.
আজও তাই প্রমাণ হল।
এই যে সাতসকালে সুদর্শন একটি ছেঁড়া বই হাতে এসেছে সেটি কোনও সামান্য বই নয়, একটি অতি মূল্যবান গ্রন্থ। বইটির নাম, তৈল বিজ্ঞান।
বইটি আমার দিকে এগিয়ে দিতে বইটির মলাটে তৈল বিজ্ঞান নাম দেখে আমি প্রথমে ভাবলাম হয়তো পেট্রল, ডিজেল জাতীয় কোনও যান্ত্রিক তেলের বিষয়-সংক্রান্ত বই। তারপরে ভাবলাম হয়তোবা কোনও হালকা লেখা, সরস রসিকতার বই, মানুষকে তেল দেওয়া সম্পর্কে ঠাট্টা করে কোনও লেখা।
কিন্তু তা নয়। বইটির পাতা খুলে দেখি অতি গুরুগম্ভীর বই। বইয়ের প্রতিপাদ্য বিষয় হল ঠিকমতো চিনতে পারলে সব জিনিস থেকেই তেল বের করা যায়। ধানের তুষ, ডালের খোসা, পাটের আঁশ ইত্যাদি থেকে তেল তো বেরোবেই, এমনকী ইট, কাঠ, পাথর থেকে তেল বের করা অসম্ভব নয়। শুধু চিনেবাদাম থেকেই তেল হয় তা নয়, চিনেবাদামের খোসা থেকেও তেল বেরোবে ঠিকমতো পেষণ করলে। আমের আঁটি, কঁঠালের বীজেও তেল আছে।
মলাট-ছেঁড়া বইটি দেখে লেখকের নাম জানা যাচ্ছে না, কিন্তু মনে হল তিনি যথেষ্ট পরিশ্রম করে গবেষণা করেছেন।
এ কথা বলতে সুদর্শন জানাল যে, সেও খুব খোঁজ নিয়েছে কিন্তু লেখক-গবেষকের নাম জানতে পারেনি। সে যা হোক, আজ সুদর্শন আমার কাছে এসেছে পরামর্শ নিতে। অবশ্য গ্রহণ করুক বা না করুক, সব ব্যাপারেই, সে পরিচয় হওয়ার পর থেকে সে আমার পরামর্শ চাইতে আসে।
আজ সুদর্শন আমার কাছে জানতে চাইল কী ধরনের ফলের বীজ থেকে তেল বের করা সঙ্গত মনে করি।
আমি এ বিষয়ে কখনও কিছু ভাবিনি। কিন্তু আমি কোনও মতামত দেওয়ার আগেই সুদর্শন আমাকে সাহায্য করল। ছেঁড়া বইটির একটি পাতা খুলে ধরে সে অঙ্গুলিনির্দেশ করল। দেখলাম সেখানে লেখা আছে, ফলের বীজের আকার যত ছোট হবে, তেল বের করা তত সহজ হবে।
এই জায়গাটা পড়ে আমার প্রথমেই মনে পড়ল আমার প্রিয় ফল পেয়ারার কথা। পাকা পেয়ারা, এমনকী কাঁচা বা উঁশা পেয়ারাতেও অসংখ্য ছোট ছোট, গোল গোল বীজ থাকে, ঠিক সরষের আকারে। সরষের তেলের মতো পেয়ারার বীজেও হয়তো চমৎকার তেল হবে।
কিন্তু আমি পেয়ারার কথা বলতেই সুদর্শন প্রবল আপত্তি জানাল। আমার মনে পড়ল, গোলাপ-পেয়ারার চাষ করে একবার সুদর্শন জব্দ হয়েছিল। তাই হয়তো তার এই আপত্তি।
আমি আর জোর করলাম না। একটুখানি চিন্তা করে আমি পেঁপের বীজের কথা বললাম। এক-একটা পাকা পেঁপেতে অজস্র বীজ থাকে। কাটা ফলের দোকান থেকে কুড়িয়ে আনলেই যথেষ্ট সংগ্রহ করা যাবে।
তবে সুদর্শন জানাল যে, সে ইতিমধ্যেই পেঁপের বীজ সংগ্রহ করার চেষ্টা করেছে। কিন্তু পেঁপের বীজ সংগ্রহ করা অসম্ভব।
আমি অবাক হয়ে জানতে চাইলাম, কেন?
