কথাসাহেব আর কথাবিবির মধ্যে বনিবনা মোটেই নেই।
বনিবনা থাকার কথাও নয়। কবে আর স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে বনিবনা থেকেছে। দাম্পত্যজীবন এক দীর্ঘস্থায়ী টাগ অফ ওয়ার, কাছি টানাটানি খেলা, দুই পক্ষ দুদিক থেকে টানছে; কেউ হারছে না, কেউ জিতছে না। হঠাৎ যদি দুজনের কেউ টানাটানি ছেড়ে দেয়, অন্যজন সঙ্গে সঙ্গে মুখ থুবড়িয়ে পড়ে যায়।
তবে এর মধ্যে টানাটানি করতে করতে পঁচিশ-তিরিশ বছর চলে গেলে একই দড়ির দুপাশে ক্রমাগত দুজনে মিলে টানতে টানতে দুজনের কথাবার্তা, আচার-আচরণ এমনকী চেহারা পর্যন্ত একরকম হয়ে যায়। কোনও কোনও ক্ষেত্রে প্রায় মায়ের পেটের ভাইবোনের মতো হয়ে যায়।
কথাবিবি এবং কথাসাহেবের সম্পর্ক অবশ্য এখন পর্যন্ত এই পর্যায়ে আসেনি। পঁচিশ-তিরিশ নয়, এমনকী পাঁচ-দশও নয়, তাদের মাত্র দেড় বছরের পুরনো বিয়ে। তবে এরই মধ্যে মোক্ষম দড়ি টানাটানি শুরু হয়ে গেছে।
কথাবিবি যদি বাঁয়ে যেতে চান, অবশ্যই কথাসাহেব যেতে চাইবেন ডাইনে।
ডাইনে মানে, ধর্মতলার মোড়ে যদি রাজভবনের দিকে মুখ করে দাঁড়ানো যায় তাহলে কথাসাহেব যেতে চাইবেন শ্যামবাজার বা দমদমে, তার যৌবনের বারাণসীতে যেখানে হাল্পটি ডাল্পটি কিংবা থেটাবেটা ক্লাবে তার নিজের লোকেরা এখন তাস, পাশা কিংবা দাবা খেলছেন অথবা রাজা-উজির মারছেন।
আর কথাবিবি যেতে চাইবেন গড়িয়াহাটায় বা গোলপার্কে, সুদূর বাঁয়ে যেখানে অফুরন্ত শাড়ির দোকান, বেলোয়ারি, মনিহারি সামগ্রীর স্বর্গ।
বলে রাখা ভাল কথাবিবি-কথাসাহেবের বসবাস হাওড়ায়, আন্দুল রোডে, সেখান থেকে কোনও ছুটির দিন বিকেলে নবনির্মিত বিদ্যাসাগর সাঁকো পেরিয়ে তারা চৌরঙ্গি-ধর্মতলা অঞ্চলে বেড়াতে আসেন। চৌরঙ্গিতে আসা পর্যন্ত দুজনের কেউই কাউকে বলেন না কোথায় যেতে চান, কী উদ্দেশ্য, গোলমালটা লেগে যায় ধর্মতলায় পৌঁছানোর পরে।
বাদ-বিসম্বাদ, তর্ক-বিতর্ক, রীতিমতো উচ্চগ্রামের সে বিবাদ কোনও কোনও দিন এমন পর্যায়ে পৌঁছায় যে অনেক সময় অজ্ঞাত পরিচয় পথচারীরা পর্যন্ত তার মধ্যে অংশগ্রহণ করার সুযোগ পান।
সেই যে প্রচলিত কথা রয়েছে না, বিয়ের পরে প্রথম ছয়মাস স্বামী কথা বলে যায়, স্ত্রী শুনে যায়, তারপরের ছয়মাস স্ত্রী কথা বলে যায় স্বামী শুনে যায়। তারপর থেকে স্বামী-স্ত্রী দুজনেই কথা বলে যায়, তারা কেউই কারও কথা শোনে না, পাড়া-প্রতিবেশীরা শুনে যায়।
