চমৎকার খাওয়ালেন নগেন পাল। ঘি-আলুভাজা, পাকা রুই, গলদা চিংড়ি, কৃষ্ণনগরের সরপুরিয়া, বেলডাঙ্গার মনোহরা খুব পরিতৃপ্তির সঙ্গে খেলেন শশধরবাবু। নতুন দাঁতজোড়া সর্বতোভাবে সাহায্য করল তার ভোজনে। বছর কুড়ি আগে প্রথমবার যখন দাঁত নড়েছিল তার, তারপর আর কোনওদিন এত আরাম করে খাননি শশধরবাবু।
নৈশভোজন শেষ হল। এবার ফেরার পালা। শশধরবাবু বাথরুমে গিয়ে হাতমুখ ধোয়ার সময় জলের কলে দাঁতের পাটিজোড়া খুলে ভাল করে ধুয়ে নিয়েছেন। ব্যবহৃত দাঁত ফেরত দেওয়া উচিত বা শোভন হবে কিনা এইসব ভাবতে ভাবতে নগেনবাবুর কাছে এসে বললেন, এই যে আপনার দাঁতজোড়া।
নগেনবাবু বিনীতভাবে বললেন, ও আমার কোনও কাজে লাগবে না। আপনার যখন ফিট করে গেছে আপনি রেখে দিন।
বিনামূল্যে একজোড়া ভাল দাঁত পেয়ে গেলেন, শশধরবাবু খুশিই হলেন। তবু একটু সংকোচের সঙ্গে মাড়ির খাপে দাঁতের পাটি লাগাতে লাগাতে প্রশ্ন করলেন নগেনবাবুকে, আচ্ছা, এত দাঁতের পাটি আপনার কাছে, আপনার কি দাঁতেরও ব্যবসা আছে?
নগেন পাল হাত কচলিয়ে বললেন, আরে না না, দাঁতের ব্যবসা নয়। আমার আছে। নার্সিংহোম। দেখেননি শহরে ঢুকতে কোল্ড স্টোরেজের পাশেই নগেন্দ্র সেবা কেন্দ্র! ওটাও আমারই।
শশধরবাবুর সংশয় গেল না, নার্সিংহোমে, মানে ওই নগেন্দ্র সেবা কেন্দ্রে এত দাঁত দিয়ে আপনি কী করেন? ওটা সঁতের রোগীর নার্সিংহোম, দাঁতের হাসপাতালের মতো কিছু?
নগেনবাবু বিশদভাবে হাসলেন, তা নয়। ওটা এমনিই সাধারণ নার্সিংহোম। তবে আজকাল অনেক বুড়োহাবড়া রোগীকে বাড়িতে রেখে ছেলেবউ, আত্মীয়স্বজন সেবাযত্ন করতে চায় না। অসুখ-বিসুখ হলেই হাসপাতালে নার্সিংহোমে পাঠিয়ে দেয়। একটু থেমে নগেনবাবু বিভ্রান্ত শশধরবাবুর মুখের দিকে তাকিয়ে বললেন, তা সেই বুড়ো রোগীরা যখন মারা যায়, তাদের চশমা, দাঁত সবই তো আমার ওখানে পড়ে থাকে। এসব জিনিস আত্মীয়স্বজন কদাচিৎ ফেরত নিতে আসে। আমি বিষয়ী লোক, সব গুছিয়ে রেখে দিই, কখন কার কাজে লাগে। এই তো আপনার কাজে লাগল। আপনার দাঁতজোড়া, যতদূর মনে হচ্ছে, বরদাপ্রসন্নবাবুর, আমাদের এলাকার শেষ রায়বাহাদুর, লাস্ট ডিসেম্বরের ঠান্ডায় আমার ওখানেই কেঁসে গেলেন।
রায়বাহাদুরি দাঁত মাড়িতে চাপিয়ে হতভম্ব শশধর চক্রবর্তী ফ্যাল ফ্যাল করে নগেন পালের দিকে তাকিয়ে রইলেন।
০৩.
