এইরকম চলেছে আজ সকালবেলা থেকে। বেলা হতে রোগী আসার সময় হয়ে যাওয়ায় মরক্কো লেদারের কবিতার খাতা নিয়ে সহদেববাবু তার চেম্বারে চলে এসেছেন, রোগী দেখার ফাঁকে ফাঁকে পদ্য রচনা করে যাচ্ছেন, সেগুলো আকারে ক্ষুদ্র হলেও অকিঞ্চিৎকর নয়। বিভিন্ন রোগী দেখে মনে যেমন যেমন ভাব আসছে তেমনই লিখছেন। যথা:
ওলাওঠা কলেরা।
মন বলে চলেরা।
অথবা
বুকভরা নিশ্বাস,
ফুসফুসে ফিসফাস।
পদ রচনার এ জাতীয় ফ্লোয়ের মধ্যে যখন হাবুডুবু খাচ্ছেন ডাঃ সহদেব শুক ঠিক সেই সময় কিনা কুকুর খুঁজে দেওয়ার মতো হাস্যকর প্রস্তাব নিয়ে এসেছেন পটললাল পাল।
মনের আবেগ যথাসাধ্য সংযত করে সহদেববাবু জানতে চাইলেন, কী এমন মহামূল্য কুকুর, যেটাকে খুঁজে বার না করলে চলবে না?
এবং এই সময়েই বুদ্ধিমান সহদেব ডাক্তারের মাথায় একটা কথা খেলে গেল যে পটললাল এখন টালিগঞ্জে সিনেমার লাইনে আছেন, নিজের একটা ব্যাপারে পটললালকে কাজে লাগতে পারে।
০৪. যার ধন তার ধন নয়
কবিতা লিখে কোনও পয়সা হচ্ছে না, গোয়েন্দাগিরিতে বিশেষ কিছু নয়, তবে হোমিওপ্যাথিক ডাক্তারির ব্যবসায় আজ কিছুদিন হল বেশ ভাল উপার্জন হচ্ছে ডাঃ সহদেব শুকের।
মোট কথা, ব্যয়ের চেয়ে আয় অনেক বেশি ডাক্তার শুকের। এক কবিতা লেখার নেশায়। খরচ-খরচা খুব কম। সবচেয়ে দামি কাগজে, দামি কালিতে লিখলেও সারা বছরে যা খরচ হয় তা যারা মদ বা সিগারেট খায় তাদের এক বেলার খরচের সমান।
সুতরাং সহদেব শুকের হাতে টাকাপয়সা ভালই জমে যায়। এসব ক্ষেত্রে অন্য দশজন যা ভুল। করে থাকে, অতি বুদ্ধিমান সহদেববাবুও ঠিক তাই করেছেন।
উদ্বৃত্ত আয়ের হিসাব আয়কর দপ্তর জানতে পারবে না, ফলে বেশি আয়কর দিতে হবে না এই ভরসায়, তদুপরি বেশি সুদ পাওয়া যাবে এই আশায় ব্যাঙ্কে বা পোস্টাপিসে টাকা না রেখে তিনি চিটফান্ডে টাকা জমাতে আরম্ভ করলেন।
চিটফান্ড শোনার পরও লোকে কী সাহসে এখানে বহু কষ্টের বহু পরিশ্রমের টাকা জমায় এ বিষয়ে অবশ্য সহদেববাবুর মনে বেশ খটকা ছিল।
কিন্তু এই সময়ে ডা. শুকের এক নতুন রোগী তাকে বোঝাল যে এ চিট সে চিট নয়। এ চিট মানে জোচ্চোর নয়, এ চিট অন্য জিনিস, একেবারে যাকে বলে কামধেনু কিংবা রূপকথার টাকার গাছ। তেমন তেমন জায়গায় ঠিকমতো টাকা গচ্ছিত রাখতে পারলে বছর বছর টাকা ডবল হয়ে যাবে।
বছর বছর টাকা ডবল হয়ে যাওয়ার লোভ কম নয়। তা ছাড়া তার সেই রোগী সত্যকুমার ভক্ত যখন জানালেন যে তিনি নিজেই সর্বশ্রেষ্ঠ চিটফান্ডের প্রধান এজেন্ট তখন শুকদেববাবু আর ইতস্তত করলেন না তার উদ্বৃত্ত আয় সত্যকুমারবাবুর কোম্পানিতে গচ্ছিত রাখতে।
