হঠাৎই একদিন সে এসে বলল, দাদা, ওজোন কথাটা কি ইংরেজি?
আমি বললাম, ইংরেজি হবে কেন? বাংলা ওজোন হল ইংরেজিতে ওয়েট।
সুদর্শন বলল, আপনি আমাকে অত মূর্খ ভাববেন না, সে আমি জানি। আমি যে ওজোনের কথা বলছি সেটা হাওয়ায় থাকে।
কলেজে আমার দুক্লাস বিজ্ঞান পড়া ছিল। যেটুকু মনে ছিল সেই ভুলসুদ্ধ বিদ্যায় আমি তাকে বুঝিয়ে বললাম, ওজোন প্রায় অক্সিজেনই, একটু মাত্রা বেশি, সমুদ্রের বাতাসে থাকে।
সুদর্শন বলল, ডাক্তার সেইজন্যে আমাকে স্বাস্থ্যের কারণে সমুদ্রের ধারে থাকতে বলেছেন। সাধারণ অক্সিজেন আমার চলবে না, আমার ওজোন চাই। আমি সেই ফ্ল্যাট ছেড়ে দিয়ে দিঘার কাছে একটা গ্রামে বাড়ি ভাড়া করে চলে যাচ্ছি।
সুদর্শন সেই গ্রামে উঠে গিয়ে আমাকে চিঠি দিয়েছিল, নিমন্ত্রণ করেছিল তার ওখানে যেতে। লিখেছিল যে, সে কাজুবাদামের চাষ করছে। আমি গেলে সে আমাকে প্রাণ ভরিয়ে কাজুর সন্দেশ, কাজুর হালুয়া, কাজুর পোলাও, এমনকী কাজুর চাটনি খাওয়াবে।
আমার অবশ্য আর যাওয়া হয়নি। কিন্তু সুদর্শন আমার সঙ্গে যোগাযোগ রেখেছিল।
দিঘা চলে যাওয়ার বছর তিনেক পরে তার কাছ থেকে একটা চিঠি পাই, সে বিশেষ কাজে কলকাতা আসছে, আমার সঙ্গেও দেখা করবে।
একদিন রাত বারোটা নাগাদ সে এল, অত রাতে ঘুম ভেঙে উঠে দরজা খুলে তাকে দেখে প্রথমে চিনতে পারিনি। রীতিমতো বিপর্যস্ত চেহারা। চিনতে পারার পর আমি তাকে জিজ্ঞাসা করলাম, এত রাতে?
সুদর্শন বলল, এই আপনার সঙ্গে একটু কথা বলেই চলে যাব।
আমি বললাম, কোথায় যাবে? কীভাবে যাবে? এত রাতে গাড়ি-ঘোড়া.
আমার কথা শেষ না করতে দিয়ে সে বলল, আমার জন্যে চিন্তা করবেন না, আমি হেঁটেই যাব, ভোর চারটেয় হাওড়া স্টেশনের সামনে থেকে দিঘার বাস ছাড়ে, একটু পরে হেঁটে বেরিয়ে গেলে সেবাসটা ধরতে পারব।
সে যা হোক, এর পর সে যা বলল তেমন কিছু সচরাচর শোনা যায় না।
দিঘায় সুদর্শন ভালই ছিল, বিশেষত সামুদ্রিক ওজোন বায়ু সেবন করে। কিন্তু দিঘার থেকে কয়েক কিলোমিটার দূরে যে গ্রামে সে বসবাস করছিল, সেখানে ভূঁড়োশেয়ালের খুব অত্যাচার।
খুব অল্প বয়সে ছেলেভুলানো ছড়ায় ডুড়োশেয়ালের কথা পড়েছিলাম এবং তার ছবি দেখেছিলাম। কিন্তু সত্যি সত্যিই যে ওই নামে একটা জীবন্ত প্রাণী এই পৃথিবীতে আছে, সুদর্শন না বললে সেটা জানতেই পারতাম না।
সুদর্শনের কাছেই জানা গেল ঘেঁকশেয়াল বা সাধারণ শেয়ালের চেয়ে উঁড়োশেয়াল অনেক বেশি মারাত্মক। তবে বেশি মারাত্মক এই অর্থে নয় যে, ডুড়োরা অন্য শেয়ালদের চেয়ে বেশি দংশনপ্রবণ, উঁড়োরা অন্যদের মতোই লাজুক স্বভাবের, মানুষ এড়িয়ে চলে, দিনের আলোয় বের হয় না, খুব বেকায়দায় না পড়লে আক্রমণ করে না।
তা হলে? আমার নিদ্রাজড়িত কণ্ঠে এই প্রশ্ন শুনে সুদর্শন সামান্য খুচরোয় জবাব দিল, হুক্কা হুয়া।
আমি বললাম, সে আবার কী?
