এদিকে বিশাল দেহে, ধামার মতো ভুড়ি নিয়ে নৃত্য প্রদর্শন খুব মনোরম হয় না। বিশেষ করে আদিরসাত্মক নৃত্যদৃশ্য যে দর্শকেরা দেখতে আসে তারা খুব কোমল রুচির হয় না। তারা হলের মধ্যেই হাসাহাসি করে, শিস দেয়, টিটকিরি দেয়। এমনিতেই এ ধরনের নাচে কঠোর পরিশ্রম। তার ওপর ওই টিটকিরি, প্রতিবাদ। নাচের শেষে মিস জুলেখা কাঁদতে কাঁদতে স্টেজ থেকে উইংসে ফিরে চোখের জল মোছেন।
ডাঃ শুক অভিজ্ঞ ব্যক্তি। তিনি জানেন ওই স্থূলতা কোনও ওষুধে কমানো যাবে না। বেশি খাটতে হবে, কম খেতে হবে। এই হল এর একমাত্র চিকিৎসা।
বলা বাহুল্য, এই চিকিৎসা মিস জুলেখার মনঃপূত হয়নি। ডাঃ শুক প্রেসক্রিপশন দিয়েছিলেন, ভাজা, মিষ্টি বন্ধ। বাংলা মদ বন্ধ। কিন্তু এই তিনটি ছাড়া জুলেখার চলে না। বহুদিনের অভ্যেস।
ডাঃ শুক বুঝেছিলেন মিস জুলেখা মোটেই ব্যায়াম করার পাত্রী নয়, তা হলে নাচের তালিমই করে যেত, মেদ বাড়তে পারত না। তাই বলেছিলেন, দৈনিক দশ কেজি করে কয়লা ভাঙতে এবং চারবার করে তার ফ্ল্যাটের সবগুলো ঘরের মেঝে মুছতে।
কিন্তু চারবার না হলেও, ঘরের মেঝে যদিও বা দৈনিক দু-একবার মোছার চেষ্টা করা যায়, কয়লা ভাঙা অসম্ভব।
এমনিতেই আজকের বাজারে দশ কেজি কয়লার দাম কম নয়। তা ছাড়া এত কয়লা দিয়ে জুলেখা কী করবেন। কী কাজে লাগবে এত কয়লা, মাসে প্রায় আট মণ কয়লা। বলতে গেলে একটা রেলগাড়ির খোরাক। এদিকে জুলেখাদের গৃহে কয়লার উনুন কেন কোনওরকম উনুনই নেই। খাবার-দাবার, চা জলখাবার, সবই আসে হোটেল থেকে। খুব প্রয়োজনে একটা ছোট কেরোসিন স্টোভ আছে, সেটা ব্যবহার করা হয়।
সুতরাং মিস জুলেখা অন্তর্হিত হলেন। এবং তারপর আর আসেননি।
আজ হঠাৎ সকালবেলা চেম্বার ভাঙার মুখে পটললাল পাল এসে হাজির। পটললালকে অনেকদিন সহদেব দেখেননি। আজ দেখলেন, চেহারা খুব বদলায়নি। তবে মুখ গম্ভীর।
পটললালকে দেখে প্রীতি নমস্কার জানিয়ে ডাক্তার শুক জিজ্ঞাসা করলেন, কেমন আছেন।
পটললাল একই রকম শুকনো মুখে জবাব দিলেন, মোটামুটি।
পটললাল মোটামুটি বলার সঙ্গে মুটির কথা মনে পড়ল ডাক্তার শুকের। তিনি প্রশ্ন করলেন, মিস জুলেখা? জুলেখা দেবী কেমন আছেন? আজকাল আর খবরের কাগজে যাত্রা-থিয়েটারে বিজ্ঞাপনে জুলেখা দেবীর নাম-টাম দেখতে পাই না।
পটললাল গম্ভীর হয়ে জবাব দিলেন, জুলেখা এখন কলকাতায় থাকে না।
সহদেব শুক কৌতূহলী হয়ে জানতে চাইলেন, সে কী, কোথায় গেলেন উনি?
পটললাল বললেন, জুলেখা, দি গ্রেট মাদার ইন্ডিয়া সার্কাসে জয়েন করেছে। এখন বোধহয় দুবাইতে আছে। এখন আর নাচ করে না।
ডাক্তার শুক এই সংবাদে বেশ বিস্মিত হলেন, একটু থেমে তারপর বললেন, তা হলে এখন মিস জুলেখা কী করেন?