সুদর্শন বলল, পেঁপের বীজের সাংঘাতিক দাম। পাকা পেঁপে যদি আট-দশটাকা কেজি, পেঁপের কালো বাছাই বীজ চল্লিশ-পঞ্চাশ টাকা কেজি।
আমার সামান্য বুদ্ধিতে আমি বললাম, সবাই বুঝি পেঁপের বীজের তেল বানাচ্ছে? তা চল্লিশ টাকা করে বীজ কিনলে সেটা চিপে এক কেজি তেল তৈরি করলে তার দাম হাজার টাকা পড়বে। অত দামি তেল কী কাজে লাগবে? কে কিনবে?
সুদর্শন আমাকে বোঝাল পেঁপের বীজের চাহিদা তেল তৈরির জন্য নয়, সে খোঁজ নিয়েছে যে, ওগুলোকে গোলমরিচের সঙ্গে সেদ্ধ করে রোদ্দুরে শুকনো হয়। তারপরে সেটাই হয়ে যায় গোলমরিচ। তখন সেই ভেজাল মশলা আড়াইশো টাকা কেজি।
সুতরাং পেঁপে চলবে না। সুদর্শনকে সাহায্য করার জন্য আমাকে আবার ভাবতে হল। বেশি ভাবতে হল না। তরমুজের কথা মনে পড়ল, তরমুজে প্রচুর বীজ হয়।
কথাটা বলতেই দেখলাম সুদর্শনও তরমুজের কথা ভেবেছে। তবে তার অসুবিধে হয়েছে তরমুজের বীজ পাওয়া নিয়ে। রাস্তাঘাটে কাটা ফলের দোকানে তরমুজের তেমন বিক্রি নেই। অথচ আস্ত তরমুজ যথেষ্ট পাওয়া যায়।
সুদর্শন বলল যে, সে হিসেব করে দেখেছে, সে যদি দৈনিক মাঝারি সাইজের বারোটা তরমুজের বীজ সংগ্রহ করতে পারে, তা হলে গড়পড়তা দৈনিক এক কেজি বীজ পাওয়া যাবে।
সুদর্শন আমার সাহায্য চাইল। সে দৈনিক বারোটা তরমুজ কিনে ছটা নিজে নেবে, বাকি ছটা আমাকে দিয়ে যাবে। তরমুজ খেয়ে তার বীজগুলো রেখে দিলেই হবে। সে পরের দিন তরমুজ দেওয়ার সময় বীজগুলো নিয়ে যাবে।
সুদর্শন অবিবেচক নয়। সে জানাল, তরমুজের সিজন বড়জোর মাসদুয়েক। এর মধ্যে চল্লিশ-পঞ্চাশ দিন আমাকে এই কষ্টটা করতে হবে।
আমিও অবিবেচক নই। সুদর্শনের অনুরোধ রক্ষা করেছি। এখন সকালবেলা ঘুম থেকে উঠে আধখানা তরমুজ খেয়ে হাঁটতে যাই। তারপর ফিরে এসে চায়ের সঙ্গে আধখানা তরমুজ খাই। একটু বেশি বেলায় জলখাবার দু গেলাস তরমুজের শরবত। দুপুরে ভাতের পাতে দই দিয়ে তরমুজ। এইভাবে
চলতে চলতে রাতে শোওয়ার আগে আস্ত একটা তরমুজ দিয়ে নৈশভোজ করে ঘুমোতে যাই।
ক্রমাগত তরমুজ খেয়ে খেয়ে আমিও তরমুজের মতো হয়ে গেছি। রীতিমতো গোলগাল। দেখলেই মনে হয় লোকটা খুব তরমুজ খায়। তবে তরমুজের বীজগুলো যত্ন করে রেখে দিই। প্রতিদিন তরমুজ দিয়ে যাওয়ার সময় সেগুলো সুদর্শন নিয়ে যায়। কিন্তু তরমুজের বীজের তেল কী কাজে লাগবে, সেটা তার কাছে এখনও জানা হয়নি।
দাঁত
০১.
তার নিজের ভিতরে যে এত বড় একটা গুণ লুকিয়ে ছিল সারাজীবনে শশধরবাবু টের পাননি, টের পেলেন তার কর্মজীবনের শেষদিনে।
