মহানুভব লোক ছিলেন বোকা রমেশ চক্রবর্তী। তিনি কনকলতা দেবীকে বললেন, আমাদের সঙ্গে সঙ্গে থানায় পাঠিয়ে দিতে। কনকলতা বললেন, এখন নয়, ওরা দুপুরে খেয়ে-দেয়ে বিশ্রাম করে তিনটে নাগাদ যাবে।
সেদিন দুপুরে অনেকদিন পরে পিসির হাতের রান্না খেলাম। মুলেশাক ভাজা, লাউচিংড়ি, মিষ্টি কুমডোর চাপরঘণ্ট, বোয়াল মাছের ঝাল, নতুন আলুকপি দিয়ে রুই মাছের ঝোল আর সবশেষে অনবদ্য মাছের ল্যাজা আর শালুকের টক। মনে হচ্ছিল দেশে ফিরে গেছি। একটু গাঁইগুঁই করে আমাদের পাশে বসে তমিজমামুও খেল। চাপাতলা লেনের সেই বাড়িতে কেউ খেয়াল করতে যায়নি আমাদের তমিজমামু ব্রাহ্মণ কিংবা হিন্দু কিনা। দেশের বাড়িতে এ গোলমালটা তখনও ছিল।
সোয়া তিনটে নাগাদ থানায় গেলাম। অত্যন্ত বন্ধুত্বপূর্ণ পরিবেশ। গেটের সেপাই আমাদের দেখে কী করে কী বুঝল কে জানে, জিজ্ঞাসা করল, আপনারা রমেশবাবুর কাছে যাবেন?
দাদা চালাকি করে জিজ্ঞেস করল, কোন রমেশবাবু?
সেপাই গলা নামিয়ে বলল, বোকা রমেশবাবু। সামনের বাঁদিকের ঘরে আছেন। বলে চোখের কোণে এক ঝিলিক হাসল।
সামনের বাঁদিকের ঘরে ঢুকে গেলাম। একটা টেবিলের পিছনে চেয়ার জুড়ে গোলগাল নাদুসনুদুস এক ভদ্রলোক বসে রয়েছেন। যদিও পুলিশের পোশাক কিন্তু চেহারায় কেমন ভাল মানুষের ভাব, ইনিই নিশ্চয় বোকা রমেশবাবু। তাঁর পাশে মেঝের ওপরে দুটো লোক হাঁটু মুড়ে বসে রয়েছে। লোক দুটোকে দেখেই তমিজমামু চেঁচিয়ে উঠল, এই তো, এ দুজন! আরও একজন ছিল।
কোনওরকম পরিচয় বিনিময় করার আগেই রমেশবাবু বললেন, আপনারা এসে গেছেন, ভালই হয়েছে। এ দুটোকে ধরে এনেছি। তিন নম্বরটাকে ধরা যায়নি। তবে যাবে কোথায়? তারপর টেবিল থেকে একটা কালো কাঠের রুল তুলে মেঝেয় বসা লোকদুটোর পেটে দুটো খোঁচা দিয়ে বললেন, এগুলো পাকা জোচ্চোর। থানার নাম করে লোকের মাল কেড়ে নেয়।
ওই দুজনের মধ্যে একজন ফিরিঙ্গি, চুলের রং লাল, চোখের রং কটা, গায়ে রং সাদা–তাকে চুলের মুঠি ধরে দাঁড় করালেন রমেশবাবু। তারপর আমাদের বললেন, এর নাম পিটার। মহা শয়তান। এটাই পালের গোদা। এর সঙ্গে যান, টাইপ-রাইটার ফেরত দিয়ে দেবে। তারপর দ্বিতীয় লোকটাকে একটা লাথি মেরে বললেন, যা ভাগ।
আমরা বেরোতে বেরোতে শুনলাম, পেছন থেকে রমেশবাবু বলছেন, কোনও চালাকি করতে যেয়ো না পিটার, তা হলে একদম ডাকাতির মামলায় জুড়ে দেব।
আমরা রাস্তায় নেমে পিটারের সঙ্গে হাঁটতে লাগলাম। পিটার লোকটি জোচ্চোর কিন্তু সজ্জন, সে আমাদের সঙ্গে হাঁটতে হাঁটতে চমৎকার তালতলার বাংলায় বলল, স্যার, আপনাদের নিয়ে। যেতে লজ্জা করছে। আমরা কিন্তু খুব খারাপ জায়গায় যাচ্ছি।
আমি আর তমিজমামু মুখ চাওয়াচাওয়ি করলাম। দাদা জিজ্ঞাসা করল, খারাপ জায়গা কেন?
