.
এই পর্যন্ত শুনতে সহদেববাবুর প্রায় ধৈর্যভঙ্গ হয়ে এসেছিল। মারিনার প্রসঙ্গ উঠতে তিনি বেশ চনমনে হয়ে উঠলেন। মারিনা থেকেই ভুজঙ্গবাবুর আর্ট ফিল্মের কথা সহদেববাবুর মনে পড়ল। দিন আনি দিন খাই করতে গিয়ে সহদেববাবুর টাকাটা যে চোট খেয়েছে, সেটা তিনি কিছুতেই ভুলতে পারছেন না।
পটললালের কাহিনি আরও একটু বাকি ছিল।
পটললাল জেল খেটে যখন বেরোলেন তখনও জেলে বিচারাধীন বন্দি হয়ে আছেন ভুজঙ্গবাবু।
ভুজঙ্গবাবুই পটললালকে খান্ডোলিয়ার ঠিকানাটা দিয়ে বলেছিলেন দেখা করতে।
কিন্তু দেখা করে খান্ডোলিয়াকে ভুজঙ্গবাবুর নাম বলতেই খান্ডোলিয়া এই মারেন কী সেই মারেন।
০৬.
খান্ডোলিয়ার বেনামি এজেন্সি জীবনভাই-মরণভাই প্রোমোটার্স অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট অহি-ভুজঙ্গ ভ্রাতৃদ্বয়ের কাছ থেকে হাতিবাগানের থিয়েটার হলটার লিজ নিয়েছিলেন বিশেষ গোপনে।
আগুন লাগানো, অগ্নি সংযোগ যাকে ইংরেজিতে বলে আর্সন, আইনের চোখে অত্যন্ত গর্হিত, জামিনের অযোগ্য অপরাধ।
শ্রীকৃষ্ণ খান্ডোলিয়া পরিকল্পনা করেছিলেন আগুনের ব্যাপারটা অল্পে মিটে গেলে সেই জমিতে বহুতল বাড়ি বানাবেন।
কিন্তু বাদ সাধল জনগণ। জনগণের মাথায় কখন যে কী পোকা লুকিয়ে থাকে খান্ডোলিয়া সাহেব সারা জীবনেও বুঝে উঠতে পারেননি।
হল পুড়ে যাওয়ার পরে সাংঘাতিক হইচই, খবরের কাগজে লেখালেখি মিটিং পথসভা আরম্ভ হয়ে গেল। হলের ওদিকে এগোয় কার সাধ্যি। পাবলিক ধরতে পারলে ছিঁড়ে টুকরো টুকরো করে ফেলবে। ফলে খান্ডোলিয়া সাহেব একথা পর্যন্ত প্রকাশ করতে পারলেন না যে তিনি পুড়ে যাওয়া হলের জমিটা লিজ নিয়েছেন।
বন্ধুবান্ধব এবং উকিলের পরামর্শে তিনি একদম চুপ করে রইলেন। তাঁর যত রাগ গিয়ে পড়ল ওই দুই ভাই অহিভূষণ আর ভুজঙ্গভূষণের ওপর। কিন্তু তারা তখন কোথায়? অহিভূষণ পরপারে। অথবা জেলের মধ্যে পাগলা গারদে। আর ভুজঙ্গভূষণ সেই সময়ে বক্স নম্বরের আড়ালে ম্যমির ব্যবসা করছেন। তাঁর পাত্তা করা অসম্ভব।
পরে অবশ্য যখন মারিনা কোম্পানি করেন, সেই সময়ে ভুজঙ্গভূষণের খবর পেয়েছিলেন খান্ডোলিয়া কিন্তু তিনি ভুজঙ্গভূষণকে যোগাযোগ করার আগেই ভুজঙ্গবাবু সিনেমার কারবারে নেমে পড়েছেন। তখন আর ভুজঙ্গবাবুকে পায় কে, কখনও আর্ট ফিল্মের ডিরেক্টরের সঙ্গে কামস্কাটকা যাচ্ছেন, আবার ফিরে এসেই তরুণী নায়িকার সঙ্গে চলে যাচ্ছেন হাওয়াই দ্বীপে। ভুজঙ্গভূষণ তখন হাওয়ায় উড়ছেন। ওই এক জায়গায় তার সঙ্গে শ্রীকৃষ্ণ খান্ডোলিয়ার মিল, দুজনেরই বালিকা নাবালিকা নায়িকার ওপরে ঝোঁক।
সে যা হোক, পটললাল দেখা করার সঙ্গে সঙ্গে কিঞ্চিৎ ক্রোধ প্রকাশ করার পর শ্রীকৃষ্ণবাবু একটু ঠান্ডা হলেন। তারপর জানতে চাইলেন, ভুজঙ্গবাবু কী খবর দিয়েছেন, তিনি জেলের ভিতরে বসেই কোনও নতুন কারবার কেঁদেছেন কি না?
