সকালের দিকে এধরনের একটা সভা জুটে গেলে বক্তৃতার পরে অনেকদিনই অনুষ্ঠানের কর্মকর্তাদের সঙ্গে কাছাকাছি কোনও দোকানে বসে চা-সিঙ্গাড়া জলখাবার হয়ে যায়। দু-একবার যে এর পরে ভোজনের নিমন্ত্রণ পাননি তাও নয়।
সকালের বক্তৃতাটা থাকলেও খবরের কাগজ খুঁটিয়ে দেখে কাছাকাছি কোথাও এক বৈকালিক সভাও সংগ্রহ করে ফেলেন শশধরবাবু।
একরকম অনুমানেই বাছতে হয়, সেজন্যে দু-একবার একটু অসুবিধাও হয়। পণপ্রথা নিবারণী সমিতির এক সভায় গিয়েছিলেন সাদার্ন অ্যাভিনিউয়ে এক বহুতল অট্টালিকার মনোরম ফ্ল্যাটে। কিন্তু সেটা পুরো মাড়োয়ারি ভদ্রলোকদের সভা, হিন্দিতে বক্তৃতা হচ্ছে। শশধরবাবুর আবার হিন্দি একদম আসে না। ফ্ল্যাট নম্বর ভুল হয়েছে এরকম মুখভাব করে কেটে পড়লেন।
অবশ্য অনেক সময় মনোমতো অনুষ্ঠানও জুটে যায়। একদিন সন্ধ্যায় মিলনপল্লী নবযুবক সংঘের রজত জয়ন্তী উৎসবে গিয়ে নতুন ধরনের অভিজ্ঞতা হল শশধরবাবুর। সাদা ধুতি-পাঞ্জাবি পরে সভায় যান তিনি, সঙ্গে কালো ফ্রেমের রাশভারি চশমা, মাথায় সাদাপাকা চুলে তাকে বেশ সম্ভ্রান্তই দেখায়। নবযুবক সংঘের প্রধান অতিথি আসেনি। যদিও তাকে সেখানে কেউই চেনে না তবু একজন কর্মকর্তা এসে বলল, আপনার নামটা নামটা যদি বলেন? শ্রীশশধর চক্রবর্তী। তিনি নাম জানানোর মিনিটখানেক পরে শশধরবাবু শুনলেন মাইকে ঘোষণা হচ্ছে, প্রধান অতিধির অনুপস্থিতিতে আমাদের বিশিষ্ট অতিথি শ্রীযুক্ত শশধর চক্রবর্তী মহাশয় প্রধান অতিথির আসন গ্রহণ করবেন।
শশধরবাবুকে পঁচিশটি প্রদীপ জ্বালিয়ে নবযুবক সংঘের রজত জয়ন্তী উৎসবের উদ্বোধন করতে হল, বললেন চমৎকার, এই পঁচিশটি শিখা যেদিন পঞ্চাশে পৌঁছাবে, যেদিন এই রজত স্বর্ণে পরিণত হবে, সেদিন এই পৃথিবীতে আমি হয়তো থাকব না কিন্তু নবযুবক সংঘের স্বপ্ন বেঁচে থাকবে।কম্পিত কণ্ঠে প্রাসঙ্গিক-অপ্রাসঙ্গিক প্রায় আধ ঘণ্টার বক্তৃতা শেষ করলেন প্রচুর করতালির মধ্যে।
ক্রমশ কতরকম যে অনুষ্ঠানে গেলেন শশধরবাবু। রাজবন্দিদের পুনর্মিলন উৎসব থেকে নিখিল বঙ্গ মাংস ব্যবসায়ী সমিতির বার্ষিক সম্মেলন, বজরঙ্গবলী ব্যায়ামাগারের পুরস্কার বিতরণী উৎসব থেকে জগমোহিনী উচ্চ বালিকা বিদ্যালয়ের ক্রীড়া প্রতিযোগিতা–সভায় যাওয়া নেশার মতো হয়ে উঠল শশধরবাবুর।
কর্মজীবনে বাড়িতে তবু সকাল সন্ধ্যা থাকতে হত তাকে। এখন আর তাও থাকেন না। সংসারে তার খুব কাজ বা প্রয়োজন নেই, তার অনুপস্থিতি নিয়ে কেউ বড় একটা মাথা ঘামায় না তিনি নিজেও বেঁচে যান ঝামেলা, ঝগড়া, খিটিমিটির মধ্যে থাকতে হয় না। শাশুড়ি বধুর কলহে যখন তার বাড়ির ত্রিসীমানায় কাকপক্ষীটি পর্যন্ত বসতে সাহস করছে না তখন তিনি চেতলা বাজারের নতুন তরকারির স্টল উদ্বোধন অনুষ্ঠানে বক্তৃতা করছেন: মানুষের জীবনে সবুজ তরকারি কতটা প্রয়োজনীয়, রবীন্দ্রনাথ লিখেছেন–ওরে নবীন, ওরে আমার কঁচা, ওরে সবুজ ইত্যাদি ইত্যাদি।
