সবচেয়ে ভাল ব্যবসা ছিল দুধে জল মেশানো। সে ব্যবসা অবশ্য ভগলু সিং তাঁর পোস্তার মশলার গদি থেকে চালাতেন না, সেটা চালাতেন জোড়াসাঁকোয় বাসাবাড়ি থেকে। পুরনো কেতার উঠোনওলা বাড়িতে চারটে গোরু বাঁধা থাকত, সেগুলো সবই কামধেনু। দৈনিক একশো লিটার, দুশো লিটার যত দুধই লাগুক অনাথ আশ্রমের চোরাচালানি মিল্ক পাউডার এবং কর্পোরেশনের জল মিশিয়ে প্রস্তুত হত। গোরু চারটে ছিল নেহাতই বিজ্ঞাপন।
কিন্তু গোরুর দুধের ভাল ব্যবসাটা উঠে গেল। কোনও উপায় ছিল না। বাজারে জলের বোতল এসে গেল, জলের বোতল এক লিটার বারো টাকা, জল অবশ্য কর্পোরেশনের কলের। এই জল মিশিয়ে দুধ বেচতে গেলে অন্তত তেরো টাকা দাম করতে হয়। কিন্তু বাজারে দুধের দাম তেরো টাকার কম। ফলে দুধে জল না মিশিয়ে জলে দুধ মেশানোই এখন লাভ। কিন্তু দুধ মেশানো জল বিক্রি করা জল মেশানো দুধ বিক্রি করার চেয়ে অনেক কঠিন। অল্প দুধ মেশানো ফ্যালফেলে, ট্যালটেলে জল বাজারে চালু করা অসম্ভব কাজ।
ভগলুবাবুর গদিতে প্রবললালের হাতে খড়ি হওয়ার শেষ পর্যায়ে এক বার ভগলুবাবু দেশে যান প্রবললালের ওপর গদির দায়িত্ব দিয়ে। দুঃখের বিষয় ভগলুবাবুর আর কলকাতা ফেরা হয়নি। সমস্তিপুরে পৌঁছানোর আগেই রেলগাড়ি থেকে ভগলু সিং অপহৃত হন। তাঁর পরিবারের লোকেরা বিরাট অঙ্কের টাকা পণ দিয়েছিলেন, কিন্তু ভগলুবাবুকে আর জীবিত অবস্থায় পাওয়া যায়নি। ধানবাদের এক হোটেলের ঘরে তার ছুরিকাবিদ্ধ মৃতদেহ পুলিশ উদ্ধার করে।
অনেকে বলেন এ সমস্ত ব্যাপারেই প্রবলবাবুর পূর্ণ ভূমিকা ছিল। ভগলু সিং অপহরণের টাকা তিনিই পেয়েছিলেন। তা ছাড়া বড়বাজারের মশলা ও জলের ব্যবসা সেটাও প্রবললালের হাতে চলে আসে।
ভগলু সিংহের সমস্তিপুরের আত্মীয়েরা কলকাতায় বড়বাজারে এসে কোনও পাত্তা পাননি। একটা দেওয়ানি মামলা হয়েছিল, সেটাও কালক্রমে ভেস্তে যায়।
প্রবললালের হাতে ব্যবসা রমরমিয়ে উঠল। তাঁর বহুমুখী প্রতিভা। প্যাকেটে গুঁড়ো মশলার ব্যবসা করলেন, নাম দিলেন খাঁটি (KHANTI), অবশ্য খাঁটির অধিকাংশই ভেজাল।
তবে তার প্রধান কৃতিত্ব হল গোলমরিচ উৎপাদক হিসেবে। এই কলকাতা শহরে এবং শহরতলিতে যত কাটাফলের দোকানদার আছে, তারা প্রত্যেকে প্রবলবাবুর কাছ থেকে মাসে মাসে একশো টাকা করে মাসোহারা পায়। এর বিনিময়ে প্রতি সপ্তাহে একদিন তারা সারা সপ্তাহে যত পেঁপে কেটে বিক্রি করেছে তার বিচিগুলো দিয়ে যায়। বিবাদীবাগের ভিতরে ট্রামলাইনের পাশে বড় বড় তালপাতার মাদুরে প্রবলবাবুর লোকেরা এই সব বিচি শুকিয়ে নেয়। শুকিয়ে পাকা পেঁপের কালো বিচি অবিকল গোলমরিচের মতো দেখতে হয়।
