ষাট বছর বয়েস পূর্ণ হতে সওদাগরি একটা অফিসের বড়বাবুর পদ থেকে অবসর নিলেন শশধরবাবু। এই উপলক্ষে একটা ছোটখাটো বিদায় সংবর্ধনা সভা হয়েছিল, সেখানে যথারীতি তার সহকর্মীরা এবং উপরওয়ালা কেউ কেউ শশধরবাবুর সুখী ও শান্তিপূর্ণ অবসরজীবন কামনা করে এবং তার উজ্জ্বল কর্মময় জীবনের প্রশংসা করে নাতিদীর্ঘ বক্তৃতা দিলেন।
সভার শেষে শশধরবাবুর পালা, বিদায়সভায় তাঁকেও অবশ্য কিছু বলতে হবে, এটাই রীতি।
একটু দূরেই বড়সাহেব, মেজসাহেব বসে রয়েছেন। এতকাল তাদের দেখলে শশধরবাবুর গলা শুকিয়ে যেত, মুখের মধ্যে জিব কেমন জড়িয়ে যেত, সাহেবদের প্রশ্নের উত্তরে কোনও রকমে হু হাঁ করে দায় সারতেন। চাকরি শেষ হয়ে যাওয়ার জন্যই হোক অথবা যেকোনও কারণেই হোক, আজ কিন্তু কোনও রকম বিচলিত বোধ করলেন না শশধরবাবু।
বরং বলা উচিত জীবনে তার এই প্রথম বক্তৃতা তিনি এমনভাবে দিলেন, সবাই চমকিত ও বিস্মিত বোধ করল। শশধরবাবু নিজেও খুব কম অবাক হলেন না।
উঠে দাঁড়িয়ে, বিদায় উপলক্ষে তার গলায় যে মোটা রজনীগন্ধার মালাটা পরিয়ে দেওয়া। হয়েছিল, সেটি পরিচ্ছন্নভাবে খুলে টেবিলের উপর রেখে চমৎকার বলতে আরম্ভ করলেন শশধরবাবু: প্রিয় সভাপতি, জীবনে এই প্রথম কোনও সভায় আমার কথা বলার সুযোগ হল, চিরকাল শুধু শুনেছি.. এইভাবে আরম্ভ করে সাবলীলভাবে বাক্যের পর বাক্য সাজিয়ে চললেন, এমন কী কালস্রোতে জীবন-যৌবন ভেসে যায়, কবে ছোটবেলায় রবীন্দ্রনাথে পড়েছিলেন, সেটা যে তার মনে আছে সেটা পর্যন্ত তিনি জানতেন না, সেইসব মর্মস্পর্শী কাব্যময় পংক্তি তার বক্তৃতার মধ্যে অনায়াসে ঢুকে গেল।
কবে পঁচিশ বছর আগে একটা সিলিং পাখা খুলে তার টেবিলের উপর পড়ে গিয়েছিল। একবার গুলি চলেছিল পুলিশের, দুপুরবেলা অফিসে বসে কিছুই জানতে পারেননি, সন্ধ্যায় রাস্তায় বেরিয়ে কারফিউ, আর বাড়ি ফিরতে পারেন না, অবশেষে অফিসে ফিরে এসে আরও কয়েকজনের সঙ্গে টেবিলের উপর শুয়ে রাতটা কাটিয়ে দিলেন। গল্পের মতো ঝরঝরে ভাষায় সব বলে গেলেন। শশধরবাবু।
আরেকবারের কথা বললেন শশধরবাবু, সেও দশ বছর আগের কথা। অফিস পালিয়ে টেস্ট ম্যাচ দেখতে গিয়েছিলেন ইডেন গার্ডেনে। মাঠে ঢোকার মুখে গেটের কাছে বড়সাহেবের সঙ্গে দেখা। কী রকম ঘাবড়ে গিয়েছিলেন, ভয় পেয়েছিলেন সেদিন–সেই সময় বড়বাবুর পদে তার প্রমোশনের ফাইলটা আবার বড়সাহেবেরই কাছে।
প্রায় তিরিশ চল্লিশ মিনিট ধরে প্রাঞ্জলভাবে বহু সুখ-দুঃখের কথা বললেন শশধরবাবু। বড়সাহেব রাশভারি লোক, উঠতে যাচ্ছিলেন, শশধরবাবু বলা আরম্ভ করতেই কিন্তু তিনি পর্যন্ত স্মিতহাস্যে চেয়ারে বসে শশধরবাবুর বক্তৃতা শুনতে লাগলেন।
শশধরবাবু শেষ করার পরে সমবেত শ্রোতৃবৃন্দ প্রায় পাঁচ মিনিট ধরে হাততালি দিল।
