এখন শ্রীশশধর চক্রবর্তীকে বক্তৃতা দেওয়ার জন্যে হুট করে ডাক দিলেই চলে না। রীতিমতো কয়েক সপ্তাহ আগে অ্যাপয়েন্টমেন্ট করতে হয়। শশধরবাবুকে পাওয়া যাবে না জেনে অনেক সময় অনেক অনুষ্ঠানের তারিখ আগে-পিছিয়ে দিতে হয়। ইতিমধ্যে শহরতলির একটি সারস্বত সমাজ শ্ৰীযুক্ত শশধর চক্রবর্তীকে বাগ্মীভারতী উপাধি দিয়েছে। দূর-দূরান্ত থেকে শশধরবাবুর ডাক আসা আরম্ভ হয়েছে। তার নিজের পাড়ায় প্রতিপত্তি বেড়েছে, এমন কী নিজ বাড়িতে পর্যন্ত সম্মান বেড়ে গেছে।
০২.
কলকাতা থেকে মাইল ষাটেক দুরে একটি মাঝারি শহরে একটি সিনেমা হলের উদ্বোধন অনুষ্ঠানে হল-মালিকের গাড়িতে চেপে এক অপরাহ্নে এসে পৌঁছালেন শশধরবাবু। সন্ধ্যায় অনুষ্ঠান, সেখানে শশধরবাবু ছাড়াও জনৈকা বিগতযৌবনা তবে-এখনও-তত-লোলচৰ্মানন চিত্রতারকা এবং আরও কেউ কেউ চিত্রজগতের কেষ্টবিষ্টুও থাকছেন। সন্ধ্যায় উদ্বোধন অনুষ্ঠানের পর নৈশভোজ, তারপর রাতেই গাড়িতে করে কলকাতা ফেরা। এ বয়েসে এসব উত্তেজনা যথেষ্টই উপভোগ করছেন শশধরবাবু। শহর ও শহরতলির ভিড় পেরিয়ে ফাঁকা রাস্তায় পড়ে গাড়িতে আসতে আসতে বিকেলের হাওয়ায় ঘুমিয়ে পড়েছিলেন তিনি। গাড়ি যখন নবনির্মিত সিনেমা হলটির কাছে এসে পৌঁছাল, তখন লোকজনের কোলাহলে তার ঘুম ভাঙল।
ঘুম থেকে উঠে হঠাৎ শশধরবাবুর খেয়াল হল, কী যেন একটা গোলমাল হয়েছে কোথায়। গাড়ি থেকে নেমে সিনেমা হলের মালিকের সঙ্গে হলের করিডোরের মধ্যে ঢুকতে ঢুকতে দেয়ালে লাগানো নতুন ঝকঝকে আয়নায় নিজের মুখের দিকে তাকিয়ে শশধরবাবু গোলমালটা ধরতে পারলেন। তাঁর মুখটা কেমন ফাটা বেলুনের মতো চোপসানো, চোয়ালটা ঝুলে পড়েছে। সর্বনাশ! বাঁধানো দাঁতজোড়া ফেলে এসেছেন, এখন বক্তৃতা দেবেন কী করে, আর নৈশভোজ বোধহয় শুধু ডাল কিংবা সুপ খেয়েই কাটাতে হবে।
অনুষ্ঠানের এখনও বেশ কিছু সময় বাকি আছে। হলের করিডোরের বাঁপাশে। হল-মালিকের সুন্দর সুসজ্জিত কক্ষ। সেখানে সাদরে নিয়ে শশধরবাবুকে সোফায় বসালেন হলের মালিক নগেন পাল মহাশয়।
নগেন পালকে দেখে একটু আশ্বস্ত হলেন শশধরবাবু, খুব কাঠখোট্টা নয়, সিনেমা হলের মালিক। হিসেবে বেশ একটু নরম গোছের চেহারা। বিপদের কথাটা আগেই বলে রাখা ভাল এই ভেবে শশধরবাবু দন্তহীন ফোকলা মাড়িতে যতটা বিনয় আনা সম্ভব সেটুকু এনে জিব দিয়ে জড়িয়ে জড়িয়ে বললেন, একটা বড় ভুল হয়ে গেছে মশায়। আজ আমার বক্তৃতা করা হবে না।
নগেনবাবু অবাক, কলকাতা থেকে এত রাস্তা এসে এখন বলে কী লোকটা! নগেনবাবুর একটু খটকাও লাগল, এই অস্পষ্ট জিব-জড়ানো কথা বলা লোকটা বিখ্যাত বক্তা শশধর চক্রবর্তী, কোনও ভুল হল না তো?
