এই রকম সব ছোটখাটো ব্যাপার নিয়ে ঝামেলা। কথাবিবি উচ্ছে সুক্তো করলেন, কথাসাহেব বললেন, উচ্ছে সেদ্ধ করলে না কেন? সে অনেক পুষ্টিকর।
সব কিছু নিয়েই দুজনার দুই মত। রাতে ভাত হলে কথাসাহেব বলেন, রুটি করনি কেন? রুটি হলে বলেন, ধুত্তোরি। সারাদিন অফিস কাছারি করে এসে এই শুকনো রুটি চেবানো যায়?
কথাবিবির সবচেয়ে অসুবিধে হয়েছে ডিম নিয়ে।
সব সময়ে সব বিষয়ে ঝগড়া করা যায় না।
সম্প্রতি কথাবিবি চেষ্টা করছেন ঝগড়াটাকে মোটামুটি আয়ত্তের মধ্যে রাখতে।
এখানে বলে রাখা ভাল যে স্বামী-স্ত্রীর অন্তর্নিহিত গোলমাল কখনও মেটার নয়। ষাট সত্তর বছরের দীর্ঘ বিবাহিত জীবনের শেষে বৃদ্ধ-বৃদ্ধাকে এখনও হামেশাই খুনসুটি করতে দেখা যায়। দাম্পত্যজীবনের সেটাই হল মূল মশলা।
সে যা হোক, এ গল্পের নাম ডিম। ডিমের প্রসঙ্গে গিয়েই কথাবিবি-কথাসাহেবের কাহিনি শেষ করতে হবে।
কথাসাহেব দৈনিক সকালে জলখাবারের সঙ্গে একটি করে ডিম খান। একেকদিন একেকরকম। কোনওদিন ডিমসেদ্ধ, কোনওদিন ওমলেট, কোনওদিন ডিমের পোচ।
কিন্তু অসুবিধে হয়েছে কথাবিবির। এরকম অসুবিধেয় অবশ্য অধিকাংশ স্ত্রীকেই পড়তে হয়।
কথাবিবি সেদিন সকালে ডিমের ওমলেট করলেন। খাওয়ার টেবিলে বসে ডিমের ওমলেট দেখেই নাক সিঁটকালেন কথাসাহেব, আবার ডিমের ওমলেট।
পরের দিন কথাবিবি ডিমসেদ্ধ করলেন। আজ আবার উলটো কথা, কথাসাহেব ডিমসেদ্ধ দেখে বলেন, আজ ডিমসেদ্ধ কেন, কাল ওমলেটটা বেশ ভাল হয়েছিল।
মহা বিপদ। ডিমের পোচ দিলে ওমলেট, ওমলেট দিলে ডিমসেদ্ধ, কথাসাহেব ঠিক যে কী চান কথাবিবি ধরে উঠতে পারেন না।
কিন্তু কথাবিবি স্বাভাবিক কারণেই সকালবেলায় জলখাবারের টেবিল থেকে গোলমালটা আরম্ভ করতে চান না। এরপরে সারাদিন আর দম থাকে না, বিকেলের দিকে ঝগড়াটা জুতসই হয়ে জমে না।
অনেক ভেবেচিন্তে কথাবিবি একটা মোক্ষম বুদ্ধি বার করলেন। কিছু অপব্যয় হবে বটে কিন্তু গোলমালটা এড়ানো যাবে।
কথাবিবি সেদিন সকালে একই সঙ্গে ডিমসেদ্ধ ডিমের পোচ আর ওমলেট তিনটেই করলেন। করে পাশাপাশি তিনটে প্লেটে সাজিয়ে স্বামীর সামনে ধরলেন।
কিন্তু কথাসাহেব তেমন সহজ লোক নন। ভুরু কুঁচকিয়ে তিনটি প্লেট অভিনিবেশ সহকারে পর্যবেক্ষণ করে আঙুল দিয়ে ডিমসেদ্ধটাকে দেখিয়ে স্ত্রীকে বললেন, ওই ডিমটা ওমলেট করা উচিত ছিল, আর ওই ওমলেটের ডিমটাকে পোচ।
এর পরে আর এ কাহিনি বাড়িয়ে লাভ নেই। কথাবিবি আর কথাসাহেবের টাগ অফ ওয়ার চলুক, সারা জীবন ধরে চলুক। প্রজাপতি ঋষির কাছে নিবেদন, প্রভু নজর রাখবেন। দেখবেন দড়িটা যেন ছিঁড়ে না যায়।
পুনশ্চ:
গল্পটা যখন ডিম নিয়ে, ডিমের পুরনো গল্পটাও একটু ছোট করে লিখি।
বাজার থেকে একটা ডিম কিনে এনেছিলাম। বাসায় এসে দেখি সেটা পচা। দোকানে ফেরত দিতে নিয়ে গিয়ে দোকানদারের ওপর খুব রাগারাগি করলাম।
বুড়ো দোকানদার অনেকক্ষণ চুপ করে বসে গালাগাল খেয়ে তারপর হাত তুলে আমাকে থামিয়ে তার ডিমের ঝুড়ির দিকে আমার দৃষ্টি আকর্ষণ করিয়ে আমাকে করুণ কণ্ঠে বললেন, স্যার, আপনার মাত্র একটা পচা ডিম তাই এত রাগারাগি করছেন আর আমার ঝুড়ি ভর্তি পচা ডিম আমি কী করি বলুন তো?
