গাঁজা, ভাং, আফিম, চরস, কোকেন, হেরোইন, সাদা-সবুজ-লাল যত রকম নেশা আছে সেই সঙ্গে মদের নেশা এমনকী সিগারেটের নেশা পর্যন্ত এই সেবাসদনে নির্মূল করে সারানো হয়।
কিছুই না, মাত্র পনেরো দিন থাকতে হবে ওই সেবাসদনে। পনেরো দিন নিয়মিত শয়ন, বিশ্রাম ও আহার। সেই সঙ্গে সামান্য কিছু ওষুধ আর মানসিক চিকিৎসা। আগে এই শেষের ব্যাপারটা, মানসিক চিকিৎসাই মুখ্য। রোগীর মাথায় তার নেশার বস্তুর বিরুদ্ধে ভয়াবহ চিন্তাধারা প্রবেশ করিয়ে দেওয়া হয়। যে গেঁজেল, তার এরপর থেকে গাঁজার কলকের আগুন দেখলেই বিসুবিয়াসের অগ্ন্যুৎপাতের কথা মনে হবে। যে মাতাল, এর পর মদের বোতল দেখলেই নোয়ার প্লাবনের কথা স্মরণ হবে–সে ভয়ে কুঁকড়িয়ে যাবে, নেশার বস্তু দেখে থরথর করে কাঁপতে থাকবে। ডাক্তার। মল্লিকের চিকিৎসার এমনই মহিমা। নন্দবাবুর বক্তব্য শেষ হওয়ার অনেকক্ষণ পরেও যখন ট্যাকসিটা জয়দেবের বাড়ির কাছে পৌঁছাল না, মহিমাময় বুঝলেন ট্যাকসিওলা হয় রাস্তা ভুল করেছে না হয় ইচ্ছে করে ঘুরপথে যাচ্ছে।
দ্বিতীয়টাই স্বাভাবিক। কারণ পার্ক স্ট্রিটের মধ্যরাতের এমন কোন ট্যাকসিওলা আছে যে জয়দেবের বাড়ি চেনে না? তা ছাড়া লোকটা একবারও জিজ্ঞেস করেনি কোথায় যেতে হবে।
মহিমাময় ট্যাকসিওলাকে বললেন, সর্দারজি, (চিরদিন মত্ত অবস্থায় সমস্ত ট্যাকসি ড্রাইভারকে মহিমাময় কোনও এক অজ্ঞাত কারণে সর্দারজি বলে সম্বোধন করেন, আজও অবশ্য ভুল হয়নি) জয়দেববাবুকা বাসা আপ নেহি জানতা হ্যায়?
সর্দারজি বিনীতভাবে বললেন, বহুত জানতা হ্যায়। এর পর পরিষ্কার বাংলায় বললেন, জয়বাবু বাসায় যাওয়ার আগে তিন-চার পাক হাওয়া খেয়ে নেন। তাতে ওঁর কষ্ট কমে, মনে ফুর্তি আসে। বাড়ি ফিরতে অসুবিধা হয় না। আজ আড়াই পাক হয়ে গেছে, আর দেড় পাক দিলেই মনে হচ্ছে ঝামেলা মিটে যাবে। মহিমাময় প্রমাদ গুনলেন, জয়দেবের চারপাক, তারপর নন্দবাবুর কয়পাক কে জানে, তারপর নিজের বাড়ি যাওয়া–আজ কত টাকা ট্যাকসি বিল হবে, কী জানি? তবে মহিমাময় জানেন নিরানব্বই টাকা পঁচাত্তর পয়সার চেয়ে বেশি বিল ওঠা মিটারে সম্ভব নয়, সেটাই যা রক্ষা।
নন্দবাবু বোধহয় মহিমাময়ের চিন্তাধারা মনে মনে অনুসরণ করছিলেন। হঠাৎ তিনপাকের মাথায় একটা মোড়ে, রোকখে, রোকখে, বেঁধে, বেঁধে… বলে গাড়ি দাঁড় করিয়ে দ্রুত নেমে পড়লেন। তারপর গাড়ির জানলা দিয়ে মুখ গলিয়ে মহিমাময়কে বললেন, এখান থেকে আমার বাড়ির দিকে একটা শর্টকাট আছে, আমি যাচ্ছি। কিন্তু নৈশ সেবাসদনের কথাটা ভুলো না।
