আজ সকালবেলা থানায় যাওয়ার সময় তমিজমামু কালকে রাতের সোয়েটারটা আবার গায়ে দিয়ে নিল। যদিও কার্তিক মাস, কিন্তু আজ সকালবেলা ঝনঝনে রোদ উঠেছে, বেশ গরম। এর মধ্যে তমিজমামুর গায়ে সোয়েটার দেখে আমরাও ঘামতে লাগলাম। দাদা বলল, আমরাও সোয়েটার গায়ে দিয়ে নেব নাকি?
আমি বললাম, সে কী!
দাদা বলল, থানায় মারধর করলে গায়ে সোয়েটার থাকলে চোট কম লাগবে।
দাদার কথার ইঙ্গিত বুঝতে পেরে তমিজমামু বলল, পুলিশের মারপিট সোয়েটার ঠেকাতে পারবে না। আমি সোয়েটার গায়ে দিলাম মনে বল আনার জন্যে। আঁটোসাঁটো পোশাক পরা থাকলে ভয় কম লাগে।
কিছুক্ষণের মধ্যে বাসে করে এসপ্ল্যানেডে নেমে আমরা গুটি গুটি হেঁটে দুরুদুরু বক্ষে টাইপরাইটার পুনরুদ্ধার করার জন্যে বউবাজার থানায় প্রবেশ করলাম।
থানা জায়গাটা যত ভীতিজনক ভেবেছিলাম, ঠিক তা নয়। সকালের দিক বলেই বোধ হয় থানার ভিতরটা প্রায় খালি। বড়বাবু দোতলায় না তিনতলায় বসবাস করেন, এখনও নামেননি। সামনের ঘরে টেবিলের ওপরে মাথা রেখে এই সাতসকালে ইউনিফর্ম পরা এক অফিসার ঘুমোচ্ছেন। তার মাথার কাছে একটা হুলো বেড়াল চোখ বুজে গ-র-র করছে।
আমরা ভদ্রলোককে ওঠানোর চেষ্টা করতে গেটের সেপাই বলল, এখন তুলবেন না। কাল রাতে নাইট ডিউটি ছিল।
একটু খোঁজখবর করতে বুঝলাম, কালীপুজো বলে এরকম ডিউটি প্রায় সকলেরই। কথা বলার লোক পাওয়া কঠিন। বহুক্ষণ অপেক্ষা করার পর থানার মালবাবু এলেন। মালবাবু নামে যে কোনও পদ থাকতে পারে, এ ধারণা আগে ছিল না। তবে মালবাবু লোক ভাল। আমাদের কথা মন দিয়ে শুনলেন। শুনে মাল-রেজিস্টার খুলে দেখে বললেন, না, কালকের তারিখে তো কোনও টাইপরাইটার মেশিন জমা পড়েনি! তারপর নিজে উঠে গিয়ে মালখানা খুলে দেখে বললেন, মালখানায় কোনও টাইপরাইটার নেই। কাল কেন, কোনওদিনই জমা পড়েনি।
আমরা হতাশ হয়ে থানা থেকে বেরিয়ে এসে সামনের ফুটপাতে দাঁড়ালাম। খিদে লেগেছিল, কাছে একটা চায়ের দোকানে বসে চা আর কেক খেতে খেতে দাদা বলল, চল চাপাতলায়, পিসিমার ওখানে যাই।
দাদার প্রস্তাবের পিছনে যুক্তি আছে। আমাদের এক দূরসম্পর্কের পিসির শ্বশুরবাড়ি কাছেই। বউবাজার চাপাতলায়। পিসির শাশুড়ি কনকলতা দেবী অতি ডাকসাইটে মহিলা। অনেককাল আগে। বউবাজার কালীবাড়িতে তখনকার বউবাজার থানার বড়বাবুর স্ত্রীর সঙ্গে তার আলাপ ও ঘনিষ্ঠতা হয়েছিল। সেই সূত্র ধরে কালক্রমে সমস্ত বড়বাবুর স্ত্রী এবং সেই সঙ্গে থানার বড়বাবু সমেত সেপাই-দারোগা সকলের সঙ্গে তার গভীর ঘনিষ্ঠতা। কালীবাড়িতে তাদের হয়ে তিনি মানত দেন। পুলিশের সঙ্গে তার এই সৌহার্দ্যের বিষয় আত্মীয়স্বজন সকলেরই জানা ছিল এবং এতে আমরা বিশেষ গৌরবান্বিত বোধ করতাম।