চৌরঙ্গির মোড়ে অবশ্য পাড়া-প্রতিবেশীর ব্যাপার নেই, এখানে যা শোনার পথচারীরা শোনে। তবে পাড়ার লোকেরা কেউ কেউ কখনও সখনও ছুটির দিনের বিকেলে কাজে-অকাজে এসপ্ল্যানেড বা ওই চৌরঙ্গি-ধর্মতলা অঞ্চলে এলে এদের ঝগড়া করতে দেখেছে। পরে পাড়ায় গিয়ে নিজেদের মধ্যে বলাবলি করেছে, এরা রাস্তায় বেরিয়ে পর্যন্ত নিজেদের মধ্যে ঝগড়া করে গোলমাল করে।
এর মানে অবশ্য এই নয় যে কথাবিবি আর কথাসাহেবের মধ্যে ভালবাসাবাসি নেই। কথা-দম্পতির প্রণয়ও অতি প্রগাঢ়।
পাড়া-প্রতিবেশীরাও সেটা বিলক্ষণ জানেন।
আন্দুলপাড়ায় হরিধনবাবুর আড়িপাতার স্ববাব আছে। তার স্ট্র্যাটেজি চমৎকার। যেসব বাড়িতে সেদিন খুব দাম্পত্য কলহ হয়েছে, রাতের দিকে হরিধনবাবু সেই সব বাড়িতে আড়িপাতার চেষ্টা করেন।
সবসময়ে যে হরিধনবাবু সফল হন তা নয় তবে একদা একটা চমৎকার কথোপকথন শুনেছিলেন কথা-দম্পতির বাড়ির দরজায় কান পেতে:
কথাসাহেব: ওগো আমাকে তুমি ভালবাস?
কথাবিবি: হুঁ
কথাসাহেব: আমি মরে গেলে তুমি কাঁদবে?
কথাবিবি: হু। হু।
কথাসাহেব: কেমন করে কাঁদবে? একটু কেঁদে দেখাও না।
কথাবিবি: কেমন করে মরবে? একটু মরে দেখাও না।
অতঃপর আর কানপাতার কোনও মানে হয় না। হরিধনবাবু নিঃশব্দে সরে গিয়েছিলেন, তবে তার মনে একটা খটকা দেখা দিয়েছিল, এই যে অবিশ্বাস্য বাক্যালাপ তার কর্ণগোচর হল, এটা ভালবাসার ডায়ালগ না কলহের ডায়ালগ। সে সমস্যা অবশ্য আমাদেরও রয়েছে।
কিন্তু গল্প বলতে বসে তো আর দ্বিধায় থাকলে চলবে না। কাহিনি, তা সে যত তুচ্ছই হোক, একটা পরিণতির দিকে এগোতেই হবে।
দিন দিন কথাসাহেব কথাবিবির মনোমালিন্য বেড়েই যাচ্ছে। কথাবিবি হয়তো একটা নতুন শাড়ি কিনলেন নীল রঙের, কথাসাহেব সেটা দেখে বললেন, আবার নীল?
কথাবিবি তখন বললেন, আবার নীল আসছে কোথা থেকে? বিয়ের পরে এটাই আমার প্রথম নীল শাড়ি।
কথাসাহেব হয়তো দামি সেলুন থেকে অতি আধুনিক ছাঁট দিয়ে চুল কেটে এলেন, বাড়িতে আসা মাত্র কথাবিবি জিজ্ঞাসা করলেন, তুমি কি নিজের ইচ্ছায় সজ্ঞানে চুল কেটে এলে, নাকি লোকে জোর করে ধরে তোমার চুল কেটে দিয়েছে?
পুরো ব্যাপারটা অবশেষে হেঁসেল পর্যন্ত পৌঁছে গেছে।
রবিবার সকালে বাজার থেকে শখ করে বড় বোয়াল মাছ নিয়ে এলেন কথাসাহেব। বাসায় এসে কথাবিবিকে বললেন, বড় বড় টুকরো করে কাঁচালঙ্কা দিয়ে পরিষ্কার ঝাল হবে।
কথাবিবি কিন্তু সেই বোয়াল মাছ হেঁসেলে ঢুকতে দিলেন না, বললেন, আমাদের বংশে বোয়াল মাছ খাওয়া নেই।
কথাসাহেব বললেন, বিয়ের পরে তোমার বংশ তোমাদের বংশে আর নেই, সেটা আমাদের বংশ হয়ে গেছে। আমাদের বংশে কালীপুজোয় বোয়ালমাছের ঝোল দিয়ে ভোগ দেওয়া হয়।
কথাবিবি ঠোঁট উলটিয়ে বললেন, তোমাদের আবার বংশ!
