কেউ কেউ হয়তো পঙক্তিগুলি চিনতে পারছেন, শরৎচন্দ্রের বিরাজ বৌ উপন্যাসের আরম্ভ এই ভাবে। সেই বিখ্যাত উপন্যাস অবশ্য রচিত হয়েছিল আরও চল্লিশ-পঞ্চাশ বছর আগে।
সে যা হোক, পঞ্চাশ বছর আগে সেই গত শতকের পাঁচের দশক নাগাদ শরৎচন্দ্রের উপন্যাসের খুব রমরমা বাংলা সিনেমায়। সেই ছবি বিশ্বাস, জহর গাঙ্গুলি, মলিনা দেবী, সুনন্দা ব্যানার্জি, সন্ধ্যারানীর কম্বিনেশন। হৃদয়ের তন্ত্রীতে মোচড় দেয়া, চোখের জলে ভেজা সেসব কাহিনি বাঙালি মানসকে আপ্লুত করে রেখেছিল।
এই সব শরৎচন্দ্ৰীয় চলচ্চিত্রের প্রথমেই দেখা যেত শরৎচন্দ্রকে। সামনাসামনি নয়। সেটা সম্ভব ছিল না, শরৎচন্দ্র পনেরো-বিশ বছর আগে পরলোক গমন করেছেন। পিছন থেকে দেখা যেত, পক্ক কেশ, সাদা পাঞ্জাবি পরিহিত এক প্রৌঢ় ভদ্রলোক চেয়ারে বসে টেবিলে মাথা গুঁজে লিখে চলেছেন।
হুগলি জেলার সপ্তগ্রামে দুই ভাই.প্রায় দু মিনিট ধরে উপন্যাস লিখনরত শরৎচন্দ্রকে দেখিয়ে ছবি শুরু হল।
সাধারণ দর্শক হয়তো মনে করত সত্যি সত্যি শরৎচন্দ্রের ছবি, হয়তো আগে তোলা ছিল, তাই দেখানো হচ্ছে।
কিন্তু ব্যাপারটা যে তা নয়।
দক্ষিণ কলকাতার এক বহু পরিচিত সিনেমা হলের সংলগ্ন এক রেস্তোরাঁর ম্যানেজার ছিলেন শরৎবাবু। ভদ্রলোকের নাম অবশ্য শরৎবাবু ছিল না, বোধহয় ফণিবাবু বা মণিবাবু ছিল, কিন্তু লোকমুখে তার নাম হয়ে গিয়েছিল শরৎবাবু। ১৭৬
কারণ তিনি শরৎচন্দ্রের উপন্যাস নিয়ে তৈরি সিনেমাগুলোয় শুরুতে কাগজ কলম নিয়ে উপন্যাস রচনারত শরৎচন্দ্রের ডামি হতেন। পিছন থেকে তোলা ছবিতে তাকে শরৎচন্দ্রের লেখা লিখতে হত।
একালের ভাষায় বলা চলে, ওই ফণিবাবু বা মণিবাবু ছিলেন শরৎচন্দ্রের ডবল।
ডবল ব্যাপারটা আজকাল মোটামুটি সবাই বোঝেন। রাজনীতি এবং সিনেমায় ডবলের খুবই প্রয়োজনীয় ভূমিকা রয়েছে।
কলকাতায় অবশ্য এরকম ঘটে না কিন্তু কাছাকাছির মধ্যে পাটনা গেলেই দেখা যাবে রাজপথে আগে-পিছে দুটো গাড়ি যাচ্ছে। দুটো গাড়িতেই মাননীয় লালুপ্রসাদ বসে আছেন। এর একটা আসল, দ্বিতীয়টি নকল। লালুপ্রসাদ ডবলের ওই একই রকম চেহারা, জামাকাপড়, দেহাতি কেশবিন্যাস। চট করে দেখলে বোঝার উপায় নেই, কে আসল লালুপ্রসাদ। শত্রুপক্ষের সম্ভাব্য আক্রমণের হাত থেকে পরিত্রাণের এটা একটা উপায়।
দিল্লিতে প্রধান নেতাদের ডবল ব্যাপারটা জলভাত। পাকিস্তানে নাকি পাঁচটা মোশারফ আছে। ইরাকে সাতটা সাদ্দাম হোসেন। রাশিয়া-আমেরিকাতেও প্রথাটি অবিদিত নয়। বরং বলা উচিত রাজনৈতিক নেতাদের ক্ষেত্রে, রাষ্ট্রপ্রধানদের ক্ষেত্রে ডবল-ট্রিপল বা ততোধিক অস্তিত্ব রচনা এই সব বড় বড় রাষ্ট্রশক্তির মস্তিষ্ক প্রসূত।
