এরপর পটললালকে সান্ত্বনা দিয়ে বললেন, দু-চার দিন পরে স্নান করাতে গেলেই ব্যাপারটা ধরা পড়ত। বৃষ্টিতে ভিজে আগেই হয়ে গেল।
ঘটনার অভিনবত্বে পটললালের মতো পোড় খাওয়া লোক স্তম্ভিত হয়ে গিয়েছিলেন, একটু আত্মস্থ হয়ে বললেন, তা হলে খান্ডোলিয়া সাহেবকে খবর দিই।
সহদেব ডাক্তার বললেন, কোনও প্রয়োজন নেই। আপনি বরং দোকানে গিয়ে এক কৌটো কালো জুতোর কালি আর একটা ভাল দেখে বুরুশ নিয়ে আসুন।
পটললাল বেরিয়ে গেলেন। দরজা বন্ধ হওয়ার পর মম মজুমদার ডিভানে উঠে বসলেন, গায়ের কাপড়-চোপড় ঠিক করলেন। তারপর কুকুরটাকে কোলে নিয়ে সহদেব ডাক্তারকে বললেন, আপনি? আপনাকে চিনলাম না তো?
সহদেব বললেন, আপনি আমাকে চিনবেন না। তবে আপনি আমার টাকায় ভুজঙ্গভূষণের সঙ্গে হাওয়াই দ্বীপে গিয়েছিলেন।
কথার মধ্যেই কালি বুরুশ নিয়ে পটললাল ফিরে এলেন। সহদেব ডাক্তার মমকে জিজ্ঞাসা করলেন, আপনি কী রকম কুকুর পছন্দ করেন, সাদা না কালো?
শ্ৰীমতী মম মজুমদার কিছু বলার আগেই পটললাল তার কোল থেকে কুকুরটাকে নামিয়ে মেজেতে শুইয়ে জুতো পালিশ করার মতো করে কালো কালি লাগিয়ে জোর বুরুশ চালাতে লাগলেন।
পাঁচ মিনিটের মধ্যে শ্রীমতী মম মজুমদারের চোখের সামনে সাদা কুকুরটা কালো কুকুর হয়ে গেল। সিঙ্গাপুর থেকে যেমন এসেছিল তার চেয়েও কুচকুচে কালো।
.
পুনশ্চ।
এই কাহিনির নাম হওয়া উচিত ছিল, কুকুর ও পটললাল। কিন্তু যখন টালিগঞ্জে পটললাল নাম দিয়ে গল্পটা শুরু করি ভেবেছিলাম গল্পের পটভূমিকা টালিগঞ্জেই রাখব।
সামান্য কারণে সেটা সম্ভব হল না। কয়েকদিন হল টালিগঞ্জের এক আর্ট ফিল্মের পরিচালক আমার একটা রচনা নিয়ে খোঁজখবর নিচ্ছেন। এ অবস্থায় এসব নিয়ে হাসাহাসি করার সাহস পাচ্ছি না। তবে কারও যদি এক নজরেই শ্রীমতী মমকে দেখে পছন্দ হয়ে থাকে তাকে জানাই শ্রীমতাঁকে নায়িকা করে আরেকটি কাহিনিতে আমি অবিলম্বে হাত দিচ্ছি।
ডবল পটললাল
০১. হট্টমন্দির
পরিণাম, পরিণতি এসব মোটেই ভাল শব্দ নয়। বিশেষ করে পটললাল বিষয়ে কোনও রচনার নাম একটু হালকা রকম হওয়াই নিয়ম।
পটললালকে আপনারা অনেকেই অল্পবিস্তর চেনেন। লাল গানে নীল সুর হাসিহাসি গন্ধ, পটললালের গল্প হবে ফুরফুরে মেজাজের, অবশেষে তার কিনা এই পরিণতি।
.
