পটল বললেন, কুকুরের দাম দশ হাজার ডলার। শুনে এস এস বললেন, কুকুরটা কোথায় কেনা হয়েছিল?
পটললাল বললেন, সিঙ্গাপুরে স্যার।
এস এস বললেন, সে যা হোক, সিঙ্গাপুরি ডলারের এত দাম নয়, তবুও একটা কুকুরের দাম হিসেবে যথেষ্ট। কিন্তু কুকুর খোঁজার কাজ আমি করি না।
সত্যিই পটললাল কুকুর খোঁজার কাজ নিয়ে আসায় সহদেব গোয়েন্দা খুবই অপমানিত বোধ করেছিলেন। এমনকী তেমন তেমন না হলে নারী খোঁজার কেসও সবসময় তিনি নেন না।
মন-না-ভরানো, তুচ্ছ-অতি তুচ্ছ সব কেলেঙ্কারি যার মধ্যে কোনও উত্তেজনা নেই, রহস্যের ঘেরাটোপ নেই। সহদেব ডাক্তার ঠিক করেছেন যদি মিস জুলেখার কেসের মতো কেস পান, ভেবে দেখবেন, না হলে গোয়েন্দাগিরিতে যাবেন না।
তাই সহদেব ডাক্তার এখন সময় পেলেই কাব্যচর্চা করেন, তার রোগীদের মধ্যে বেশ কয়েকজন কবি। আছেন, দুজন লিটল ম্যাগাজিনের সম্পাদক এবং কয়েকজন আধুনিক কবিও আছেন, এমনকী একজন নারীবাদী মহিলা কবিও আছেন।
এই অবস্থায় তার কাছে একটি কুকুর ঘটিত কেসও এসেছে। কবি-গোয়েন্দার জীবনে এটা একটা দুঃসহ অপমান। তাও কিনা প্রস্তাবটা এসেছে তার প্রিয় পাত্রী জুলেখার বর এই পটললালের কাছ থেকে।
০৩.
কবি সহদেব
কিন্তু আজ ডাক্তার সহদেব শুকের মনটা খুব প্রসন্ন। তা না হলে পটললালের ওই কুপ্রস্তাবে তিনি এতক্ষণ খেঁকিয়ে উঠে তাকে চেম্বার থেকে বার করে দিতেন।
কাল শেষ রাত থেকে খুব বৃষ্টি হয়েছিল। সকাল পাঁচটায় ঘুম থেকে উঠেছেন সহদেববাবু। প্রতিদিন এর একটু পরেই তিনি মর্নিং-ওয়াকে বেরোন। কিন্তু আজ বৃষ্টির জন্যে বেরোতে পারলেন না। ফলে প্রাতঃভ্রমণের দেড় ঘণ্টা সময় চুটিয়ে কাব্যচর্চা করেছেন।
প্রথম দিকে সহদেববাবু শুধুই গান লিখতেন। কিন্তু আজকাল কবিতা লেখার দিকেই বেশি মনোযোগ দিয়েছেন। গান লেখার ঝামেলা অনেক, অনেক আটঘাট, সঞ্চারী-অন্তরা কত কিছু মেনে চলতে হয়।
কবিতা লেখা অনেক সোজা। খোলামেলা ব্যাপার। একটু তাল মিলিয়ে লিখে যাও, পারলে মিল দাও, মিল না দিলেও কিছু আসে যায় না। আর তেমন বেকায়দা দেখলে মুক্ত ছন্দ বা এলানো গদ্যে লিখলেই হয়ে যায়।
এই তো আজ সকালেই ঝিরঝির বৃষ্টির মধ্যে খাতা কলম খোলার আগেই দাঁত মাজতে মাজতে সহদেববাবুর ফ্লো এসে গিয়েছিল। বড় বড় কবির মতো সহদেববাবুরও মনের মধ্যে ফ্লো এসে গেলে নিজেকে আর সামাল দিতে পারেন না।
আজ সকালেও তাই হল। বাঁ হাতটা টুথব্রাশ দিয়ে দাঁত মাজতে মাজতে ডান হাতের তর্জনীতে টুথপেস্ট বার করে লাগিয়ে তাই দিয়ে বাথরুমের আয়নায় কাঁচের ওপরে দ্রুতগতিতে লিখে ফেললেন।
