জলি বলল, আপনি কী করবেন জেনে? নিজের কাজে যাচ্ছি। আপনারা আপনাদের মেশিন নিয়ে চলে যান।
দাদা কী ভাবল কে জানে, জলিকে জিজ্ঞাসা করল, টাইপ মেশিনটা তুমি চাও? তুমি টাইপ করতে পারো? কিছু না বলে জলি থমথমে মুখে দাদার দিকে তাকাল। আমি আর তমিজমামু নিষেধ করতে যাচ্ছিলাম, কিন্তু তার আগেই দাদা জলিকে বলল, ভাল মেয়ে হও। ভাল পথে থেকে উপার্জন করো। মেশিনটা তোমাকে দিয়ে দিলাম। এখন থেকে সভাবে থাকো।
পিটার হাঁ করে দাদার মুখের দিকে তাকিয়ে রইল, তারপর আমাকে বলল, স্যার, বোকা রমেশবাবু কী বলবে?
তমিজমামু হাঁ করে আমার মুখের দিকে তাকিয়ে রইল। তারপর দাদাকে বলল, বড়মামু, বড়বাবু কী বলবে?
আমি হাঁ করে জলির মুখের দিকে তাকিয়ে রইলাম।
পরের দিন তমিজমামু দেশে ফিরে গেল।
দাদা তার হাতে চিঠি দিয়ে দিল, শ্রীচরণকমলেষু, টাইপরাইটার পাইয়া খুব খুশি হইয়াছি। ইত্যাদি।
দাদার কিন্তু এর পর কাজ বেড়ে গেল। দু-একদিন পরে হাজরার মোড়ে একটা সাইনবোর্ডের দোকান থেকে ইংরেজি এবং বাংলায় টাইপিং ডান হিয়ার, এখানে টাইপ করা হয় একটা ছোট বোর্ডে লিখিয়ে জলিদের বাড়ির গেটে লাগিয়ে দিয়ে আসে। বাড়িউলি সামান্য আপত্তি করেছিল, তাকে দাদা বোকা রমেশ দারোগার ভয় দেখায়।
এর পরেও দাদা মধ্যে মধ্যে জলির ওখানে যেত। জলি সত্যিই সচ্চরিত্র জীবনযাপন করছে কিনা দেখবার জন্যে।
তবে সে অন্য গল্প।
টালিগঞ্জে পটললাল
চিরকাল তো ছিল না। আজ সিনেমা বলতে সবাই হলিউড-হলিউড করে যাচ্ছে। আমেরিকার লস এঞ্জেলস শহরের গোলমেলে শহরতলি এখন হলিউড নামে পৃথিবীর চলচ্চিত্রের রাজধানী। অন্যদিকে হৃতগৌরব, দীর্ণ, জীর্ণ টালিগঞ্জ বছরের পর বছর ধুকছে। এবং সবচেয়ে অপমানের কথা এখন ওই ম্লেচ্ছদেশীয় হলিউডের অনুকরণে টালিগঞ্জকে টলিউড বলা হয়। কিন্তু ভাল করে অবশ্যই মনে আছে, অন্তত মনে না থাকার কথা নয়, এই টালিগঞ্জের সঙ্গে মিলিয়েই একদা হলিউডকে হলিগঞ্জ বলা হত।
এর সব কথা ডাক্তার সহদেব শুকের জানার কথা নয়। তিনি তাঁর পার্কসার্কাসের চেম্বারে বসে শেষ রোগী চলে যাওয়ার পরে হোমিওপ্যাথিক কবিতা লিখছিলেন।
সহদেববাবু হোমিওপ্যাথিক ডাক্তার, কবিতাও তিনি হোমিওপ্যাথিক ডোজে লেখেন। তাঁর কবিতায় তেজ বেশি, যদিও আকারে ছোট।
একটু সময় পেলেই সহদেববাবু কাব্যচর্চা করেন। চর্চা মানে অবশ্য পাঠ নয়। শুধু লেখা। লেখার জন্যেই লিখে যাওয়া।
