অথচ আয়ের মোটা পথ রয়েছে। সরকারের, ফিল্ম কর্পোরেশনের সাহায্য, ভর্তুকি, অনুদান, ব্যাঙ্কের ঋণ পরিশোধ করতে হয় না) একটু চেষ্টা করলেই সংগ্রহ হয়ে যায়। শেষ পর্যন্ত আয় যা। হয়, ব্যয় তত না করলেও চলে, ইচ্ছেমতো লাভ রাখা যায়।
বলা বাহুল্য, সহদেববাবু লোভের ফঁদে পা দিয়েছিলেন এবং এখন আফসোস করছেন। মারিনা কোম্পানির চেয়ারম্যান সাহেব জোচ্চুরি ও প্রতারণার দায়ে ধরা পড়েছেন। বহু কষ্টে একবার জামিন পান তো সঙ্গে সঙ্গে আবার গ্রেপ্তার হন। তিনি সহদেববাবুর এবং আরও কারও কারও টাকায় দিন আনি দিন খাই নামে যে বইটি প্রযোজনা করেছিলেন সেটা প্রায় শেষ পর্যায়ে এসে পৌঁছেছিল। কয়েকদিন আগে পুলিশ সেই সব ফিল্ম আরও অনেক কাগজপত্রসহ উদ্ধার করে নিয়ে এসেছে।
এই সব নিয়ে দৈনিকই সব চাঞ্চল্যকর খবর বেরোচ্ছে। সহদেববাবু আশা সম্পূর্ণ ছেড়ে দেননি, এখনও ভাবেন টাকার কিছু অংশ অন্তত উদ্ধার হবে।
০৫. মারিনা
যদিও পটললাল আজ তাঁর কাছে কুকুর খুঁজে দেওয়ার প্রস্তাব নিয়ে আসায় সহদেববাবু পটললালের ওপর খুব চটে গিয়েছিলেন, পরে ভেবে দেখলেন এই লোকটা সিনেমা লাইনের সুলুক সন্ধান জানে। হয়তো পটললাল টাকা উদ্ধারের ব্যাপারে লাগতে পারে।
সুতরাং তার সমস্যা পটললাল গুছিয়ে বলার আগেই সহদেব ডাক্তার নিজের সমস্যার কথা পটললালকে জানালেন।
সব কথা পটললাল খুব মনোযোগ দিয়ে শুনলেন, মাঝে মাঝে তার চোখ ঝকঝক করতে লাগল।
সহদেববাবুর বক্তব্য শেষ হওয়ার পর বেশ কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে পটললাল প্রায় স্বগতোক্তির ভঙ্গিতে বললেন, তাহলে ভুজঙ্গবাবুর ছোবল আপনিও খেয়েছেন।
কে ভুজঙ্গবাবু? ছোবল মানেই বা কী? সহদেববাবুকে পটললালকে অনুরোধ করলেন রহস্য না করে সমস্ত ব্যাপারটা খোলসা করে বলতে।
দেখা গেল জনৈক ভুজঙ্গবাবুর ওপর পটললালের ভীষণ রাগ। তিনি কেবল গজরাতে লাগলেন, তাতে পরিষ্কার করে কিছুই বোঝা যায় না।
বহু কষ্টে সহদেব ডাক্তার পটললালের ভাষণ থেকে যেটুকু উদ্ধার করতে পারলেন তা হল দীর্ঘদিন ভুজঙ্গবাবু প্রাচীন পাপী। পটললাল তাকে দীর্ঘদিন হল চেনেন।
অহিভূষণ, ভুজঙ্গভূষণ দুই ভাই। পারিবারিক ব্যবসা ছিল হাটখোলায় রেডির তেলের পাইকারি কারবার। রেডির তেলের চাহিদা কমে যেতে সরষের তেলের ভেজালের জন্যে তারা শেয়ালকাটার বীজ আর সজনেগাছের ছাল সরবরাহ করতেন বড়বাজারে, তারপর চিৎপুরের যাত্রা হয়ে হাতিবাগানের থিয়েটারে।
সেই হাতিবাগানের হল থেকে পটললাল এদের চেনেন। জুলেখা যখন থিয়েটারে নাচত, তখন এরা কম জ্বালিয়েছে জুলেখাকে। এমনকী সতীসাধ্বী জুলেখার কোমরের নীচের মাদুলি নিয়ে এই। দুই ভাই নোংরামি করেছে।
তবে ওই থিয়েটারের সময়েই দুভাইয়ে গোলমাল শুরু হয়, বনিবনা বন্ধ হয়।