সিনেমা ডবলের আবির্ভাব অবশ্য এসবের চেয়ে অনেক সরল কারণে। বলিউডের প্রথম সারির নায়কদের অনেক সময়েই আগুনের মধ্যে ঢুকে গিয়ে নায়িকাকে কোলে করে তুলে আনতে হয়, মোটর গাড়ি চাপা পড়তে হয়, পাহাড় চূড়া কিংবা বহুতল প্রাসাদের অলিন্দ থেকে লাফিয়ে পড়তে হয়। তারকাগণ নৃত্যগীতে এত ক্লান্ত ও ব্যাপৃত থাকেন যে এই সব কষ্টসাধ্য এবং বিপজ্জনক কাজ তারা করেন না।
বোম্বে সিনেমায় শুধু নয় হলিউডেও একই ব্যবস্থা। বলা বাহুল্য, সিনেমার ডবলেরা আসলে স্টান্টম্যান। কোনও নায়কের মতো শরীর, স্বাস্থ্য, উচ্চতা, তাদের পরনে নায়কের পোশাক। ক্যামেরা অদ্বিতীয় নায়কদের এই দ্বিতীয় সত্তাকে সামনাসামনি ধরে না। তাহলে কারসাজি ধরা পড়ে যাবে। পাশ থেকে কিংবা পিছন থেকে এদের ছবি দেখানো হয়।
০৩. প্রবললাল
ডবল পটললাল কাহিনির প্রায় অর্ধেক চলে গেল ডবল শব্দের ওপরে আলোচনা করে, এখন। পটললালকে অবশ্যই ধরতে হবে।
কিন্তু তার আগে শ্রীযুক্ত প্রবললালের কথা না বলে উপায় নেই। এর কারণ এই যে আমাদের পটললাল হল প্রবলবাবুর ডবল।
শ্রীযুক্ত প্রবললাল এক মধ্যবয়েসি শিশ্নোদর পরায়ণ দেহাতি ভদ্রলোক। বিহারের এক। জেলাশহরের উকিলের মুহুরির ছেলে। ঝরঝরে বাংলা বলেন সামান্য বিহারি টানে। বড়বাজারে গোলমরিচের ব্যবসা। সম্প্রতি চলচ্চিত্র প্রযোজনায় নিজেকে নিযুক্ত করেছেন। তার আগামী প্রযোজনা বিবি বাজার বইয়ের অন্যতম সহকারী পরিচালক হলেন পটললাল।
প্রযোজক প্রবলবাবুর পুরো নাম প্রবল প্রতাপ লাল। সমস্তিপুর আদালতের সরকারি উকিলের মুহুরি তার বাবা রামপ্রতাপ লালার ইচ্ছে ছিল তার বি.এ. ফেল ছেলে প্রবলকে মুহুরির কাজেই নিজের কাছে রেখে দেবেন।
কিন্তু প্রবল প্রতাপ মুহুরি বৃত্তির মতো সামান্য কাজে নিযুক্ত থাকার জন্য জন্মগ্রহণ করেননি। ইতিমধ্যে তিনি পৈতৃক নাম সংক্ষিপ্ত করে ফেলেছেন। মধ্যপদ প্রতাপ বিসর্জন দিয়েছেন, লালার আকার উড়িয়ে দিয়েছেন, এখন শুধু প্রবললাল।
রামপ্রতাপের অনিচ্ছা সত্ত্বেও প্রবললাল একদিন সব দেহাতির স্বপ্নশহর কলকাতায় চলে এলেন সামান্য একটা কাজ নিয়ে। কলকাতায় বড়বাজারে সমস্তিপুরের ভগলু সিংয়ের একটা মশলার দোকান আছে। ভগলুবাবুর সঙ্গে প্রবললাল কলকাতায় চলে এলেন, তাঁর মশলার দোকানে সহকারীর কাজে।
ভগলু সিংয়ের এই মশলার দোকান থেকেই প্রবলবাবুর উন্নতির শুরু। এখানেই প্রবলবাবু ক্রমশ জানতে পারেন ভেজাল মহিমা। কী করে সস্তা সাদা তেল রং মিশিয়ে এবং ঝঝের জন্য সজনে গাছের শুকনো ছাল মিশিয়ে সরষের তেল হয়। কী করে লঙ্কাগুঁড়োয় লাল ইটের মিহিগুঁড়ো মেশাতে হয়।