চাকরি থেকে বিদায় নেওয়ার সময় সকলেরই একটা বিষাদভাব মনে আসে। ভাল বক্তৃতা করতে পারার আবেগে ও আনন্দে শশধরবাবুর মনের মধ্যে কিন্তু বিষাদভাবটা রইল না। বরং অবসর জীবনে সময় কাটানোর মতো একটা নতুন দিকের সন্ধান পেয়ে গেলেন।
শশধরবাবু টালিগঞ্জে পৈতৃক বাড়িতে থাকেন। সেখানে মুখরা স্ত্রী এবং বাকনিপুণা একমাত্র পুত্রবধূর উঠতে বসতে কথার মারপ্যাঁচে তার জীবন ওষ্ঠাগত। তা ছাড়া দুই বালক নাতি রয়েছে, তাদের অত্যাচারও তার উপরে কিছু কম নয়।
সওদাগরি অফিসে বড়বাবুর কাজ করে শশধরবাবুর বুদ্ধি যথেষ্টই পাকা। বক্তৃতার দিকটা আবিষ্কার করার পরে তিনি মনে মনে একটা ছক কষে ফেললেন। তারপর ছক অনুযায়ী চলতে লাগলেন।
ব্যাপারটা আর কিছু নয়, সভা-সমাবেশের বিজ্ঞপ্তিগুলো একবার সকালবেলায় খবরের কাগজ পেয়েই খুঁটিয়ে দেখে নিতে হবে। সূর্যোদয়ের ক্ষণ থেকে মধ্যরাত পর্যন্ত কত রকমের অনুষ্ঠানে যে সারা দিনরাত ভরে থাকে এই শহরের অলিগলি, সেটা দু-চারদিনের মধ্যেই অনুধাবন করলেন শশধরবাবু।
যেমন ধরা যাক আজ সাতাশে জানুয়ারি, রবিবার। প্রথমে দেখতে হবে বাড়ির কাছাকাছি কী কী প্রোগ্রাম পাওয়া যায়। বাড়ির সবচেয়ে কাছে কেওড়াতলা শ্মশান এবং সুখের বিষয় সেখানে প্রায়ই কিছু না কিছু থাকে। মহাপুরুষের এবং ততো-মহানয় এমন পুরুষদেরও মৃত্যুতিথি অনেক সময়েই ঘটা করে পালিত হয় শ্মশানে। সবচেয়ে সুবিধে হল অনুষ্ঠানটা হয় প্রায় সকালের দিকে, ফলে বিকালের দিকে আবার অন্য অনুষ্ঠানে যাওয়া যায়।
কেওড়াতলা শ্মশানের ব্যাপারটা কয়েকদিনের মধ্যেই রপ্ত করে ফেললেন শশধরবাবু। স্বর্গত মহাপুরুষের কয়েকজন নিকট ও দূর সম্পর্কের আত্মীয়স্বজন, কয়েকজন অতি ধান্দাবাজ এবং কম সংখ্যক অতিশয় সরল প্রকৃতির লোক, একটি সাদা ফুলের মালা, পাঁচ টাকার সুগন্ধি ধূপ, একাধিক দেশাত্মবোধক গান তদুপরি কিছু বক্তৃতা–পুরো ব্যাপারটার সরলীকরণ এভাবে করা যেতে পারে।
ওই বক্তৃতার জায়গাটায় ঢুকে গেলেন শশধরবাবু। প্রায় সব অনুষ্ঠানেই সভাপতির বাঁধাধরা গৎ আছে, আর কেউ যদি কিছু বলতে চান…অসংকোচে সঙ্গে সঙ্গে দাঁড়িয়ে যান শশধরবাবু। তারপর ঝড়ের মতো বক্তৃতা। বাগদেবী তখন শশধরবাবুর জিহ্বায় আরোহণ করেন, কিছু জানুন না জানুন, বিগত মহাপুরুষটি সম্পর্কে শশধরবাবু গড়গড় করে যে আত্মত্যাগ, যে সমাজ সচেতনতা… ইত্যাদি। দিয়ে আরম্ভ করে এনেছিলে সাথে করে মৃত্যুহীন প্রাণ দিয়ে শেষ করে দেন বক্তৃতা। অবস্থা বুঝে পাঁচ থেকে পনেরো মিনিট পর্যন্ত বক্তৃতা করেন তিনি। প্রায় সব সময়েই নতুন শ্রোতা পাওয়া যায়। শ্মশানের সভাগুলিতে। সাধারণত এক মহাপুরুষের মৃত্যুবার্ষিকীতে যাঁরা আসেন অন্য, প্রাতঃস্মরণীয়ের স্মরণ সভায় তাদের দেখা যায় না।