আমরা যখন চাঁপাতলায় পিসির শ্বশুরবাড়িতে গিয়ে পৌঁছলাম, তখন কনকলতা দেবী পুজোর ঘরে রয়েছেন। আমরা এসেছি শুনে তিনি একটু পরে বেরিয়ে এলেন। কাজের লোকদের বললেন আমাদের জলখাবার দিতে। তারপর আমাদের, বিশেষ করে তমিজমামুর কাছে বিস্তারিত শুনলেন। শোনার পর একটু থেমে গম্ভীর গলায় স্বগতোক্তি করলেন, কী সাহস, টাইপ-আইটার কেড়ে নিয়েছে। ভদ্রমহিলা আদ্যের উচ্চারণ করতে পারতেন না, রামকে আম বলতেন, রাইটার আইটার হয়ে গেল।
পুরনো আমলের বনেদি বাড়ি। ভেতরের বারান্দায় বড় কালো টেবিলের ওপরে টেলিফোন রয়েছে। কনকলতা আমাদের সেখানে নিয়ে গেলেন। তারপর দাদাকে বললেন, ফোনে বউবাজার। থানা ধরতে। ডিরেকটরি দেখে একটু চেষ্টা করতে বউবাজার থানা পাওয়া গেল।
এবার কনকলতা দেবীর নির্দেশমতো বিচিত্র কথোপকথন শুরু হল। বেলা প্রায় বারোটা হতে চলল, মনে হল, থানায় ইতিমধ্যে অনেক লোক এসে গেছে। দাদা ফোনে জানাল যে, কনকলতা দেবীর বাড়ি থেকে বলছি। তাতে বেশ সাড়া পাওয়া গেল এবং বোঝা গেল যে কনকলতা দেবীর প্রভাব থানার ওপরে যথেষ্ট পরিমাণ বিদ্যমান।
থানার সঙ্গে দাদার কথোপকথন চলল কনকলতা দেবীর নির্দেশে, দাদা জিজ্ঞেস করল, আপনি কে বলছেন? সাধারণত থানা কিংবা কোনও সরকারি অফিস থেকে এজাতীয় প্রশ্নের কোনও উত্তর পাওয়া যায় না, কিন্তু দাদার মুখ দেখে বোঝা গেল উত্তর এসেছে এবং সঙ্গে সঙ্গে দাদা সেটা রিলে করে দিল, রমেশ চক্রবর্তী।
সঙ্গে সঙ্গে কনকলতা দেবী বললেন, জিজ্ঞেস করো, কোন অমেশ?
এখানে এই ব্যাপারটার একটু ব্যাখ্যা প্রয়োজন। সেই সময়ে বউবাজার থানায় দুজন রমেশ চক্রবর্তী ছিলেন, দুজনেই এ-এস-আই বা ছোট দারোগা। এসব ক্ষেত্রে যেমন হয়, আসামি-ইনফরমার-সেপাই–থানার কাছাকাছি ও আশেপাশের লোকজন একটা সূক্ষ্ম পার্থক্য রচনা করেছিল দুজনের মধ্যে, তারা যেকোনও কারণেই হোক একজনকে বলত চালাক রমেশ অন্যজনকে বলত বোকা রমেশ। এসব খবর আমরা পরে জেনেছিলাম। কিন্তু সেদিন ফোনে দাদা বাধ্য বালকের মতো যখন জিজ্ঞাসা করল, আপনি কোন রমেশ? ও প্রান্ত থেকে স্পষ্ট উত্তর এল, আপনি দিদিমাকে বলুন, আমি বোকা রমেশ।
বলা বাহুল্য, বোকা রমেশ চক্রবর্তীকে সবাই যত বোকা ভাবত, হয়তো তিনি তা ছিলেন না। তা হলে অন্তত তিনি জানাতে পারতেন না যে তিনিই বোকা রমেশ। সেসব অন্য কথা। আসল কথা হল, এবার কনকলতা দেবী ফোনটা দাদার হাত থেকে তুলে নিলেন এবং যথাসম্ভব অপ্রাকৃত ভাষায় বোকা রমেশ চক্রবর্তীকে জানালেন পুলিশবাহিনীর অপদার্থতা বিষয়ে তার ব্যক্তিগত মতামত এবং তমিজমামুর টাইপ-আইটারের করুণ কাহিনি।