পিটার খুব সংকুচিত হয়ে বলল, স্যার, আমার স্বভাবদোষ। কাল রাতে মেশিনটা আমি জলিকে দিয়ে এসেছি।
দাদা বলল, জলি? জলি আবার কে?
পিটার আরও সংকুচিত হয়ে বলল, জলি খুব বাজে মেয়ে স্যার। খারাপ পাড়ার মেয়ে। মাঝে মাঝে ওর ওখানে যাই। সব সময় টাকা দিতে পারি না, কাল ওই মেশিনটা দিয়ে এসেছি।
ততক্ষণে আমরা হাঁটতে হাঁটতে চৌরঙ্গির মোড় পার হয়ে বাঁদিক ধরে জানবাজারের কাছে এসে পড়েছি। সত্যি গোলমেলে জায়গা, কার্তিক মাসের পড়ন্ত বিকেল, একটু ছায়া ছায়া অন্ধকার ভাব। এরই মধ্যে দালাল আর নষ্ট মেয়েছেলেরা রাস্তায় নেমে পড়েছে।
পরিবেশ বুঝতে আমাদের কোনওই অসুবিধে হচ্ছিল না, কালীঘাটে আমাদের বাড়ির পিছনেই খারাপ পল্লি, আর তমিজমামুও পাকা লোক।
একটি পুরনো দোতলাবাড়ির প্যাসেজে কয়েকটি অ্যাংলো ইন্ডিয়ান ও চিনা মেয়ে সেজেগুঁজে দাঁড়িয়ে, তারা পিটারকে দেখে চিনতে পারল। একজন বলল, হ্যালো পিটার?
পিটার জিজ্ঞাসা করল, জলি কঁহা? হোয়ার ইস জলি? জানা গেল জলি ঘরে আছে।
এ জায়গা পিটারের বেশ চেনা। সে আমাদের নিয়ে দোতলায় উঠল। সিঁড়ির শেষ মাথায় জলির ঘর। ঘরের সামনে মোটা পর্দা। পিটার আমাদের বলল, আসুন। বলে হন হন করে এগিয়ে গেল, তমিজমামু একবার গলাখাঁকারি দিল, দাদা দরজায় দুবার ঠুকঠাক করল, ভেতর থেকে সুললিত মেমকণ্ঠে জবাব এল, সরি, আই অ্যাম বিজি।
ঘরের মধ্যে ঢুকে কী দৃশ্য দেখব কী জানি, আমরা থমকে গেলাম। পিটার কিন্তু পর্দা সরিয়ে ঢুকে গেল। ঢুকে আমাদের ডাকল, আসুন স্যার, আপনারা আসুন।
একটু ইতস্তত করে আমরা ঢুকলাম। ঘরে ঢুকে দেখি একটা ডবলবেডের খাটের পাশে একটা ছোট গোল টেবিল। সেই টেবিলে আমাদের টাইপরাইটারটা বসানো। সামনে খাটে বসে একটি মেয়ে সেই মেশিনে কাগজ লাগিয়ে একমনে কী সব টাইপ করে যাচ্ছে।
অল্পবয়সি ফিরিঙ্গি মেয়ে, একুশ বাইশের বেশি হবে না। রং তত ফরসা নয়, কিন্তু বড় বড় দুটি। নীল চোখ, মুখে বেশ কমনীয়তা। শরীরে যৌবনের মাদকতা।
পিটার মেয়েটিকে বলল, জলি, ভেরি সরি। মেশিনটা ফেরত দিতে হবে। এঁরা নিতে এসেছেন।
টাইপ করা থামিয়ে জলি অবাক হয়ে আমাদের দিকে তাকাল। একটু পরে খাট থেকে নেমে উঠে দাঁড়াল, তারপর পিটারকে বলল, অলরাইট, নিয়ে যেও। আমার পাওনা টাকাগুলো মিটিয়ে দিয়ে। বলে সে বেরিয়ে যাচ্ছিল।
দাদা হঠাৎ তার পথ আগলিয়ে দাঁড়াল, প্রশ্ন করল, কোথায় যাচ্ছ?
