গল্পগুলির নাম শুনেই কেমন আমিষ মনে হয় এবং সত্যিই তাই। পুরুষানুক্রমে নিরামিষভোজী উচ্চবর্ণের ব্রাহ্মণ সন্তান শ্রীকৃষ্ণবাবু বলা বাহুল্য, তাঁর সময় ও দেশের তুলনায় খুব আধুনিক ছিলেন। কিন্তু রক্ষণশীল গোঁড়া সম্পাদকেরা তার লেখা ছাপেনি।
তার নবযৌবনের সেই অবদমিত ইচ্ছা এখন শ্রীকৃষ্ণবাবু পূরণ করতে চান। তার ভিডিও ছবিগুলি তিনি নিজেই পরিচালনা করবেন বলে মনস্থ করছেন। এখন নায়িকা সংগ্রহে মন দিয়েছেন, একটু খলবলে উঠতি বয়সিনী তাঁর বিশেষ পছন্দ। তেমন তেমন নায়িকার সন্ধান পেলে তিনি নিজেই তার পার্ক স্ট্রিটের ফ্ল্যাটে সেই নায়িকার স্ক্রিন টেস্ট নিচ্ছেন। সম্প্রতি হালতুর মম মজুমদার তাঁর নজরে পড়েছে। কালো, ছিপছিপে অথচ উজ্জ্বলযৌবনা মম শহর ও শহরতলির যে কোনও ফাংশনের মুখ্য আকর্ষণ। বেদের মেয়ে জ্যোৎস্নার ফাঁকি দিয়েছে কিংবা খলনায়কের চোলি কা পিছের সঙ্গে মম যখন কোমর এবং কোমরের কাছাকাছি। জিনিসপত্র আন্দোলিত করে নাচে, স্বচ্ছ ও সামান্য বসনে, দর্শকবৃন্দও একইভাবে আন্দোলিত হতে থাকে।
সবই ঠিকঠাক ছিল।
গভীর রাতে দিঘির পারে মূল কাহিনিতে বেশ কয়েকটি স্ত্রী চরিত্র ছিল। কিন্তু মম মজুমদারের সুবাদে শ্রীকৃষ্ণবাবু স্ত্রী চরিত্র একটিতে দাঁড় করিয়েছেন। আগে ছিল দিঘির চার পারে চারটি সজীব ঘাঘরা কাঁচুলি পরিহিতা রঙচঙা দেহাতি রমণীর চরিত্র, এখন একাই মম মজুমদার।
শ্রীকৃষ্ণ খান্ডোলিয়ার নতুন চিত্রনাট্যে দিঘির চার পারেই মম।
প্রথম পারে বৈষ্ণবীর ভূমিকায়। গলার কণ্ঠী, ললাটে চন্দন, পরিধানে অন্তর্বাসহীন হাঁটু পর্যন্ত তোলা দোভাজ সিফন শাড়ি। দ্বিতীয় পারে কোমরের নীচে স্বচ্ছ লুঙ্গি, উর্ধাঙ্গে শুধুমাত্র প্রায় স্বচ্ছ ওড়না।
চতুর্থ এবং শেষ পার একটু ছায়া ছায়া, একটু ধোঁয়া ধোঁয়া। স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছে না, চপলা নায়িকা। মম মজুমদার কী পরে আছেন কিংবা সত্যি কিছু পরে আছেন কি না?
