এ ছাড়া জর্দা পান, সিগারেট, সোড়া, ফরমায়েশ মতো ছুটে ছুটে আনতে হত, তাও পান থেকে চুন খসলে পরিত্রাণ নেই।
এর বদলে দুই ভাই পটললালকে যা মাসোহারা দিত তাতে দুবেলা পেট ভরে, হোটেলে ভাত খাওয়া হত না। কিন্তু পটললালের এমন কোনও যোগ্যতা নেই যাতে এ বাজারে অন্য কোনও কাজ জোগাড় করতে পারেন।
অবশেষে অগ্নিকাণ্ডের দিন সন্ধ্যাবেলা পটললালের ওপরে সাংঘাতিক একটা কাজ চাপিয়ে দুভাই দুদিকে চলে গেলেন।
তারা পটললালকে বলে গেলেন, রাত সোয়া দশটায় থিয়েটার হলে শর্ট সার্কিট হয়ে আগুন লাগবে। যে ঘরে শর্ট সার্কিট হবে সেই ঘরে কয়েক টিন কেরোসিন তেল রাখতে হবে। আগুন লেগে যাওয়ার পরে আসল কাজ। মোড়ের মাথায় মিষ্টির দোকান রাত বারোটা পর্যন্ত খোলা থাকে। সেখান থেকে কিংবা অন্য কোথাও থেকে, অগ্নিকাণ্ডের অগ্রগতি প্রতি পনেরো মিনিট অন্তর ফোন করে একটা জায়গায় জানাতে হবে। এসব কাজ ঠিকমতো করতে পারলে পটললালের যে সাড়ে তিন মাসের মাইনে বাকি আছে সেটা পরদিন সকালে পাবে।
আপাতত সেদিন রাতের খরচ-খরচা একটি দশ টাকার নোট পটললালের হাতে তুলে দিয়ে দুভাই কেটে পড়লেন।
দুঃখের বিষয়, সেদিন কী একটা হিসেবের ভুলে সোয়া দশটার জায়গায় থিয়েটার হলে আগুন। লাগে সাড়ে নয়টায়। অহি-ভুজঙ্গ আর একটু আগেই চলে গেছেন। সবে পটললাল জিনিসপত্র গোছাতে বসেছেন, থিয়েটার হল যখন পুড়েই যাবে, যা কিছু ছিল, ছোটখাটো জিনিস হাতের কাছে কুঁজো, গেলাস, ফুলদানি, অ্যাশট্রে, পাপোশ, পর্দা সব কিছু তিনি একটা বড় ঝোলার জন্য ভরছিলেন, এমন সময় চিড়িক চিড়িক করে ইলেকট্রিক শর্ট সার্কিটের আগুন, তারপর কেরোসিন টিন ফেটে যাওয়ার গগনবিদারী আওয়াজে একলাফে চোঁচা দৌড় দিলেন।
এক দৌড়ে হাতিবাগান থেকে টালিগঞ্জে। তবে পথে দুবছর লেগেছিল। রীতিমতো ঘুরপথ যাকে বলে।
এই দুবছর পটললাল করেননি এমন কোনও কাজ নেই। পটললাল তার বিভিন্ন কাজের যে তালিকা সহদেববাবুকে পেশ করলেন সেটা পরীক্ষা করে দেখা যেতে পারে।
১) ময়দানে ফুচকাওয়ালাদের কাছ থেকে ফুচকা খাওয়ার পর লোকেরা শালপাতা ফুটপাথ বা মাঠে ফেলে দেয়। শালপাতার ঠোঙা জোড়ার কাঠি খুলে সেই শালপাতা পাইপের গঙ্গাজল দিয়ে ধুয়ে আবার ফুচকাওয়ালার কাছে বেচলে দৈনিক সাত থেকে দশ টাকা পাওয়া যায় এবং সেই সঙ্গে ফুচকাওয়ালা দয়ালু হলে, দুয়েকটা ফুচকা ফ্রি।
২) অনুরূপভাবে অক্ষত চায়ের ভড় কুড়িয়ে সেটা ধুয়ে আবার বিক্রি করা।
৩) দরজির দোকানে নতুন তৈরি জামায় সূঁচ সুতো দিয়ে বোতাম লাগানো।