রক্ত হরিতাভ
দন্ত মঞ্জন,
চড়ুই-গাংচিল
শালিক-খঞ্জন
শ্যালিকা ঠাকুরানি
নয়নে অঞ্জন।
আমারে দোষ দ্যায়
সে ব্যাটা কোনজন ৷
দুঃখের বিষয় এই কবিতাটি লিখতে প্রায় দশটাকা খরচ হয়েছিল সহদেব ডাক্তারের। একটা রঙিন টুথপেস্টের প্রায় আধাআধি ফুরিয়ে ফেলেছিলেন। বাথরুমের আয়নাটা যার ওপরে নীল টুথপেস্টে এই কাব্যচর্চা হয়েছিল সেটা জলে ধুয়ে পরিষ্কার করতে গিয়ে ভেঙে ফেলে সহদেববাবুর পরিচারিকা। তাকে অবশ্য দোষ দেওয়া যায় না। সে বাসন মাজতে পারে, কাপড় কাঁচতে পারে, মেঝে মুছতে পারে কিন্তু। টুথপেস্ট মাখানো আয়না সাফ করার তার কোনও পূর্ব অভিজ্ঞতা নেই। তার হাত থেকে স্লিপ করে। আয়নাটি চৌচির হয়ে যায়।
এই আয়নাটির ক্রয়মূল্য দেড়শো টাকা ধরলে আজ সকালের ফ্লো আসা কবিতাটির জন্যে। সহদেববাবুর গচ্চা গেল একশো ষাট টাকা। কিন্তু কেউ যদি ভেবে থাকেন যে আয়নার কাঁচে রঙিন টুথপেস্ট নিয়ে কবিতা লিখে সহদেববাবু ক্ষান্ত হয়েছিলেন, এতেই তার ফ্লো রুদ্ধ হয়ে গিয়েছিল, তা হলে বলব এই কবি-গোয়েন্দার বিষয়ে তার কোনও ধারণাই গড়ে ওঠেনি।
দাঁত মাজার পরে ধীরেসুস্থে চায়ের টেবিলে বসে চা খেতে খেতে সহদেববাবু তার অতি প্রিয় নিউ মার্কেট থেকে কিনে আনা মরক্কো চামড়ায় বাঁধাই কবিতার খাতায় ওই একই বিষয়ে, মানে সঁত মাজা নিয়ে কবিতা রচনায় মন দিলেন।
এবার অবশ্য রঙিন টুথপেস্ট দিয়ে নয়। বেছে বেছে বারো রঙের বারোটা ফেল্ট পেনের একটা সেট কিনেছেন সহদেববাবু, সেই কলমের সেট দিয়ে একেক পংক্তি একেক রঙে লিখতে লাগলেন তিনি। বলা বাহুল্য, রঙের বাহুল্যে এই কবিতাও যথেষ্ট খোলতাই হল।
সবুজ সুনীল দাঁতের মাজন,
তুমিই রাজ্ঞী তুমিই রাজন ॥
ঝিরঝির দিন ঝিরিঝিরি রাত
তাজ্জব বাত ঝকঝকে দাঁত।
ওগো সাদা ফেনা কেউ তো জানে না
তব কাছে মম কতখানি দেনা…
এই রকম লাইনের পর লাইন একটি দীর্ঘ পদ্য, দু পেয়ালা চা খেতে খেতে সহদেব শুক রচনা করে ফেললেন। সহদেববাবু তাঁর কবি পেশেন্টের দৌলতে ভালই জানেন যে এখন আর তব কিংবা মম এই জাতীয় প্রাচীন শব্দ কবিতায় ব্যবহার করা হয় না কিন্তু পরোয়া করেন না। তিনি তো আর আধুনিক কবিতা লিখছেন না, তিনি লিখছেন চিরায়ত জীবনধর্মী পদ্য।
এই তো চা খাওয়ার পরে খবরের কাগজ পড়তে পড়তে বিভিন্ন টাডা মামলার বিবরণ, সঞ্জয় দত্ত উপাখ্যান, ইয়াকুব মেমন কাহিনি পাঠ করতে করতে ঝরঝর করে অনবদ্য ভঙ্গিতে লিখে ফেললেন:
টা-টা টাডা
তোর গাড়া
গরম গরম।
কাজু সাজু
আজু আজু
শরম শরম ॥