বাগ্মীভারতী শ্রীযুক্ত শশধর চক্রবর্তী বক্তৃতা করা ছেড়ে দিয়েছেন। তিনি বাঁধানো দাঁত ব্যবহার করাও ছেড়েছেন, নিজের আসল দাঁতজোড়া, সেই সঙ্গে উপহার পাওয়া রায়বাহাদুরি ত–দুটি সেটই কালীঘাটের গঙ্গায় ফেলে দিয়ে এসেছেন। এক ফোকলা দাঁত বৃদ্ধ ভদ্রলোক দুটি দামাল শিশুর সঙ্গে বারান্দায় খেলছে, এ দৃশ্য এখন শশধরবাবুর বাড়িতে কেউ বক্তার সন্ধানে গেলেই দেখতে পাবেন। তবে তিনি আর কোথাও যান না, বক্তৃতার অনুরোধ নিয়ে কেউ এলে সঙ্গে সঙ্গে তাকে ভাগিয়ে দেন।
দুই মাতালের গল্প
আপনাদের সকলের সঙ্গে বোধ হয় এঁদের দুজনের পরিচয় নেই। গল্প লেখার আগে এঁদের সঙ্গে আপনাদের আলাপ করিয়ে দিই, তাতে এই ঝাঝালো তরল কাহিনি পান করা সহজ হবে।
প্রথম জন, যিনি এক হাত গালে দিয়ে আরেক হাতে গেলাস ধরে টেবিলের ডানপাশে বসে আছেন, যাঁর চোখে মোটা কাঁচের চশমা, একমাথা এলোমেলো সাদা কালো চুল, গালে জুলফির নীচে একটা লাল তিল–যিনি এইমাত্র এক চুমুকে পুরো গেলাসটা সাফ করে টেবিলে আধুলি ঠুকে বেয়ারাকে ডাকছেন তিনি হলেন জয়দেব পাল।
আর জয়দেববাবুর মুখোমুখি উলটোদিকের চেয়ারে বসে আছেন মহিমাময়, এঁর পদবির প্রয়োজন নেই, মহিমাময়ই যথেষ্ট, এরকম নামের খুব বেশি লোক নেই। মহিমাময়ের হাতেও গেলাস। মহিমাময় জয়দেবের চেয়ে মোটা এবং তাঁর মাথায় ছোটখাটো ঝকমকে একটা টাক। মহিমাময়ের গলার স্বর খুব ভারী এবং সবসময়েই তিনি উচ্চগ্রামে কথা বলেন।
জয়দেব এবং মহিমাময় দুজনেই বাল্যবন্ধু। নেবুতলা করোনেশন বয়েজ হাই ইংলিশ স্কুলে দুজনে ক্লাস থ্রি থেকে একই ক্লাসে পড়েছেন, দুজনেই প্রথম বছরের স্কুল ফাঁইনাল, তার মানে এই মুহূর্তে দুজনেই কিঞ্চিৎ উধ্ব পঞ্চাশ। এই ব্যাপারটা, মানে বয়েসের ব্যাপারটা বেশ জটিল। এখন জয়দেবের বয়েস বাহান্ন, মহিমাময়ের তিপ্পান্ন। জয়দেব বলেন, যাহা বাহান্ন, তাহা তিপ্পান্ন। আর মহিমাময় বলেন, জানিস, ব্যাপারটা এত সোজা নয়। যখন তোর বয়েস ছিল এক–আমার বয়েস ছিল দুই, এক সময়ে আমার বয়েস তোর বয়সের ডবল ছিল, সে কথাটা ভুলবি না। বয়েসের ব্যাপারটা মহিমাময় আর জয়দেববাবুর নিতান্ত ব্যক্তিগত ব্যাপার। আমরা তার মধ্যে যাচ্ছি না। শুধু পরিচয় প্রদানে সামান্য ফাঁক রয়ে গেছে, সেটুকু বলি।
মহিমাময় বিবাদী বাগে একটা বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে মাঝারি মাপের চাকরি করেন। বিবাহিত এবং ইত্যাদি। জয়দেব আগে ছবি আঁকতেন, এখন সিনেমার লাইনে টুকটাক ছোটবড় কাজ করেন, বিবাহিত এবং ইত্যাদি। এই আমার এক দোষ। সুযোগ পেলেই বেশি বলে ফেলি।
পরিচয় করিয়ে দিতে গিয়ে অযথা দেরি করে ফেললাম।
এদিকে জয়দেববাবুর আধুলির বাজনা শুনেও বেয়ারা এখন পর্যন্ত এ টেবিলে আসেনি। মহিমাময়ের পানীয়ও ফুরিয়ে গেছে। কিন্তু তিনি এই মুহূর্তে আর পানীয় চান না, তিনি চান না জয়দেবও আর পানীয় নিক। আজকেই ঘটনাটা ঘটেছে।
