সাধারণ হোমিওপ্যাথিক ডাক্তারের চেম্বারে ধূমপান নিষেধ, এতে ওষুধের তেজ চলে যায়। তবে ডাক্তারবাবু সে জাতের চিকিৎসক নন। তার ওষুধের তেজ অত সহজে যাওয়ার নয়।
পটললাল সিগারেট খাওয়ার অনুমতি পেয়ে পকেট থেকে প্যাকেট বার করে সিগারেট ধরিয়ে এক গাল ধোঁয়া ছেড়ে কবুল করলেন, স্যার, আপনি বোধ হয় জানেন সিগারেটে সব সময় শানায়, গাঁজা চরস না খেলে মনে ঠিক তুরীয়ভাব আসে না। তা ক্যামাক স্ট্রিটের মোড়ের সেই পার্কে একটা বহু পুরনো গাঁজার ঠেক আছে। ওদিকের যত ড্রাইভার, দারোয়ান, পিয়ন, এমনকী কলেজের ছাত্র, অফিসের বাবুসাহেব দুপুরে ওখানে আসে। এমনকী একবার কলেজের দুটো মেয়ে এসেছিল। গাঁজার কলকিতে তাদের টান দেখে পুরনো গেঁজেলরা বলিহারি যায় আর কী। একটা মেয়ে তো এক টানে ফট করে কলকি ফাটিয়ে ফেলল। আরেক বার…
এসব অপ্রাসঙ্গিক কথায় সহদেব ডাক্তারের গোয়েন্দা মন বিরক্ত বোধ করছিল, তিনি পটললালকে থামিয়ে দিয়ে বললেন, ওসব থাক। আসল কথা তাড়াতাড়ি বলুন। কুকুর হারাল কী করে?
কিঞ্চিৎ অপ্রতিভ হয়ে পটললাল বললেন, সেই কথাই বলছি স্যার।
আমি পার্কে গিয়ে কুকুরটাকে কখনও ছেড়ে দিতাম না। এক পাশের রেলিংয়ে বেঁধে ও পাশের বকুল গাছতলায় ঠেকে গিয়ে বসতাম। এমন জায়গায় বসতাম যেখান থেকে কুকুরটার দিকে লক্ষ রাখা যায়। ধোঁয়ায়-আমেজে দু-আড়াই ঘণ্টা চমৎকার কেটে যেত।
সবই ঠিকঠাক চলছিল। কিন্তু বিপদ হল সেদিন। এই তো তিনদিন আগে, দুপুরবেলায় বেশ ঝলমলে রোদ ছিল। সবে কুকুরটা বেঁধে বকুলতায় গিয়ে দু ছিলিম টেনেছি, আকাশ অন্ধকার করে এল। কিছুক্ষণ পরে তুমুল বৃষ্টি, আমার কাছে ছাতা ছিল না, কিন্তু বাকিদের কাছে তিন-চারটে ছাতা ছিল, সেই ছাতার নীচে ভাগাভাগি করে বসে ঝরঝর বৃষ্টিতে আমরা মনের সুখে গাঁজা টানতে লাগলাম। বৃষ্টির গুঁড়ো গায়ে লাগছে, ঠান্ডা হাওয়া। সেদিনের গাঁজাটাও খুব সরেস ছিল স্যার।
সহদেব ডাক্তার ধমক না দিয়ে পারলেন না, বললেন, আসল কথা বলুন। বাজে কথা বলছেন কেন?
পটললাল আমতা আমতা করে বললেন, আসল কথা খুব সংক্ষিপ্ত স্যার।
ভাদ্রমাসের বৃষ্টি তো, জোর দুপশলা হয়ে একটু পরেই থেমে গেল। আমিও একটু পরে গাঁজার ঠেক ছেড়ে বেড়িয়ে পড়লাম। আগে লক্ষ করিনি, রেলিংয়ের কাছে এসে কুকুরটাকে শিকল খুলতে গিয়ে দেখি সর্বনাশ।
সহদেব ডাক্তার বললেন, সর্বনাশ মানে কুকুরটা নেই? এই তো?