পটললাল মুখ তেতো করে বললেন, অন্য সময় কী করে বলতে পারব না, তবে সার্কাসের খেলার সময় বুকের ওপর হাতি তোলেন।
এই সংবাদে আরও চমকিত হলেন ডাক্তার শুক, বুকের ওপর হাতি তোলেন।
পটললাল বললেন, কাজটা তেমন মারাত্মক কিছু নয়। জুলেখা স্টেজের ওপরে চিত হয়ে শুয়ে থাকে, বুকের ওপর কাঠের পাটাতন দেয়া থাকে। একটা বড় হাতি এসে সেই পাটাতনের দুধারে সামনের দুপা দিয়ে দাঁড়ায়। তারপর একটু ভেবে নিয়ে যোগ করল, হাতি যত বড় হবে, হাতির যত ওজন বেশি হবে, তত সুবিধে।
ব্যাপারটা বুঝতে না পেরে সহদেব ডাক্তার প্রশ্ন করলেন, তাই নাকি? কিন্তু কেন? ব্যাপারটা তো বোঝা যাচ্ছে না।
পটললাল এবার বুঝিয়ে বললেন, বুকের ওপর যে কাঠের তক্তাটা থাকে হাতির সামনের দুটো পায়ের চাপ তার দুদিকে পড়লে তক্তাটা ধনুকের মতো বেঁকে যায়। বুকের ওপর মোটেই চাপ পড়ে না। হাতি যত ভারী হবে তত বেশি বেঁকবে।
ডাঃ সহদেব শুকের বিমূঢ় মুখের দিকে তাকিয়ে এরপর পটললাল বললেন, তবে সাহস লাগে। রিসকও আছে। হাতির পা একটু বেসামাল হলে একেবারে ফ্ল্যাট হয়ে যাবে, মানে চিঁড়ে চ্যাপটা হয়ে যাবে জুলেখা।
এই রকম প্রাথমিক আলাপ হয়ে যাওয়ার পরে সহদেব ডাক্তার এবার পটললাল পালের কাছে জানতে চাইলেন, তিনি কী প্রয়োজনে এসেছেন।
পটললাল যা বললেন, তার মোদ্দা কথা হল এই যে, জুলেখা চলে যাওয়ার পর থেকে তার খুব কষ্টে কাটছে। যাত্রা-থিয়েটারে আর সুবিধে নেই, এখন টালিগঞ্জে আছেন। এক প্রযোজকের ফাঁইফরমাস খাটেন, কোনওরকমে গ্রাসাচ্ছাদন চলে।
স্বাভাবিকভাবেই ডাক্তার সহদেব শুক বুঝতে পারলেন, এটা কোনও চিকিৎসার ব্যাপার নয়, নিশ্চয়ই গোয়েন্দাগিরির কাজ। সুতরাং তিনি জিজ্ঞাসা করলেন, কাজটা কী?
পটললাল বললেন, একটা কুকুর খুঁজে দিতে হবে?
সহদেব গোয়েন্দা বললেন, আমাকে কুকুর খুঁজতে হবে?
পটললাল বললেন, কিন্তু আপনি তো সেবার আমাকে খুঁজে বার করেছিলেন।
সহদেববাবুর চিরকালই একটু ঠোঁটকাটা, তিনি বললেন, কিন্তু পটলবাবু, আপনি কী যা তা বলছেন। আপনি কি কুকুর? আপনি তো কুকুর নন।
একবার নিজের কানের পাতা দুটোর ওপর হাত বুলিয়ে নিয়ে এবং নিজের পশ্চাৎদেশ ঘাড় ঘুরিয়ে অবলোকন করে মনে মনে নিশ্চিত হয়ে নিলেন পটললাল যে তিনি কুকুর নন, তারপর জানালেন, কিন্তু আপনাকে বলছি ডাক্তারবাবু, এটা কোনও সামান্য কুকুর নয়।
সহদেব গোয়েন্দা প্রায় স্বগতোক্তি করলেন, সামান্য কুকুর নয়? অসামান্য কুকুর? সে আবার কী? সেই সঙ্গে এ কথাও জানিয়ে দিলেন, গোয়েন্দার কাজে আমার সঙ্গে কথা বলার সময় আমাকে ডাক্তারবাবু বলবেন না। আমাকে এস এস বলবেন, প্রথমে এস সহদেব পরে এস, শুক।