তা ছাড়াও চিট ফান্ড হলে কী হবে সত্যকুমারবাবুর কোম্পানির নামটি বড় আশাব্যঞ্জক মারিনা। ইংরেজিতে নামের বানান এম এ আর আই এন এ (MARINA)৷
মারিনা শব্দটা ভাঙলে সাদা বাংলায় দুটো শব্দ মারি এবং না পাওয়া যায়। একটি আর্থিক প্রতিষ্ঠান যদি তার নামের মধ্যেই বলে দেয় মারি না, তা হলে তার ওপরে আস্থা না থেকে যায় না।
সুতরাং সত্যকুমারবাবুর প্ররোচনায় সহদেববাবু মারিনার ওপরে যথেষ্ট আস্থা রেখেছিলেন। এবং অবেশেষে ভরাডুবি হয়েছেন। ঠিক কত টাকা তিনি মারিনার চিট ফান্ডে বিনিয়োগ করেছিলেন সেটা অবশ্য কোনওদিন কাউকে খুলে বলেননি। তবে তার ডিসপেনসারির কম্পাউন্ডার হরি চক্রবর্তীর ধারণা মোট টাকার পরিমাণ লক্ষাধিক হতে পারে। সে দেখেছে প্রত্যেক শনিবার ওই সত্যকুমার এসে বেশ কয়েক হাজার করে টাকা নিয়ে যেত আর নানারকম রঙিন কথা বলত।
সত্যকুমারবাবু কখনও বলতেন, আপনার সেই জুলাই মাসের এগারো হাজার টাকা কুড়ি হাজার হয়ে গেছে, টাকাটা এনে দেব নাকি ডাক্তারবাবু?
ডাক্তারবাবু বলতেন, আরে না না। আবার লাগিয়ে দিন।
আরেকবার সত্যকুমার বললেন, একটা আর্ট ফিল্ম তৈরি হচ্ছে। মারিনার মালিক ভবসিন্ধু ঘোষ সিনেমা প্রযোজনায় নেমেছেন, নেমেই প্রথম দুটো বইতে দশ-বারোটা মেডেল পেয়ে গেছেন।
ডাক্তারবাবু হয়তো বলেছেন, তাই নাকি?
সত্যকুমারবাবু গড় বড় করে সিনেমা দুটোর নাম বলে দিয়েছেন, তারপর গলা নামিয়ে ডাক্তারবাবুকে বলেছেন, আপনার সব টাকা এবার আর্ট ফিল্মে লাগিয়ে দিন।
আর্ট ফিল্ম জিনিসটা যে কী ডা. সহদেব শুকের সে বিষয়ে সম্যক ধারণা নেই। কিন্তু কী করে যেন এটা বোঝেন যে ওসব জিনিস সাধারণ দর্শক দেখে না। তাই আপত্তি জানিয়ে বললেন, আর্ট ফিল্ম তো ফ্লপ হবে, ওখানে টাকা খাটিয়ে মারা পড়ব যে।
তখন আরও গলা নামিয়ে সত্যকুমারবাবু গোপন কথাটা বললেন।
আর্ট ফিল্মের লাভ হলের টিকিট বিক্রির ওপরে নির্ভর করে না। তার ফিকির আলাদা।
প্রথম বই তোলার খরচ খুব কম। অভিনেতা, অভিনেত্রী, লেখক এদের জন্যে বিশেষ টাকাপয়সা লাগবে না। অভিনেতা, অভিনেত্রী হয় আনকোরা অর্থাৎ যাকে সিনেমার ভাষায় বলে নবাগত-নবাগতা। কিংবা থিয়েটারের লাইনের বড় জোর টালির নালায় ভেসে যাওয়া অতীতের আবর্জনা, যাঁদের বক্স অফিস শূন্য এবং যেকোনও সুযোগ পেলেই হল, অর্থ না পেলেও কৃতার্থ বোধ করেন।
এদিকে পরিচালক নিজেই চিত্রনাট্যকার, সুরকার, সংগীতকার ইত্যাদি ইত্যাদি। শুটিংয়ের জন্যেও স্টুডিয়ো ভাড়ার বিশেষ প্রয়োজন নেই, রাস্তায় ঘাটে, বস্তিতে বাজারে লোকেশন শুটিং। ফিরিস্তি বাড়িয়ে লাভ নেই। মোট কথা, আর্ট ফিল্মের পিছনে ব্যয় খুবই যৎসামান্য।