এখানে উল্লেখযোগ্য এই যে মিস জুলেখার শেষতম স্বামী পটললালকে উদ্ধার করার পর তার গোয়েন্দাগিরিতে রীতিমতো হাতযশ হয় (পটললাল ও মিস জুলেখা দ্রষ্টব্য)। সহদেববাবু এখন ডাকাতি, রক্তারক্তির মধ্যে নেই, তিনি খুচখাচ পালিয়ে যাওয়া, হারিয়ে যাওয়া, দলিল-উইল জাল, তহবিল তছরূপ, জোচ্চুরি এইসব তদন্ত করেন। তবে তার পছন্দের কাজ হল, ব্যাভিচার, নারী হরণ, ফুসলানো ইত্যাদি সব স্ত্রী ঘটিত ব্যাপার।
কিন্তু কড়েয়া রোডে তাঁর হোমিওপ্যাথিক ডাক্তারখানায় রোগী গিজগিজ করে। কদাচিৎ সহদেব ডাক্তার সময় পান রোগী দেখা ছাড়া, ওষুধ দেওয়া ছাড়া অন্য কিছু করার। এবং এতে তার চমৎকার আয় হয়। আর সেই জন্যই হয়তো সহদেববাবুর মন চায় প্রাণ ভরে পদ্য লিখতে এবং সুযোগ পেলে গোয়েন্দাগিরির উত্তেজনায় জড়িয়ে পড়তে।
এই তো আজই কলকাতার বনেদি পাড়া গুরুসদয় দত্ত রোডের বিখ্যাত বড়লোক কোটিপতি খান্ডোলিয়ার বাড়ি থেকে একটা গোলমেলে কেস এসেছিল তার হাতে।
খান্ডোলিয়া পরিবারের প্রধান পেশা স্মাগলিং। দুবাইতে, সিঙ্গাপুরে, হংকংয়ে তাদের কাজকারবার, যাতায়াত। এ বছর গ্রীষ্মকালে খান্ডোলিয়া পরিবারের প্রধান স্বয়ং শ্রীকৃষ্ণ খান্ডোলিয়া সিঙ্গাপুর থেকে একটি কালো কুচকুচে পমেরেনিয়ান কুকুর বহুমূল্যে কিনে এনেছিলেন।
পমেরেনিয়ান হল ঝুলো ঝুলো লোমওয়ালা ফুটফুটে সাদা জাতের কুকুর। এ জাতের কুকুর অন্য কোনও রঙের প্রায় দেখাই যায় না। কিন্তু সিঙ্গাপুরের এই কুকুরটা হল অস্বাভাবিক কালো। এই কুকুরটি অত্যধিক দাম দিয়ে, দশ হাজার ডলারে ক্রয় করেছিলেন শ্রীকৃষ্ণবাবু।
অবশ্য এর পেছনে তার একটা ব্যবসায়িক বুদ্ধিও কাজ করেছিল।
নানা রকম ঝঞ্ঝাট, পুলিশ-আবগারি-আয়কর ইত্যাদির কারণে অতিষ্ঠ হয়ে শ্রীকৃষ্ণ খান্ডোলিয়া সম্প্রতি সিদ্ধান্ত নিয়েছেন চোরাকারবারির লাইন ছেড়ে দেবেন। নতুন ব্যবসায় যাবেন।
ব্যবসাটা ক্যাসেটের। ভিডিও ক্যাসেট। দূরদর্শনের জন্যে নয়, সরাসরি ভি সি পি-তে দেখানোর জন্যে, পঞ্চাশ মিনিটের আকাশি ছবি। পুরোপুরি নীল বা ব্লু-ফিল্ম যাকে বলে, তা নয়–সেন্সরের চোখে ধূলো দেবার জন্য একটু ঢাকাঢাকি থাকবে, একটু খোলাখুলিও থাকবে, তবে সেটা আলাদা প্রিন্টে, ছাড়পত্র পর্ষদের মাননীয় সদস্যদের সেটা দেখানো হবে না।
উত্তরপ্রদেশ, একটা ইউনাইটেড প্রভিন্সের, ইউ আর পি রয়েছে, ইংরেজি বানানে উত্তরপ্রদেশেও। ইউ পি অর্থাৎ ওপরে, আর সেই ওপরের ওপরে খান্ডোলিয়া পরগনা।
খান্ডোলিয়া পরগনার শেষ মনসবদার শ্রীকৃষ্ণ খান্ডোলিয়া প্রথম যৌবনে উর্দুমিশ্রিত হিন্দি ভাষার কয়েকটি কাহানিয়া রচনা করেছিলেন। দুই-একটি গল্পের নাম এই রকম পার্বতীর সঙ্গে তিনদিন চাররাত। কিংবা গভীর রাতে দিঘির পারে।