৪) আদালতে সাক্ষী দেওয়া। ছোটখাটো চুরি-জোচ্চুরি, মারামারি এই রকম ফৌজদারি মামলায় আবার ভাড়াটে বাড়িওয়ালা, স্বামী-স্ত্রী ঘটিত দেওয়ানি মামলায় নানারকম সাক্ষী লাগে। সব আদালতের বটতলা মিথ্যা সাক্ষীতে ভরতি। কাজটা ভাল। তবে তীব্র প্রতিযোগিতা।
মামলায় মিথ্যে সাক্ষী হওয়ার পর্যায়ে পটললাল আবিষ্কার করেন যে ফৌজদারি মামলায় মিথ্যে সাক্ষী হওয়ার চেয়ে কিঞ্চিৎ বিপজ্জনক অথচ যথেষ্ট লাভজনক কাজ রয়েছে একটা, সেটা হল মিথ্যে আসামি হওয়া।
অনেক বড়লোক, গুণ্ডা, ব্যবসায়ী বা স্মাগলার ফৌজদারি মামলায় জড়িয়ে পড়েন। পরে জামিনে খালাস হয়ে বেপাত্তা হতে পারেন না। তার জায়গায় কাঠগড়ায় অন্য একজন প্রক্সি দেয়। এ কাজে আয় বেশি, দৈনিক পাঁচশো টাকার মতো।
তবে জেল-জরিমানা হলে একটু ঝামেলা আছে। জরিমানার টাকা অবশ্য মূল আসামিই দিয়ে দেয়। জেল হলে জেল খাটতে হয়, একটা ভাল দিক যে জেলে থাকা-খাওয়ার চিন্তা করতে হয় না, সেটা ফ্রি। তা ছাড়া জেল খাটার সময় আসল আসামির কাছ থেকে মাসোহারা পাওয়া যায়। মাসে প্রায় পাঁচশো টাকা। ছয় মাস জেল খাটলে মোটা আয়। তা ছাড়া জেল থেকে বেরোলেই টাকাটা নগদে হাতে পাওয়া যায় এবং এই টাকা প্রায় কখনওই মারা যায় না।
একটা প্রতারণার কেসে মিথ্যে আসামি হয়ে এ বছর মেয়াদ খাটতে গিয়ে আলিপুর জেলে আবার ভুজঙ্গবাবুর সঙ্গে পটললালের দেখা।
ভুজঙ্গবাবু গ্রেপ্তার হয়েছেন মারিনা কোম্পানির প্রধান পরিচালক হিসেবে। থিয়েটার পর্ব শেষ করে ভুজঙ্গবাবু প্রথমে একটা অভিনব কোম্পানি খোলেন। কোম্পানির নাম ম্যমি ইন্ডিয়া করপোরেশন। এই কোম্পানির বহু বিজ্ঞাপন খবরের কাগজে বেরিয়েছিল, বিজ্ঞাপনটি পাঠ করলেই কোম্পানিটির অভিনবত্ব জানা যাবে।
ম্যমি ইন্ডিয়া করপোরেশন
প্রাচীন মিশরীয় পদ্ধতি।
ম্যমি বানাইবার সহজ উপায়।
আর চিন্তা নাই।
প্রিয়জনের মৃত্যুর পর মৃতদেহ
অল্প খরচে
ম্যমি করিয়া ঘরে রাখুন
মৃতদেহ আর পোড়াইতে হইবে না।
মৃতদেহ আর কবর দিতে হইবে না।
যোগাযোগ করুন: পোস্ট বক্স নং…
দুঃখের বিষয়, কয়েকটি বিজ্ঞাপন প্রকাশের পরে বিষয়টি বহুজনের সঙ্গে পুলিশেরও নজরে পড়ে। এবং একটু খোঁজখবর নিয়েই পুলিশ বুঝতে পারে ব্যাপারটি পুরো জোচ্চুরি। নারকেল তেল এবং সরষের তেল একত্রে মিশিয়ে তার মধ্যে ব্লিচিং পাউডার দিয়ে এক রকম প্রলেপ বানানো হয়েছে, সেটাই মৃতদেহের গায়ে মাখাতে হবে। ব্লিচিং পাউডারের গন্ধে কয়েকদিন মৃতদেহের পচনের গন্ধ টের পাওয়া যাবে না। এরপর পুলিশের চাপে পড়ে ভুজঙ্গবাবু লাইন বদল করেন এবং সরাসরি টাকা জাল করার ব্যবসায় চলে আসেন। নতুন কোম্পানি করে নাম দেন মারিনা।