আমার এই ডিমের গল্প পড়ে কারওর যদি মাথাগরম হয়, দয়া করে ওই বুড়ো দোকানদারের কথাটা স্মরণ রাখবেন।
তরমুজের বীজ
আজ কয়েকদিন হল খুব গরম পড়েছে। সেই সঙ্গে মশার উৎপাতও খুব বেড়েছে। সারারাত মশারির মধ্যে গুমোটে হাঁসফাস করেছি। ভাল করে ঘুম হয়নি, ঘুম হওয়ার কথাও নয়।
ভোর হতে-না-হতে বারান্দায় এসে একটা বেতের মোড়া নিয়ে বসেছি। ভোরবেলার ঠান্ডা হাওয়া দিচ্ছে। বেশ আরাম লাগছে।
একা একা চুপচাপ বসে থাকতে বেশ ভাল লাগছিল। গরমের দিনে সকালের দিকে এই দু-এক ঘণ্টাই যা আরাম। কাছে-দূরে গাছের ডালে, ডালের আড়ালে পাখি ডাকছে। দুটো কোকিল যুগলবন্দিতে মেতেছে। একটা টিটি পাখি ডাকছে। সামনের উঠোনে শালিক, চড়ুই, সব নেমে এসেছে। কিচমিচ করছে। এমন সকালে কাকের ডাকও কর্কশ মনে হচ্ছে না।
বাইরে হালকা রোদ উঠেছে। সামনের রাস্তা দিয়ে টুংটাং করে অলস ভঙ্গিতে দু-একটা রিকশা যাচ্ছে সকালবেলার স্কুলের শিশুদের নিয়ে।
ভাবছি এবার চা খেতে উঠব। এমন সময় হন্তদন্ত হয়ে সুদর্শন সান্যাল এসে উপস্থিত। তার হাতে একটা ছেঁড়া বই। সুদর্শন সান্যাল, মানে এই সুদর্শনকে বহুকাল হল চিনি। অসময়ে হন্তদন্ত হয়ে ছুটে আসা তার পুরনো অভ্যেস। সাধারণত প্রায় বিনা কারণেই সে এরকম করে থাকে।
সুদর্শনের অতীত ইতিহাস এই সূত্রে একটু বলে রাখা অনুচিত হবে না। বছর কুড়ি আগে সে আমাদের পাড়ায় ঠিক আমাদের উলটো দিকের বাড়িতে ভাড়া এসেছিল সামনের দোতলাটায়।
মাত্র দেড় বছর ছিল। তার মধ্যেই তার সঙ্গে আমার পরিচয় এবং ঘনিষ্ঠতা, যা এখনও অব্যাহত রয়েছে।
সুন্দর খোলামেলা, দক্ষিণমুখী দোতলার ফ্ল্যাট ছিল সুদর্শনের। সে একাই একটা কাজের লোক নিয়ে থাকত। তার মা বাবা মেদিনীপুরের দিকে একটা গ্রামে ছেলের বাড়িতে থাকত। তখনও এবং এখনও সে বিয়ে করেনি।
সে যা হোক, এমন সুন্দর একটা ফ্ল্যাট আজকের বাজারে কেউ ছাড়ে! কিন্তু স্বাস্থ্যের কারণে সে ফ্ল্যাটটা ছেড়ে চলে গেল।