সকালে ঘুম থেকে উঠে দাড়ি-টাড়ি কামিয়ে স্নান করে ফিটফাট হয়ে ধুতি-পাঞ্জাবি পরে চা আর রুটি-তরকারি খেয়ে শশধরবাবু রুদ্ধশ্বাসে বেরিয়ে পড়েন, পথে যেতে যেতে সেদিনের বক্তৃতার বিষয়টা একবার ভেবে নেন। তারপর সকালের অনুষ্ঠান শেষ হলে তাড়াতাড়ি বাড়ি ফিরে ভাত খেয়ে একটু বিশ্রাম। অনেকদিন, বিশেষ করে শীতকালে, দুপুরের দিকেও সভাসমিতি পাওয়া যায়, সেদিন আর বিশ্রামের অবকাশ থাকে না। আবার কোনও দিন গৃহযুদ্ধের মধ্যে বিশ্রাম করা অসম্ভব হয়ে ওঠে, সেদিন হাঁটার উদ্দেশ্যে বেরিয়ে পড়েন। আস্তে আস্তে বিকেলের সভায় গিয়ে পৌঁছান। হঠাৎ যদি কখনও এমন হয়, কাছাকাছি বা কিছু দূরেও কোনও পছন্দমতো অনুষ্ঠান না পান, সেদিন সন্ধ্যাটা কেমন ফাঁকা ফাঁকা লাগে, মাটি হয়ে যায়।
বক্তৃতা জিনিসটা সোজা কাজ নয়। ভাল বক্তা সহজে পাওয়া যায় না। এদিক ওদিক নানা জায়গায় নানা রকম বক্তৃতা করে ক্রমশ শশধরবাবুর নাম ছড়িয়ে পড়ল। তাকে আর নিজে থেকে যেতে হয় না, আজকাল কিছুদিন হল বক্তৃতার জন্যে রীতিমতো ডাক আসা শুরু করেছে তার। শুধু কাছে পিঠে নয়, গড়িয়া দমদমে তারপরে একদিন কাকদ্বীপে একদিন উলুবেড়িয়ায় তিনি বক্তৃতা করে এলেন। যেকোনও সভায় সানন্দে যেতে শশধরবাবু প্রস্তুত, তাঁকে নিয়ে গেলেই হল, তবে বুঝতে পারলে রাজনৈতিক সভা বর্জন করেন, সেটা একটু বিপজ্জনক মনে করেন তিনি।
এইভাবে মোটামুটি চলছিল। কিন্তু অন্য একটা বাধা এসে পড়ল। মাড়ির কয়েকটা দাঁত আগেই পড়ে গিয়েছিল, হঠাৎ সামনের দুটো নড়বড়ে দাঁত এক সপ্তাহের মধ্যে পড়ে গেল।
ফোকলা দাঁতে বক্তৃতা করা শুধু কঠিন নয় হাস্যকরও বটে। বাধ্য হয়ে ডেনটিস্টের কাছে যেতে হল শশধরবাবুকে। দাঁতের ডাক্তার ভাল করে দেখে বললেন, সব দাঁতেরই প্রায় শেষ অবস্থা। সবকটাই তুলে ফেলে দুপাটি দাঁতই যদি বাঁধিয়ে ফেলেন, পরে হাঙ্গামা কম হবে।
অগত্যা তাই করতে হল। সব দাঁত তোলা, তারপর বাঁধানো–সব মিলিয়ে প্রায় দশ-পনেরো দিন নষ্ট হল। এই সময়টুকু সভাসমিতি কিছুই করা হল না।
সে যা হোক, দাঁত বাঁধানোর পর নব উদ্যমে বক্তৃতার সমুদ্রে ঝাঁপিয়ে পড়লেন শশধরবাবু। নতুন দাঁত নিয়ে প্রথম দু-এক সপ্তাহ একটু অস্বস্তি হয়েছিল, তবে কিছুদিনের মধ্যে সব ঠিক হয়ে গেল, বরং বলা উচিত নতুন দাঁতে শশধরবাবুর বক্তৃতার তোড় বেড়ে গেল।