তৃতীয় পার বাদ রয়ে গেল আমার এই বর্ণনায়। কিন্তু আমার কি ক্ষমতা আছে শ্রীকৃষ্ণ খান্ডোলিয়ার কল্পনাশক্তি ব্যাখ্যা করার। তবু বুঝিয়ে বলার চেষ্টা করছি। তৃতীয় পারে মম মজুমদার পারেই নেই। তিনি আছেন পারের কাছে জলে সিঁড়ির পইঠা ধরে চিত সাঁতার দিয়ে। ফিকে নীল জলের নীচে মাছের মতো ঝলমল করছে তার অনাবৃত শরীর।
শ্রীকৃষ্ণবাবু মম মজুমদারের ব্যাপারটা প্রায় কবজা করে ফেলেছেন। এখন আর এ নিয়ে তেমন কোনও চিন্তা নেই। ব্যবসায়িক ভাষায় বলা যায় ম্যানেজ করে ফেলেছেন।
শ্রীকৃষ্ণবাবু তার পার্ক স্ট্রিটের ফ্ল্যাটে এখন প্রায় প্রতিদিনই কুমারী মম মজুমদারের স্ক্রিন টেস্ট নিচ্ছেন। মম মজুমদার অবশ্য কখনও একা আসেন না। কোথাকার যেন, কুলমারি নাকি কী এক পরগণার গোঁড়া বনেদি কায়স্থকুলকন্যা, তাঁর রাখ-ঢাক অনেক।
মম মজুমদারের মা-বাবা থাকেন আসামের চা বাগানে। মম থাকেন হালতুতে মামার বাড়িতে। তার মামা হলেন জীবানন্দ দত্ত। অতীতের দিকপাল তবলাবাদক। কয়েকটি জলভরতি চিনেমাটির পেয়ালা দুহাতের দুটো কাঠি দিয়ে বাজিয়ে জলতরঙ্গ বাদক হিসেবে দত্তমশায় একদা দেশ বিখ্যাত রয়েছেন। এখন তিনি মম মজুমদারের এসকর্ট, সেক্রেটারি এবং সর্বোপরি অভিভাবক।
জীবানন্দবাবু বুদ্ধিমান লোক। বহুকাল এ লাইনে আছেন। স্ক্রিন টেস্টিংয়ের তিনি কিছু বোঝেন না, সুতরাং সে ব্যাপারে মোটেই নাক গলান না। ভাগিনেয়ীকে শ্রীকৃষ্ণবাবুর ফ্ল্যাটে পৌঁছে দিয়ে নীচের একটা বার-এ তিনি অপেক্ষা করেন। ঘণ্টা দুয়েক বাদে কাজ সেরে মম ফিরে আসে। ততক্ষণে জীবানন্দবাবু কয়েক গেলাস লাইম জিন, এক প্লেট তন্দুরি চিকেন খেয়ে নিয়েছেন। শ্রীকৃষ্ণবাবুর সঙ্গে বন্দোবস্ত করা আছে। বার-এ বিলটা তিনিই মিটিয়ে দেন।
এই পর্যন্ত ভালই চলছিল।
শ্রীকৃষ্ণবাবু নিজের নামেই শ্রীকৃষ্ণ ক্যাসেট কোম্পানি চালু করতে উদ্যোগী হলেন। এই সময়েই তিনি সিঙ্গাপুর থেকে দুর্লভ পমেরেনিয়ানটি বহু মূল্যে কিনে আনেন।
কুকুরটির নামকরণ হয় ব্ল্যাক প্রিন্স। শ্রীকৃষ্ণবাবুর মনোবাসনা হল হিজ মাস্টার্স ভয়েসের কুকুরের মতো তিনিও তার কালো কুকুরের লোগো দিয়ে শ্রীকৃষ্ণ ক্যাসেট বাজারে ছাপবেন। বিজ্ঞাপনে, প্রচারে, ক্যাসেটের কভারে সর্বত্র ব্ল্যাক প্রোফাইল ফটো থাকবে। নীচে লেখা থাকবে।
কুকুরও ভালবাসে
শ্রীকৃষ্ণ ক্যাসেট
০২.
পটললালের আগমন
মিস জুলেখার তৎকালীন পতিদেবতা পটললালকে উদ্ধার করে মিস জুলেখার ক্রোড়ে ফিরিয়ে দেওয়ার পরে অল্প কিছুদিন জুলেখা দম্পতির সঙ্গে ডাক্তার সহদেব শুকের যোগাযোগ, যাতায়াত ছিল।
তারপর, যেমন হয় ধীরে ধীরে ডাক্তার শুক নিজের কাজকর্মে জড়িয়ে পড়ায় তাঁদের আর খোঁজখবর নিতে পারেননি, আর কার্যসিদ্ধি হওয়ার পর গোয়েন্দাকে, অসুখ সেরে যাওয়ার পরে ডাক্তারকে, মামলা জেতার পরে উকিলকে কেই বা খেয়াল রাখে, জুলেখা দম্পতিও যোগাযোগ রাখেননি। তাদের নিজের নিজের কাজকর্ম আছে।
জুলেখা অবশ্য গোড়ার দিকে একবার এসেছিল ওষুধ নিতে। না, কোনও অসুখ-বিসুখের ব্যাপার। নয়, তাঁর অসুবিধে দাঁড়িয়েছে তাঁর শরীরের আয়তন, মেদবৃদ্ধি নিয়ে।
মিস জুলেখা ভীষণ মোটা হয়ে গেছেন। বিশাল ভুঁড়ি হয়ে গেছে। নাচের মেয়েদের এরকম হয়। একটু ঢিল দিলেই বিসদৃশ মোটা হয়ে যেতে হয়।