পটললাল তখন ভুজঙ্গভূষণের দুটি বার্তা খান্ডোলিয়াকে দিলেন। দুটোই খান্ডোলিয়ার পক্ষে আশাব্যঞ্জক।
প্রথম বার্তাটি হল থিয়েটার হলের জমির লিজের টাকা মারা যাবে না। ভুজঙ্গবাবু জেল থেকে বের হয়েই একটা প্রগতিশীল নাট্যপ্রেমী সংঘ গঠন করে খান্ডোলিয়া সাহেবকে সভাপতি করবেন। ওই সংঘের পক্ষ থেকেই একতলায় একটা খুপরি মতো থিয়েটার হল করে বাকি তলাগুলো। বানালেই সব ক্ষয়ক্ষতি উশুল হয়ে যাবে।
দ্বিতীয় বার্তাটি পূর্বোক্ত মম মজুমদারকে নিয়ে। ভুজঙ্গবাবুর মুখে শোনা এবং জেল থেকে বেরিয়ে যাচাই করে দেখা হালতুর মম মজুমদারের বৃত্তান্ত বেশ সরস করে বললেন পটলবাবু এবং ভুজঙ্গবাবুর হয়ে খান্ডোলিয়াকে অনুরোধ করলেন ভুজঙ্গবাবুর অবর্তমানে মমকে দেখাশোনা করতে।
তারপর থেকে মমকে যথেষ্টই দেখাশোনা করছেন শ্রীকৃষ্ণবাবু। তবে চপলা বালিকা, আর তার অভিভাবক মামাটিও একটি জিনিস।
মামাকে রসে এবং মমকে বশে রাখার দায়িত্ব পড়েছে পটললালের ওপরে। এভাবে মোটামুটি চলে যাচ্ছিল। কিন্তু সিঙ্গাপুর থেকে কালো পমেরেনিয়ানটি এনে খান্ডোলিয়া সেটারও দেখাশোনা খাওয়ানো বেড়ানোর ভার দিলেন পটললালকে। এবং এর পরেই হয়েছে গোলমাল। সেই অত্যুজ্জ্বল অস্বাভাবিক কৃষ্ণ সারমেয়টি যার কিনা ফটো মানে লোগো থাকবে শ্রীকৃষ্ণ ক্যাসেটে সেই কুকুরটি বেড়াতে নিয়ে গিয়ে একদিন হারিয়ে ফেললেন পটললাল।
.
কুকুর খোঁজার ব্যাপারে বিতৃষ্ণা থাকলেও পটললাল কথিত ভুজঙ্গভূষণ তথা খান্ডোলিয়া কাহিনি শুনে সহদেব ডাক্তার বেশ চনমনে হয়ে উঠেছিলেন। তিনি আর সময় ব্যয় না করে পটললালকে জেরা করা শুরু করলেন, কুকুরটা আপনার কাছ থেকে হারিয়ে গেল?
পটললাল বললেন, একদম ম্যাজিকের মতো ব্যাপার স্যার। ৪৪৪
ম্যাজিক-ট্যাজিক থাক, সহদেব বললেন, ঘটনাটা ঠিকমতো পরিষ্কার করে বলুন।
পটললাল বললেন, খান্ডোলিয়া গিন্নি কুকুর পছন্দ করেন না, আর তাকে যমের মতো ভয় করেন খান্ডোলিয়া। সেই জন্যে কুকুরটাকে পার্ক স্ট্রিটের ফ্ল্যাটে রাখা হয়েছিল। দুপুরে যখন মম মজুমদারের স্ক্রিন টেস্ট নিতেন খান্ডোলিয়াসাহেব, তখন মম মজুমদারের মামাকে বার-এ বসিয়ে কুকুরটাকে নিয়ে পার্ক স্ট্রিট ক্যামাক স্ট্রিটের মোড়ের পার্কটায় চলে যেতাম।
এতক্ষণ কথা বলে পটললালের হাঁফ ধরে গিয়েছিল। এবার পকেটে হাত দিয়ে জিজ্ঞাসা করলেন, একটা সিগারেট খেতে পারি স্যার?
