জয়দেবের শরীরটা আজ কিছুদিন হল ভাল যাচ্ছে না। সারাদিন শরীর ম্যাজম্যাজ করে, বিকেলের দিকে গা গুলোয়, সকালে মাথা ধরে থাকে, পেটের বাঁ পাশে নীচের দিকে অনেক সময়েই একটা চাপা ব্যথা।
জয়দেব গিয়েছিলেন ডাক্তার দেখাতে। ডাক্তার অনেক রকম পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে অবশেষে মুখ গম্ভীর করে বলেছেন, আপনাকে মদ খাওয়া ছাড়তে হবে।
সেই কথা শুনে মহিমাময় চেষ্টা করছিলেন জয়দেবকে বোঝাতে যাতে তিনি পান করা ছেড়ে দেন। কিন্তু কে শোনে কার কথা। জয়দেব উদাসীন কণ্ঠে বললেন, বাজে বকিস না মহিমা, খবর নিয়েছিস, কোনওদিন ভেবে দেখেছিস পৃথিবীতে যত বুড়ো মাতাল আছে তার চেয়ে অনেক কম আছে বুড়ো ডাক্তার। মদের ব্যাপারে ডাক্তারের পরামর্শ আমি নেব না।
মদ খাওয়া এত সহজে জয়দেব ছেড়ে দেবেন, সামান্য ডাক্তারের ভয়ে, এ আশা অবশ্য মহিমাময় করেননি। তিনি তাঁর প্রাণের বন্ধুকে হাড়ে হাড়ে চেনেন।
জয়দেবের আধুলির বাজনা ইতিমধ্যে অতি উচ্চগ্রামে উঠেছে। এখন তার দু হাতে দুটো আধুলি, তিনি দ্রুতলয়ে টেবিলের কাঁচের উপরে বাজাচ্ছেন। বোধহয় গ্লাসটা ভেঙে যেতে পারে এই আশঙ্কায় অবশেষে বেয়ারা এল। তার দুহাতে দুটো পূর্ণ গেলাস, একটা অবশ্যি জয়দেবের অন্যটি মহিমাময়ের।
বিনা আপত্তিতে মহিমাময় আরেক গেলাস পানীয় নিলেন, একটু আগের মানসিক বাধা টিকল না।
তারপরে আরও এক গেলাস, আরও এক গেলাস; তরল বুদ্বুদময় পানীয়ের দ্রুত স্রোতে ভেসে চলল রাতের প্রহর।
রাত এখন কটা?
প্রায় প্রতিদিনই এরকম হয়। প্রথমে জয়দেব বেশি পান করে ফেলেন। তখন মহিমাময় একটু ভেবেচিন্তে, একটু টেনে খান। তারপর কিছুটা ওজর-আপত্তি ইত্যাদির পর মহিমাময় ধাতস্থ হন। তখন তিনি দ্রুতগতিতে পান করতে থাকেন, আস্তে আস্তে গেলাসের দৌড়ে তিনি জয়দেবকে ধরে ফেলেন। তারপর দুজনে সমান-সমান, কানায় কানায়। এই সমতাটা আসে রাত বারোটা নাগাদ। এর আধ ঘন্টা আগে পানশালার সামনের ঝাঁপ পড়ে গেছে। এদিক ওদিক দু-একটি টেবিলে জয়দেব মহিমাময়ের মতো দু-একজন ইতস্তত বসে আছেন। অধিকাংশ আলো নেবানো। অবশেষে কিঞ্চিৎ টলতে টলতে দুই ছায়ামূর্তি জয়দেব ও মহিমাময় পিছনের দরজা দিয়ে প্যাসেজে বেরিয়ে উলটো ঘুরে পানশালা থেকে রাস্তায় এসে পড়েন।
রাস্তার খোলা হাওয়ায় দুজনেরই মন বেশ চাঙ্গা হয়ে ওঠে। টা-টা বাই বাই, গুডনাইট, কাল দেখা হবে। ইত্যাদি বাক্য বিনিময় করে সাধারণত দুজনে যে যার বাড়ির দিকে রওনা হন।
আজ কিন্তু একটু গোলমাল হল।
কিছুক্ষণ ধরেই জয়দেব বেশ চুপচাপ ছিলেন, হঠাৎ রাস্তায় বেরিয়ে এসে পেটে হাত দিয়ে বসে পড়লেন, একটা ক্ষীণ কাতরোক্তি মুখ দিয়ে বেরোল।