না, মহিমাময় নৈশ সেবাসদনের কথা বিস্মৃত হননি। বলা উচিত নিজেকে বিস্মৃত হওয়ার সুযোগ দেননি।
সেই রাতে জয়দেবকে নামিয়ে দিয়ে, তারপর নিজের বাড়িতে ফিরে যখন পুরো একটা একশো টাকার নোট, ট্যাকসি ভাড়া সাতাশি টাকা আর তেরো টাকা সর্দারজির বখশিশ, মহিমাময়কে দিতে হল তখনই তিনি সিদ্ধান্ত নিলেন ব্যাপারটার একটা ফয়সালা চাই, অবিলম্বে চাই।
পরের রবিবার সকালে জয়দেবের বাড়িতে গিয়ে জয়দেবের স্ত্রীর সঙ্গে কথা বললেন। দেখা গেল মিসেস জয়দেব সব খবরই রাখেন, বোধহয় নন্দবাবুই ইতিমধ্যে এসে বলে গেছেন।
মিসেস জয়দেব বুদ্ধিমতী মহিলা। তাঁর ধারণা এসব নিতান্ত তুকতাক জাতীয় চিকিৎসা। এত সহজে, মাত্র এক পক্ষ সেবাসদনে বাস করেই তাঁর স্বামীর এতদিনের জটিল মত্ততার হাত থেকে অব্যাহতি পাওয়া যাবে–একথা মিসেস জয়দেব কিছুতেই মেনে নিতে পারছেন না। মহিমাময় মিসেস জয়দেবকে বোঝালেন যে এসব হল অমোঘ আমেরিকান চিকিৎসা, এমনকী রাশিয়ায় পর্যন্ত এখন এই চিকিৎসায় হাজার হাজার লোক ভদকা খাওয়া ছেড়ে দিয়েছে। তা ছাড়া নন্দবাবুর এক দূর-সম্পর্কের শালা মাত্র এক সপ্তাহের চিকিৎসাতেই চল্লিশ বছরের গাঁজার নেশা বন্ধ করে দিয়েছে। এখন সে দুবেলা শুধু দু গেলাস দুধ খায়, নেশার জিনিস বলতে নেহাতই সারাদিনে কয়েকটা গুণ্ডিপান। অনেক কষ্টে মিসেস জয়দেবকে নিমরাজি করানো গেল। কিন্তু এবার চিন্তায় পড়লেন। মহিমাময়, জয়দেব কি এই চিকিৎসায় রাজি হবে, নাকি শেষ পর্যন্ত বেঁকে বসবে। কাল ছিল শনিবার। কাল নাকি অনেক রাতে জয়দেব বাড়ি ফিরেছে, এখন ভেতরের ঘরে ঘুমোচ্ছ। ভয়ে ভয়ে মহিমাময় মিসেস জয়দেবকে বললেন, এখন ভালয় ভালয় জয়দেবকে রাজি করাতে পারলে হয়।
মিসেস জয়দেব একটু হাসলেন, বললেন, সে নিয়ে আপনাকে ভাবনা করতে হবে না। ও একপায়ে দাঁড়িয়ে আছে, বলছে, দিন পনেরো নিরিবিলি শান্তিতে একটু বিশ্রাম পেলে শরীরটা জুড়িয়ে যায়। বরং আমিই আপত্তি করছিলাম।
মহিমাময় স্বস্তির নিশ্বাস ফেলে বললেন, তা হলে আর কোনও বাধা নেই। এবার সেবাসদনে গিয়ে দিনক্ষণ ঠিক করে ফেলি। ঘুম থেকে উঠলে জয়দেবকে বলবেন যে আমি এসেছিলাম।
বন্ধুর সুচিকিৎসা ফেলে রাখা উচিত নয়। আর সপ্তাহে রবিবার মাত্র একটাই।
জয়দেবের বাড়ি থেকে মহিমাময় সরাসরি গেলেন মল্লিকের সেবাসদনে। সুন্দর জায়গা। একটা পুরনো বাগানবাড়ি ভাল করে সারিয়ে, চুনকাম করে, শক্ত লোহার গেট লাগিয়ে সেবাসদন তৈরি হয়েছে। বাইরে বড় বড় হরফে বিশাল সাইনবোর্ড লাগানো রয়েছে।
