তিনি আর পটললাল দুজনেই সোয়া পাঁচফুট। গাট্টাগোট্টা, কৃষ্ণকায়। দুজনেই জর্দা পান খান, দুজনেই ঝরঝর করে ভুল ইংরেজি বলেন। সবচেয়ে বড় কথা দুজনের নাম প্রায় এক রকম, পটললাল এবং প্রবললাল। অনেক ভেবেচিন্তে শেষ পর্যন্ত একদিন স্টুডিয়োতে আলাদা করে ডেকে নিয়ে, প্রবললাল পটললালকে প্রস্তাব দিলেন, পরিচালনার কাজ কিছু করতে হবে না, আমি আপনাকে একটা অনুরোধ করছি ফৌজদারি মামলাগুলোয় আপনি আমার ভূমিকায় অভিনয় করুন।
পটললাল অবাক হয়ে বললে, আপনার কথা কিছু বুঝতে পারছি না।
প্রবললাল বুঝিয়ে দিলেন, নানা ব্যাপারে ফেঁসে গেছি মশায়। অনেক রকম সত্যিমিথ্যে ফৌজদারি মামলা মার্ডার, কিডন্যাপিং, জাল-ভেজাল। অবশ্য শেষ পর্যন্ত কিছু হবে না, ভাল উকিল, টাউট লাগিয়েছি, টাকা খরচ করছি। আপনি যদি একটু সাহায্য করেন।
পটললাল বলল, এসব ব্যাপারে আমার কী করার আছে?
এবার প্রবল বললেন, দেখুন আমি আর আপনি দুজনেই লাল, প্রবললাল ও পটললাল। দুজনাই মাঝারি ধরনের প্রায় একই রকম দেখতে। অনেকগুলো মামলায় আমি জামিনে রয়েছি। বারবার তারিখ পড়ে, আদালতে যাই। কাঠগড়ায় দাঁড়াই। আবার জামিন পাই। ফিরে আসি। আমার ইচ্ছে, আপনি আমি সেজে আমার এই কাজগুলো করুন।
পটল বলল, তারিখে তারিখে গিয়ে কাঠগড়ায় দাঁড়াতে হবে? সে না হয় দাঁড়ালাম, কিন্তু যদি জামিন না হয়। জেলে যেতে হবে। কিংবা পুলিশ হাজতে।
প্রবলবাবু বললেন, জামিন না হলে হাকিম আছে। ভাগ্য খারাপ হলে দু-চারদিন হাজত বাস হতে পারে। তারপরে বেরিয়ে আসবেন। জেলখানা খারাপ জায়গায় নয়। আজকাল খাওয়া-দাওয়া ভাল। টিভি আছে। শোয়ার জন্যে কম্বল আছে। তারপর একটু থেমে পটলকে প্রবলবাবু বললেন, দেখুন আমি খোঁজ নিয়েছি, আপনার স্ত্রী আপনাকে বাসায় ঢুকতে দেয় না। রাতের বেলা কুকুরদের সরিয়ে এই স্টুডিয়োর বারান্দায় ঘুমোন। এর চেয়ে জেলখানা ভাল। ভাল মজুরি পাবেন। প্রতিবার কাঠগড়ায় দাঁড়ানোর জন্যে দুশো টাকা, আর জেল খাটতে হলে পাঁচশো টাকা।
নিজের বর্তমান অবস্থা বিবেচনা করে প্রবলবাবুর প্রস্তাবে পটললাল রাজি হয়ে গেছে। জেল খাটা নিয়ে তার মনে কিঞ্চিৎ সংস্কার ছিল, সেটাও অস্বাভাবিক কিছু নয়। কিন্তু সে সংকোচ দূর হয়েছে, প্রবলবাবুর আপ্তবাক্যে, আরে মামলায় জেল কি আপনি খাটবেন? খাটব আমি, কাগজপত্রে সব জায়গায় আমারই নাম থাকবে। আপনি আরামসে শুয়ে বসে কাটিয়ে দেবেন। জেলে মদ-সিগারেট যা চান পেয়ে যাবেন, আমি ব্যবস্থা করব।
.