এই রকম অবস্থায় খুব বিহ্বল হয়ে পড়েন মহিমাময়। চিরকালই তার স্বভাব হল সমস্যা থেকে। যথাসম্ভব দূরে থাকা। যদি কখনও সমস্যা ঘাড়ে এসে পড়ে তিনি সঙ্গে সঙ্গে বসে পড়েন। কোনও চেষ্টা করেন না উদ্ধার পাওয়ার।
আজও তাই করতে যাচ্ছিলেন। মহিমাময় জয়দেবের পাশেই পেটে হাত দিয়ে বসতে যাচ্ছিলেন, কিন্তু সে কাজে বাধা পড়ল। পেছন থেকে কে একজন জামার কলার ধরে মহিমাময়কে আটকালেন।
ঘাড় ঘুরিয়ে মহিমাময় দেখেন পুরনো বন্ধু নন্দ। নন্দবাবু জয়দেব আর মহিমাময় দুজনেরই মোটামুটি বন্ধু। একই বারে, একই টেবিলে তারা একত্রে বহুবার মদ্যপান করেছেন। কাছাকাছি অন্য কোনও একটা পানশালায় নন্দবাবু বোধহয় ছিলেন। তিনিও এখন বাড়ির দিকে যাচ্ছিলেন। এভাবে এঁদের দুজনকে এ অবস্থায় দেখে দাঁড়িয়ে পড়েছেন এবং মহিমাময়কেও দাঁড় করিয়ে দিয়েছেন। জয়দেব তখনও পেটে হাত দিয়ে রাস্তায় বসে, সেদিকে তাকিয়ে নন্দবাবু বললেন, মাঝেমধ্যেই তো এরকম হচ্ছে দেখছি। ডাক্তার দেখানো হয়েছে?
মহিমাময় বললেন, ডাক্তার তো দেখিয়েছে বলছে। কিন্তু তার কথা তো জয়দেব শুনছে না।
নন্দবাবু জিজ্ঞাসা করলেন, কী বলেছে ডাক্তার?
মহিমাময় বললেন, ওই যা বলে মদ খাওয়া ছেড়ে দিতে বলেছে।
নন্দবাবু শুনে বললেন, মদ খাওয়া ছাড়তে বললেই তো ছাড়া যায় না। মদ খাওয়া ছাড়াতে হয়। এ ব্যাপারে আলাদা ডাক্তার আছে। মদ খাওয়া ছাড়ানোর ডাক্তারের ব্যাপারটা ঠিক মহিমাময় বুঝতে পারলেন না। কিন্তু ততক্ষণে নন্দবাবু একটা ট্যাকসি ধরে ফেলেছেন। তিনি মহিমাময়কে ঠেলে দিয়ে, জয়দেবকে আলগোছে দাঁড় করিয়ে সামনে এগিয়ে ট্যাকসির মধ্যে ঠেলে দিলেন।
তিনজনে ওঠার পর ট্যাকসি ছাড়ল। নন্দবাবু বললেন, আগে জয়দেবকে নামাব। তারপরে আমি, সবশেষে তুমি। নেশাগ্রস্ত অবস্থাতেও মহিমাময় বুঝলেন ট্যাকসি ভাড়াটা তাঁকেই মেটাতে হবে। তা হোক, নন্দ লোকটা মাতাল হলেও চিরকালই একটু কৃপণ কিন্তু তোক খারাপ নয়।
ট্যাকসিতে যেতে যেতে নন্দবাবু মদ খাওয়া ছাড়ানোর ডাক্তারবাবুর কথা আবার বললেন। যতটা বোঝা গেল, ঠিক ডাক্তারবাবু নয়, ডাক্তার সাহেব। ডাক্তার ভদ্রলোকটি বহুদিন মার্কিন দেশে ছিলেন। সেখান থেকে মাতলামি ছাড়ানোয় সিদ্ধহস্ত হয়ে ফিরে এসেছেন। ডাকসাইটে মার্কিনি মাতালদের তিনি সচ্চরিত্র, সাধুপুরুষে রূপান্তরিত করিয়েছেন। ভদ্রলোকের পুরো নাম এই গল্পে প্রয়োজন নেই, ডাক্তার মল্লিক বললেই চলবে। ডাক্তার মল্লিক মাত্র মাস কয়েক আগে দেশে ফিরে এসে বেহালায় ঠাকুরপুকুরের কাছে কোথায় যেন একটা নৈশ সেবাসদন, নৈশ মানে রাত্রিকালীন নয়, নেশা সংক্রান্ত চিকিৎসালয় স্থাপন করেছেন।