অনেক দিন আগে একটা বিলিতি সিনেমা হয়েছিল, দেয়ার ইজ নো বিজিনেস লাইক শো বিজিনেস, অর্থাৎ শো বিজিনেসের মতো বিজিনেস নেই।
আমাদের পটললাল আদ্যন্ত এই শো বিজিনেসের লোক। যাত্রা-থিয়েটার-সিনেমা বেতার-দূরদর্শন এই সব নিয়ে যে বৃহৎ রঙ্গজগৎ সেই জগতের লোক পটললাল, তার স্ত্রী সুলেখা এককালের নামকরা নর্তকী। তখন অবশ্য সুলেখার সঙ্গে পটললালের সদ্ভাব চলছে না। তা না চলুক এ গল্পে সুলেখাকে আমরা টানব না।
রঙ্গজগতের ভিতরে এবং বাইরে নানা ঘাটের জল খেয়ে অবশেষে পটললাল সিনেমার টালিগঞ্জে এসেছে। তবে এ যাবৎ জীবিকার জন্যে পটললাল করেনি এরকম কাজ প্রায় নেই বললেই চলে।
জুতোর দোকানের ম্যানেজারি থেকে রাস্তার মোড়ে দাঁড়িয়ে ডাব বিক্রি, প্রয়োজনে যে কোনও কাজ পটললাল করেছে। তার সহ্যক্ষমতাও অসাধারণ। নিজের থাকা-খাওয়া নিয়ে তার কোনও বাধ্যবাধকতা নেই।
সেই যে পুরনো একটা কথা আছে। ভোজনং যত্রতত্র শয়নং হট্টমন্দিরে। এ কথাটা বোধহয় পটললালের মতো লোক সম্পর্কেই একদা রচিত হয়েছিল।
হট্টমন্দির কথাটা খুব মজার। হট্ট মানে হাট, হাট বসে সপ্তাহে একদিন। বড়জোর দুদিন। অন্যান্য দিন হাটের চালাঘরগুলি শূন্য পড়ে থাকে। তখন যত রাজ্যের ভবঘুরে, ভিখিরি সেখানে রাত্রিযাপন করে। কখনও কখনও গৃহত্যাগী সন্ন্যাসীরাও এই সব শূন্য চালাঘরে রাত্রিযাপন করেন, সেই জন্য প্রাচীন টিপ্পনীওলা ব্যঙ্গার্থে হট্টমন্দির শব্দটা রচনা করেছিলেন।
পটললালের ক্ষেত্রে হট্টমন্দিরে রাত্রিযাপন কোনও ব্যাপারই নয়। ফুটপাথে, রেল স্টেশনের প্ল্যাটফর্মে, অচেনা বাড়ির বারান্দায় প্রয়োজনে-অপ্রয়োজনে অনেকেই রাত্রিযাপন করে।
পটললাল এসব জায়গায় ভাগ্য বিড়ম্বনায় অনেক সময়েই আশ্রয় গ্রহণ করেছে। এসব খুব বড় কথা নয়। পটললাল সকলের থেকে আলাদা একটি কারণে যে সে অনেক সময় কারার অন্তরালে রাত্রিবাস করে। কখনও পুলিশ হাজতে, কখনও জেল হাজতে।
তা, কারাবাস তো অনেককেই করতে হয়। ফৌজদারি মামলায় অনেকেরই তো কারাদণ্ড হয়। তা ছাড়া, মামলা চলাকালীনও আসামির জেলবাস বা হাজতবাস হয়। জামিন না পাওয়া পর্যন্ত।
.
হাসির গল্পে এসব জটিল আইনের কথা আনা উচিত হচ্ছে না। কিন্তু পটললাল যখন গল্পের নায়ক, এসব বিষয় চলে আসা মোটেই অস্বাভাবিক নয়।
চুরি-ডাকাতি রাহাজানি ইত্যাদি কোনওরকম দুষ্কর্মের জন্যে নয়, নিতান্তই পেটের দায়ে, জীবিকার প্রয়োজনে পটললালকে মাঝেমধ্যে আদালতের কাঠগড়ায় দাঁড়াতে হয় সেখানে সব সময়ে জামিন হয় না। তখন তাকে জেলে যেতে হয়। জেলখানা বা থানার হাজতঘরই পটললালের হট্টমন্দির।
০২. ডবল
একটু পিছন থেকেই শুরু করি।
বেশি নয়, এই চল্লিশ-পঞ্চাশ বছর।
.
…হুগলি জেলার সপ্তগ্রামে দুই ভাই নীলাম্বর ও পীতাম্বর চক্রবর্তী বাস করিত। ও অঞ্চলে নীলাম্বরের মতো মড়া পোড়াইতে, কীর্তন গাহিতে, খোল বাজাইতে এবং গাঁজা খাইতে কেহ পারিত না।….