ব্যবসায়ী মানুষ নগেনবাবু, নিজের কৌতূহল এবং খটকা চেপে রেখে জিজ্ঞাসা করলেন, কেন, কী হল?
শশধরবাবু সরাসরি জানালেন, আমার বাঁধানো দাঁতজোড়া ভুলে ফেলে এসেছি। এখন বক্তৃতা করব কী করে, আর আপনার নৈশভোজই বা খাব কী করে?
নগেনবাবু এই কথা শোনামাত্র বললেন, দাঁতজোড়া ফেলে এসেছেন? তাতে কী হয়েছে, এটা কোনও সমস্যাই নয়। দশ মিনিট বসুন, আমি আসছি। এই বলে দ্রুত দরজা দিয়ে বেরিয়ে যেতে যেতে একটি বেয়ারাকে নির্দেশ দিলেন, এই অফিসঘরে মিস্টার চক্রবর্তীকে চা-জলখাবার দে, আমি এখনই আসছি।
ঠিক দশ মিনিট নয়, পনেরো-ষোলো মিনিটের মাথায় ফিরে এলেন নগেন পাল। হাতে একটি ছোট থলে। সেক্রেটারিয়েট টেবিলের ড্রয়ার খুলে একটা ভোয়ালে বার করে তার উপরে উপুড় করে ঢাললেন থলেটা। অন্তত পনেরো-বিশজোড়া বাঁধানো দত। অর্থাৎ তিরিশ-চল্লিশটা পাটি।
শশধরবাবু স্তম্ভিত। এরকম ঘটনা যে ঘটতে পারে তিনি ঘুণাক্ষরেও কল্পনা করতে পারেননি। এত দাঁতের পাটি পেল কোথায়, নগেন পালের কি সঁতেরও ব্যবসা আছে? তিনি হতবাক হয়ে ভাবতে ভাবতেই নগেন পাল এক এক জোড়া দাঁতের পাটি বেছে নিয়ে এগিয়ে দিলেন, দেখুন তো ফিট করে কিনা?
না, এ জোড়া একটু ছোট মনে হচ্ছে, ঠিক মাড়ির উপরে বসছে না। শশধরবাবুর দ্বিধা দেখে নগেন পাল আরেক জোড়া এগিয়ে দিলেন। একটু ইতস্তত করে দ্বিতীয় জোড়াও শশধরবাবু পরখ করলেন, না এটা আবার একটু বড়, টাকায় ঠেকে যাচ্ছে।
বার বার তিনবার। কী আশ্চর্য, তৃতীয়বারের মাথায় দাঁতের পাটিজোড়া একেবারে কাপে কাপে ফিট করে গেল শশধরবাবুর। এমনকী তাঁর নিজের যে দাঁতজোড়া ভুল করে বাড়িতে ফেলে এসেছেন তার থেকেও স্বচ্ছন্দ যে এ জোড়া!
দুই মাড়িতে দুই জোড়া দাঁত লাগিয়ে আত্মপ্রত্যয় ফিরে পেলেন শশধর চক্রবর্তী।
এর পরে আড়াই ঘণ্টা ঝড়ের মতো কেটে গেল। নতুন দাঁত মাড়িতে বসিয়ে দুর্দান্ত বক্তৃতা করলেন শ্রীযুক্ত শশধর বাগ্মীভারতী। সিনেমা যে জীবনের সঙ্গে কতটা জড়িয়ে গেছে, একালের শিশুরা যে মা-মা বলে না কেঁদে সিনেমা-সিনেমা বলে কাঁদে, একটি নতুন সিনেমা হল নবকালের নব বিশ্ববিদ্যালয়–ভাল দাঁতের সুবিধা পেয়ে শশধরবাবু প্রাণখুলে বক্তৃতা করলেন। যেসব ভাবী দর্শকেরা শুধুমাত্র চিত্রতারকার আকর্ষণে এসেছিল, তারা পর্যন্ত শশধরবাবুর বক্তৃতা শুনে থ মেরে গেল।
চিত্রতারকা ইত্যাদিরাও অল্পবিস্তর বললেন বিস্তর সিটির মধ্যে। সভা শেষ, এরপর নৈশভোজ।