কুকুরটা নেই, তা নয় স্যার। পটললাল বললেন, কালো কুকুরটা নেই, কুকুরটা বদল হয়ে গেছে, চেনে বাঁধা রয়েছে একটা সাদা কুকুর।
আশ্চর্য! রীতিমতো বিস্মিত ও চিন্তিত হলেন সহদেব ডাক্তার, তা হলে কুকুর চুরি হয়নি, কুকুর বদল হয়েছে। এরকম তো কখনও শুনিনি।
কিছুক্ষণ কী সব ভেবে নিয়ে সহদেব ডাক্তার জিজ্ঞাসা করলেন, পরের কুকুরটা এখনও আছে তো?
পটললাল বললেন, তা আছে। ওই পার্ক স্ট্রিটের ফ্ল্যাটেই আছে।
তড়াক করে লাফ দিয়ে উঠলেন সহদেববাবু। পটললালকে বললেন, চলুন একবার পার্ক স্ট্রিটের ফ্ল্যাটে গিয়ে কুকুরটা দেখি।
হাতের ঘড়িটা দেখে পটললাল বললেন, সাড়ে এগারোটা বাজে। এখনই যেতে চান?
সহদেববাবু বললেন, কেন, এখন অসুবিধে কী?
পটললাল বললেন, একটু ইতস্তত করেই বললেন, কয়েকদিন ব্যবসার কাজের চাপ থাকায় খান্ডোলিয়া সাহেব দুপুরে মম মজুমদারের স্ক্রিন টেস্ট নিতে পারেননি। বলেছিলেন আজ সকালে স্ক্রিন টেস্ট নেবেন। আমি মমকে খবর দিয়ে আপনার এখানে এসেছি।
গোয়েন্দাগিরি করতে গেলে দ্বিধা করলে চলে না। সহদেব ডাক্তার বললেন, চলুন। চলুন। এখন আর সকাল আছে নাকি মশায়। সকাল কখন চলে গেছে।
সহদেব ডাক্তার পটললালকে নিয়ে রাস্তায় বেরিয়ে একটা ট্যাক্সি ধরলেন।
কড়েয়া থেকে পার্ক স্ট্রিট পাঁচ মিনিটের রাস্তা। পটললালের পকেটে ফ্ল্যাটের ডুপ্লিকেট চাবি আছে। দোতলায় ফ্ল্যাটে উঠে চাবি দিয়ে দরজা খুলে ভিতর ঢুকলেন দুজনে।
খান্ডোলিয়া সাহেব নেই। বাইরের ঘরের ডিভানের ওপরে আলুলায়িত কেশ, শিথিল বসন শ্ৰীমতী মম মজুমদার শুয়ে রয়েছেন। তার বুকের মধ্যে মাথা গুঁজে একটা সাদা পমেরেনিয়ান কুকুর পরম নিশ্চিন্তে ঘুমুচ্ছে।
যতটা সন্তর্পণে সম্ভব মম মজুমদারের কোল থেকে সাদা কুকুরটা তুলে নিলেন সহদেব ডাক্তার। কুকুরটা উৎখাত করার সময় চোখ বুজেই মম তন্দ্রাজড়িত কণ্ঠে ওই একটু উঃ উঃ করলেন।
সেদিকে কর্ণপাত না করে সহদেব ডাক্তার পমেরেনিয়ান কুকুরটাকে সোফার ওপরে শুইয়ে দিলেন। কুকুরটা ওপর থেকে সাদা মনে হলেও পুরো সাদা নয়, পেটের কাছটা কালো।
সহদেব ডাক্তার পটললালকে কুকুরটা ওই ভাবে ধরতে বলে পাশের বাথরুম থেকে ট্যাপ খুলে এক আঁজলা জল এনে কুকুরটার পেটের কালো জায়গায় ঘষতে লাগলেন। একটু পরে পেটের কালো রং মুছে গিয়ে সাদা লোম বেরোতে লাগল।
পটললাল বুদ্ধিমান লোক, ব্যাপারটা দেখেই বুঝতে পেরেছেন, বললেন, তা হলে কালো রংটা কাঁচা।
সহদেব বললেন, এটা সেই একই কুকুর। কালো রংটা নকল। সিঙ্গাপুর জোচ্চোরে ভরতি। তাদেরই কেউ খান্ডোলিয়া সাহেবকে ঠকিয়েছে সাদা কুকুর কালো রং করে। পার্কে বৃষ্টির জলের তোড়ে কালো রং ধুয়ে গেছে, পেটের কাছে একটু আছে বৃষ্টির ছাট সরাসরি ওখানে লাগেনি বলে।