পটললালের নতুন জীবন শুরু হয়েছে। এখনও জেল খাটতে হয়নি। তবে প্রায় নিয়মিত আলিপুর আদালতে, ব্যাঙ্কশাল কোর্টে কখনও-বা হাওড়ায় গিয়ে কাঠগড়ায় দাঁড়াতে হচ্ছে। তবে যে দাঁড়াচ্ছে সে পটললাল নয়, ডবল পটললালও নয়। সে হল, প্রবললাল, ডবল প্রবল।
ডিম
সাতদিন বা তিনদিনের নোটিশে, সম্পাদক মশায় যাই বলুন, জোরাজুরি করে যে হাসির রচনা হয় না, এই গল্পই তার প্রমাণ।
এই ডিম নামক গল্পটিকে কোনও সম্ভ্রান্ত পাঠক যদি আর্যভাষায় অশ্বডিম্ব বলে অভিহিত করেন তাহলেও বোধহয় আপত্তির কিছু থাকতে পারে না।
সে যা হোক, এই খারাপ গল্পের সূত্রে আর একটা বিপদের কথা জানিয়ে রাখি।
তরল রচনায় কথিকার পাত্র-পাত্রীর নামকরণ খুবই বিপজ্জনক ব্যাপার। চেনাজানা কোনও পুরুষ-মহিলার নামের সঙ্গে নাম মিলে গেলে সর্বনাশ। সঙ্গে সঙ্গে সে ধরে নেবে এ গল্প তাকে নিয়েই লেখা, আমি তাকে উপহাস করেছি, নিশ্চয়ই আমার মনে কোনও রাগ বা অভিসন্ধি আছে। অনেক পরিশ্রম করে মনোহর বা কেয়ামত আলি, জুলেখা বা শ্যামা নাম দিয়ে গল্প লিখে ভাবলাম যাক এবার বাঁচা গেছে, কেউ দাবিদার হয়ে গোলমাল বাধাবে না। তা কার্যত দেখা গেল এসব নামেও দু-চারজন করে আত্মীয়বন্ধু, পরিচিতজন আছেন, তারা কেউ দুঃখিত হয়েছেন, কেউ কোপাম্বিত হয়েছেন। ভাটপাড়া থেকে জুলেখা একটি চিঠি দিল অসহনীয় কুৎসিত ভাষায়, এদিকে খবর পাওয়া গেল বসিরহাটের উকিল কেয়ামত আলি–কবে আমার সঙ্গে কলেজে পড়েছে, এখন আমার গল্প পড়ে আমার নামে মানহানির মামলার কথা ভাবছে।
সুতরাং এবার আর কোনও ঝুঁকি নিচ্ছি না। তা ছাড়া এবারের ঘটনাটা এতই বাস্তব যে কোনও কারণে নামধাম মিলে গেলে আর রক্ষা পাব না।
হাসির গল্প লিখে নাজেহাল হওয়ার মতো বিড়ম্বনা সত্যিই আমার আর পোষাবে না। তাই অনেক রকম ভেবে চিন্তে এই গল্পের নায়ক-নায়িকার নাম দিলাম কথাসাহেব আর কথাবিবি।
আশাকরি, জগৎ সংসারে এরকম নামে কোথাও কেউ নেই। থাকলেও আমি প্রয়োজন হলে আদালতে পর্যন্ত হলফ করে বলতে পারি আমি তাদের মোটেই জানি না, চিনি না, তাদের কথা আমি কখনও শুনিনি।
বলাবাহুল্য, এটি একটি দাম্পত্য কাহিনি। এই কাহিনির নায়ক-নায়িকার নামকরণ দেখেই বুদ্ধিমতী পাঠিকা সেটা নিশ্চয়ই টের পেয়েছেন।
কথাসাহেব আর কথাবিবি স্বামী-স্ত্রী।
অবশ্য এই নারী-প্রগতির দিনে আজ কিছুদিন হল আমি স্বামী-স্ত্রী না লিখে স্ত্রী-স্বামী লিখছি, সেই সুবাদে বলা চলে কথাবিবি আর কথাসাহেব স্ত্রী-স্বামী।
ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র এই নগণ্য গল্পের গৌরচন্দ্রিকা বড় দীর্ঘ হয়ে গেল; ভণিতা ছেড়ে এবার আসল ঘটনায় যেতে হচ্ছে।