সুদর্শন বলল, শেয়ালের ডাক শোনেননি?
আমি স্বীকার করলাম, তা শুনেছি।
এর পর সুদর্শন যা বলল তার সারমর্ম হল, উঁড়োশেয়ালও হুক্কা হুয়া করে, তবে সে অত্যন্ত কর্কশ কণ্ঠে এবং উচ্চনাদে। একশোটা ভাঙা কাঁসার থালা একসঙ্গে বাজালে যেরকম শব্দ হয়, প্রতিটি ডুড়োশেয়ালের কণ্ঠে সেইরকম ধ্বনি নির্গত হয়। তা ছাড়া অন্য জাতের শেয়ালেরা প্রহরে প্রহরে সবসুদ্ধ রাতে চারবার ডাকে। ভুড়োশেয়াল ডাকে ঘণ্টায়-ঘণ্টায় এবং একসঙ্গে দলে থাকে প্রায় পনেরো-বিশটা, যা অন্য শেয়ালদের তিন-চার গুণ।
সুদর্শন জানান যে, সে উঁড়োশেয়ালের অত্যাচার থেকে বাঁচতে একটি দোনলা বন্দুকের লাইসেন্স নিয়েছিল, কিন্তু একদিন রাতে গুলি চালিয়ে একটি উঁড়োশেয়ালকে আহত করার পরেই লোকমুখে সংবাদপেয়ে বন দফতরের লোকেরা এসে বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ আইনে তাকে গ্রেফতার করে এবং তার বন্দুকের লাইসেন্স বাজেয়াপ্ত করে। বহু কষ্টে এবং অর্থব্যয় করে সে এখন জামিনে খালাস আছে।
এত কথা শুনে আমার ঘুমভাব কেটে গিয়েছিল। আমি সুদর্শনকে জিজ্ঞেস করলাম, তা হলে এখন কী করবে?
সুদর্শন বলল, আজ ফিরে গিয়ে ওখানকার পালা চুকিয়ে কলকাতায় ফিরে আসব।
আমি জিজ্ঞেস করলাম, ওজোন? ওজোন ছাড়া তোমার অসুবিধে হবে না?
সুদর্শন বলল, তা হোক। ডাক্তার বলেছেন ওজোনের চেয়ে সুনিদ্রা অনেক বেশি জরুরি।
.
সুদর্শনের বিষয়ে বিস্তারিত লিখতে গেলে সে এক নতুন মহাভারত রচনা করতে হবে। সে কলকাতায় ফিরে এসেছিল এবং মূল শহরে আর বসবাস না করে বারুইপুরের দিকে বসবাস আরম্ভ করে।
ফলের দেশ বারুইপুরে যাওয়ার জন্যই হোক অথবা তার নিজের নবনব উন্মেষশালিনী বুদ্ধির জন্যই হোক বারুইপুরে এসে সুদর্শন নতুন নতুন ফলের চাষে মনোযোগ দেয়।
দুঃখের বিষয়, সে খুব সফল হতে পারেনি, তবে চেষ্টার ত্রুটি করেনি। সে পেয়ারাগাছের কলমের সঙ্গে গোলাপজামের কলমের মিশ্রণ ঘটিয়ে গোলাপপেয়ারা নামে একটা নতুন ফলগাছ তৈরির চেষ্টা করেছিল, যে-গাছের ফল খেতে হবে পেয়ারার মতো, কিন্তু তাতে গোলাপের গন্ধ হবে। সে বাঁশগাছ এবং আখগাছের সংমিশ্রণ ঘটিয়ে লম্বা ও সুমিষ্ট আখবাঁশের চেষ্টাও করেছিল। কিন্তু সফল হতে পারেনি।
তবু সুদর্শন সম্পর্কে একটা প্রশংসার কথা এখনে বলতেই হয়, বারবার ব্যর্থ হয়েও সে কখনও দমে যায়নি৷ একটা চেষ্টা যেই ছেড়ে দিয়েছে অন্য একটায় সঙ্গে সঙ্গে হাত দিয়েছে।
