন জয়দেবের নেশা ছাড়াতে। ডাক্তার মল্লিক প্রবেশ করার পর সকলের সঙ্গে মহিমাময়ও উঠে দাঁড়িয়েছিলেন। শুধু সেই টাইপিস্ট মেয়েটি যন্ত্র থেকে বেণী ছাড়াতে না পেরে সম্পূর্ণ উঠে দাঁড়াতে পারেনি। সে টেবিল ঘেঁষে তিন কোনাচে হয়ে দাঁড়িয়ে ছিল। ডাক্তার মল্লিক এসব হৃক্ষেপ করলেন। না, দ্রুত গতিতে গুডমর্নিং বলে পাশের ঘরে নিজের চেম্বারে চলে গেলেন।
মহিমাময়ও বেরিয়ে পড়লেন।
পরের শনিবারই জয়দেবকে স্থানান্তরিত করা হল নৈশ সেবাসদনে। অফিসের কাজে মহিমাময়কে কয়েক দিনের জন্যে কলকাতার বাইরে যেতে হয়েছিল। সেবাসদনে যাওয়ার সময়ে তিনি জয়দেবের সঙ্গে যেতে পারেননি। মিসেস জয়দেব নিজেই নিয়ে গিয়েছিলেন। কলকাতায় ফিরে এসে বাড়িতে-অফিসে নানা ঝামেলা। পাড়ার একটা বুড়ো হুলো বেড়াল কী কারণে কয়েকদিন আগে পাগল হয়ে গেছে, যখন তখন যাকে তাকে কামড়াচ্ছে, প্রতিবেশীদের সঙ্গে রাত জেগে পর পর কয়েক রাত সেই বেড়াল ধরার প্রয়াস। এদিকে বাসায় মেয়েটার সেকেন্ডারি পরীক্ষা। মহিমাময় কয়েকদিন এত ব্যস্ত রইলেন যে জয়দেবের কথা প্রায় খেয়ালই ছিল না। আরও নানা ধরনের গোলমাল-গ্যাস সিলিন্ডার পাওয়া যাচ্ছে না, তা ছাড়া আগে একটা সিলিন্ডারে একমাস যেত, এখন টেনেটুনে পনেরো দিনও যায় না। ওদিকে আগে ইলেকট্রিক বিল উঠত মাসে বড় জোর চল্লিশ-পঞ্চাশ টাকা, এখন দেড়শো-দুশোয় গিয়ে ঠেকেছে।