এক শুভ সন্ধ্যায় বহুলক্ষ টাকার ইনসিওর করে এবং পরে থিয়েটার হলের জমিটা জীবনভাই-মরণভাই প্রোমোটার্স অ্যান্ড ডেভেলাপার্স ইন্ডিয়া প্রাইভেট লিমিটেডের কাছে লিজ দেওয়ার চুক্তি করে দুভাই দুদিকে চলে গেলেন।
তার আগে হাতিবাগান বাজারের পেছনের চক্রবর্তী বাড়ির চোখে ছানি পড়া বৃদ্ধ দারোয়ান সীতারামকে অহি-ভুজঙ্গ দুজনে পাঁচশো-পাঁচশো করে হাজার টাকা দিয়ে গেলেন।
টাকাটা বকশিস নয়, পারিশ্রমিক।
সীতারাম উত্তর কলকাতার পেশাদার অগ্নিসংযোগকারী। প্রায় পঞ্চাশ বছর আগে ছেচল্লিশের দাঙ্গার সময় সে রাজাবাজার ও উল্টোডাঙার বস্তিতে আগুন লাগিয়ে হাত পাকিয়েছিল। এই বৃদ্ধ বয়েসে, অশক্ত শরীরে আগুন লাগানোর ব্যাপারে তার অভিজ্ঞতা ও দক্ষতা অনস্বীকার্য। কোথায় পেট্রোল লাগবে, কোথায় কেরোসিন হলে হবে নাকি শর্ট সার্কিট করাতে হবে, তার ওপরে কখন ভাল সময়, দিনে না রাতে, কখন কাজটা নিরাপদ এবং নিঃসন্দেহে হবে, এ সমস্ত বিষয়ে সীতারামই শেষ কথা।
সে যা হোক, অগ্নিকাণ্ডের বিবরণে গিয়ে লাভ নেই। তবে পটললালের কথা থেকে সহদেববাবু বুঝতে পারলেন যে অগ্নিকাণ্ডের পর থেকে অহিভূষণের আর কোনও খোঁজখবর নেই। কিন্তু পটললালের বিশ্বাস যে অহিভূষণকে কোনও কায়দা করে ভুজঙ্গভূষণ ধরাধাম থেকে সরিয়ে ফেলেছে কিংবা কোনও পাগলাগারদ-টারদে জোর করে ভরে রেখেছে।
পাগলাগারদ বড় সাংঘাতিক জায়গা, বিশেষ করে জেলখানার ভিতরের পাগলাগারদ, একেবারে সেখানে প্রবেশ করলে কোনও সুস্থ মানুষের পক্ষেই প্রমাণ করা সম্ভব হবে না যে সে পাগল নয়। সে যা-ই করুক তার মধ্যে পাগলামির লক্ষণ আবিষ্কৃত হবে।
এই পর্যন্ত শুনে সহদেব ডাক্তার বললেন, আমাকে কুকুর খুঁজতে বলছেন কেন? তার চেয়ে বলুন আমি এই অহিভূষণকে খুঁজে বার করে দিচ্ছি।
পটললাল বললেন, স্যার, অহিভূষণ হারিয়ে গেলে কারও কিছু আসে যায় না, তার স্ত্রী পুত্র পরিবার নেই, সে বিয়ে করেনি। কিন্তু এই কুকুরটা হারিয়ে যাওয়ায় ঘোর সর্বনাশ হয়েছে।
কুকুর হারানোয় এমন কী সর্বনাশ হতে পারে যা মানুষ গুম করে ফেলার চেয়েও মারাত্মক? একটু চিন্তায় পড়লেন সহদেববাবু। তাঁর গোয়েন্দা মন বলল ব্যাপারটা খুব সোজা নয়।
এরপরে পটললাল ঘণ্টাখানেক ধরে যা যা বলে গেলেন তা খুবই মর্মান্তিক।
জুলেখা সার্কাসে যোগদান করে বিদেশে যাওয়ার পরে জুলেখার পূর্বতন মালিকদ্বয় ফাঁইফরমাস খাটার কাজে পটললালকে নামমাত্র বেতনে নিয়োগ করেন। দৈনিক সন্ধ্যা থেকে গভীর রাত পর্যন্ত থিয়েটার হলের দোতলায় ডিউটি। পটললালের কাজ ছিল মালিকদের ঘরে। দোতলায় পাশাপাশি দুটি ঘরে দুই মালিকের সন্ধ্যার পরে শোয়া বসা। ঘরের মধ্যে চেয়ার টেবিল যেমন আছে, তেমনই আছে সোফা কাম বেড। যদি কখনও অভিনেত্রী অথবা অভিনেত্রী যশপ্রার্থিনী দুই ভাইয়ের কারও সঙ্গে ঘরের ভিতরে থাকেন তখন বাইরেটা আগলানোর দায়িত্ব ছিল পটললালের।