এদিকে প্রবলবাবু গোলমরিচের গুদাম থেকে শূন্য বস্তাগুলি কিনে আনেন। পাটের বস্তার গায়ে, খাঁজে খাঁজে গোলমরিচের গুঁড়, ভাঙা গোলমরিচের অংশ লেগে থাকে। পেঁপের শুকনো বিচিগুলো এই সব বস্তায় ভরে ভাল করে ঝাঁকালে সেগুলোর গায়ে খাঁটি গোলমরিচের ঝাঁঝ-গন্ধ লেগে যায়। তখন খাঁটির প্যাকেটে অল্প কিছু আসল গোলমরিচের সঙ্গে এগুলো ভরতি করে খাঁটি গোলমরিচ বাজারে বিক্রি করা হয়।
গোলমরিচ অতি মূল্যবান মশলা। প্রবলবাবু ফুলে ফেঁপে উঠেছেন। এর পরে এত কাঁচা টাকার সদ্ব্যবহার করার উদ্দেশ্যে বড়বাজার সমীপবর্তী চিৎপুরে যাত্রা ব্যবসায় দৃষ্টিপাত করেন। সেখানেই তাঁর পটললালের সঙ্গে আলাপ।
এরপর নানা চোরাপথে ঘুরতে ঘুরতে দুজনেই টালিগঞ্জে সিনেমালাইনে এসে পৌঁছেছেন। দুজনে একসঙ্গে প্রায় কখনওই কাজ করেননি, সম্প্রতি বিবি বাজার চলচ্চিত্রায়নের ব্যাপারে পটলবাবুর সঙ্গে সংযুক্ত হয়েছেন। তিনি প্রযোজক, পটলবাবু সহকারী পরিচালক।
০৪. ডবল পটললাল
যারা জানেন না তাদের অবগতির জন্যে লিখছি, অধিকাংশ ক্ষেত্রেই চলচ্চিত্রের সহকারী পরিচালকের কাজ চণ্ডীপাঠ থেকে জুতো সেলাই পর্যন্ত সব কিছু।
সহকারী পরিচালক পটললাল তার অভিজ্ঞতা থেকে জানে যে এই সব বহুবিধ কাজের মধ্যে পড়ে:
ক। প্রযোজক মহিন্দরের বর্তমান রক্ষিতার অতিরিক্ত অনুসন্ধিৎসু প্রাক্তন স্বামীকে গুণ্ডা দিয়ে ভয় দেখানো,
খ। পরিচালকের বেকার ভাইপোকে সিডিউন্ড কাস্ট সার্টিফিকেট সংগ্রহ করে দেয়া, পরিচালক অবশ্য বর্ণহিন্দু।
গ। নায়িকার মদ্যাসক্ত স্বামীকে চোখে চোখে রাখা এবং মদ্যপানে সঙ্গদান করা। অর্থাৎ, চিত্র পরিচালনা ছাড়া আর সব কিছুই সহকারী পরিচালককে করতে হতে পারে। পটললালও তা করেছে। কিন্তু এখন পটললালকে যা করতে হচ্ছে, তা অসম্ভব, অবিশ্বাস্য।
পটললালকে ডবল হতে হচ্ছে, প্রবলের ডবল।
প্রবললাল চলচ্চিত্রের প্রযোজক হলেও তিনি কোনও অভিনেতা নন। তাঁর বিবি বাজার সিনেমায় ডিসুম-ডুসুম ফাঁইটিং সিন অবশ্যই থাকছে কিন্তু সে তো নায়ক এবং ভিলেনের মধ্যে, তিনি তো আর সেসব নিজে করতে যাচ্ছেন না।
আসলে অভিনয়ে নয় জীবনে প্রবললালের ডবল প্রয়োজন। নানা ধরনের ছোট বড় ফৌজদারি মামলায় প্রবলকে প্রায় নিয়মিত আদালতের কাঠগড়ায় দাঁড়াতে হয়, জেলে বা পুলিশ হাজতেও যেতে হয়।
এই কাজটা প্রবলবাবুর মতো ব্যস্ত ব্যবসায়ীর পক্ষে করা সম্ভব নয়। প্রবলবাবু পটললালের মধ্যে তার দ্বৈত সত্তা খুঁজে পেয়েছেন।
