টাইপ-রাইটারটি আমার মাতামহ উত্তরাধিকারসূত্রে পেয়েছিলেন তাঁর খুল্লতাতের কাছ থেকে। আমাদের সেই খুল্ল-প্রমাতামহকে আমরা খুব ছোটবেলায় দেখেছি। তিনি আগুন খেতে পারতেন। ইংরেজিতে যাকে বলে ফায়ার-ইটার, তিনি সেই ফায়ার-ইটার ছিলেন। যৌবনকালে তিনি আস্ত মশালের আলো গিলে খেতে পারতেন, গনগনে জ্বলন্ত মশাল হাঁ করে মুখের মধ্যে ঢুকিয়ে দিতেন, সমস্ত আগুন নিঃশেষে খেয়ে নেবানো মশাল মুখ থেকে বার করে আনতেন। ও বিষয়ে তাঁর খুবই নামডাক ছিল, দূর-দূরান্তর এমনকী ঢাকা-কলকাতা পর্যন্ত তার খ্যাতি বিস্তারিত হয়েছিল।
সতেরো-আঠারো বছর বয়েসে এনট্রান্স পরীক্ষায় অকৃতকার্য হয়ে সেই খুল্ল-প্রমাতামহ বাড়ি থেকে পালিয়ে যান গারো পাহাড়ে। সেখানে মান্ধাই নামে এক পাহাড়ি উপজাতির সংস্রবে আসেন, তাদের কাছেই আগুন খাওয়া শেখেন এবং আরও অনেক কিছু।
দুরারোগ্য গোপন রোগের টোটকা চিকিৎসাও জানতেন তিনি। যত রাজ্যের যত দুশ্চরিত্র, দুশ্চরিত্রা এসে ভিড় করত তাঁর কাছে। কোনও কোনও কুলত্যাগিনীর সঙ্গে তাঁর নিজেরও নাকি গর্হিত সম্পর্ক ছিল। সে অপবাদ কখনও কখনও বাড়ির অন্যদের গায়েও লেগেছে।
এসব অনেককাল আগেকার কথা। দ্বিতীয় মহাযুদ্ধ শুরু হতে তখন ঢের বাকি। আমি, দাদা, আমরা কেউই তখনও জন্মাইনি। যাকে বলে গিয়ে বাবার বিয়ে, আমাদের বাবার বিয়ে পর্যন্ত হয়নি তখনও, মামারবাড়ি তো বহু দূরে।
সেই সময়ে ঢাকা শহরে এক ফরাসি জাদুকর খেলা দেখাতে এসেছিলেন। আমার মাতামহের কাকা নৌকোয় করে ঢাকায় গিয়ে সেই খেলা দেখেছিলেন। খেলার শেষে সেই ফরাসি জাদুকরের সঙ্গে দেখা করে তিনি তাঁকে নিজের আগুন খাওয়ার খেলা দেখান। অচিরেই দুজনার মধ্যে গভীর বন্ধুত্ব গড়ে ওঠে।
ঢাকা থেকে খেলা দেখিয়ে চট্টগ্রাম হয়ে বার্মায় যান ফরাসি সাহেব। আমাদের মাতামহের ওই কাকাও তাঁর সঙ্গে যান। বার্মা থেকে ইন্দোচিন হয়ে দেশে চলে যাওয়ার সময় সাহেব তার অনেক জিনিসপত্র–যার মধ্যে ওই টাইপ-রাইটারটিও ছিল–তাকে দিয়ে যান।
কালক্রমে টাইপরাইটারটি খারাপ হয়ে এসেছিল, তবে ব্যবহারযোগ্য ছিল। মাতামহের চিঠিতে জানা গেল যে, যন্ত্রটির সবই ঠিকঠাক আছে, শুধু ছোট হাতের এম অক্ষরটি খসে পড়ে গেছে আর কতকগুলো অক্ষরের মাথায় চিহ্ন দেওয়া আছে।
এসব সমস্যা সম্পর্কে মাতামহ তাঁর চিঠিতে সুস্পষ্ট নির্দেশ দিয়েছিলেন। সে এক দীর্ঘ চিঠি, সম্পূর্ণ লিখতে গেলে গল্প মারা যাবে। পুরনো চিঠির তাড়া খুঁজে চিঠিটা বার করে শুধু অনিবার্য অংশটুকু উদ্ধৃত করছিঃ
ওঁ ভগবান ভরসা।
নিরাপদে দীর্ঘজীবেষ্ণু
বাবাজীবনদ্বয়,
…এখন তোমাদের চারদিকে চাকুরির দরখাস্ত পাঠাইবার বয়েস হইয়াছে। হাতে লেখা দরখাস্ত সাহেবরা কোনও কালে পাঠ করেন না। টাইপ করিয়া দরখাস্ত পাঠাইবার জন্য তোমাদের এই মেশিন পাঠাইলাম।
এই মেশিনটি খুবই সৌভাগ্যপ্রদ। ইহা ঘরে আসিবার পরই আমাদের পাটের ব্যবসা জমজমাট হইয়াছিল। এখন দেশকালের অবস্থা বিবেচনা করিয়া অত্যন্ত দুঃখের সঙ্গে ভগ্নহৃদয়ে এবং তৎসঙ্গে বহু আশা করিয়া তোমাদের সৌভাগ্য কামনা করিয়া মেশিনটিকে পাঠাইলাম।
মেশিনটিতে যৎসামান্য খুঁত আছে। ছোট হাতের এম অক্ষরটি নাই এবং কয়েকটি অক্ষরের মাথায় শুভ সংকেত আছে। চাকুরির আবেদনপত্র লিখিবার সময় চেষ্টা করিবে ছোট হাতের এম অক্ষর যেন কোনও শব্দে না থাকে। একটু মনোযোগ দিয়া চেষ্টা করিলেই ইহা করা সম্ভব। যদি একান্তই এম অক্ষর বাদ দেওয়া না যায়, তাহা হইলে টাইপ করার কালে ওই জায়গাগুলি ফাঁকা রাখিবে, টাইপ করা সম্পূর্ণ শেষ হইয়া গেলে কাগজ উলটাইয়া নিয়া শূন্য স্থানগুলিতে ডাবলিউ টাইপ করিয়া দিবে, কাহারও ধরিবার সাধ্য থাকিবে না।
শুভ সংকেতগুলি রাখিয়া দিয়ো, ওইগুলি ফরাসি কেতার। ইংরাজি-পড়া সুশিক্ষিত সাহেবদের কাছে উহার কদর আছে।
ইতি ১২ কার্তিক, বুধবার বাংলা সম্বৎসর ১৩৬২
চির আশীর্বাদক,
তদীয় মাতামহ।
বলা বাহুল্য, ওই দীর্ঘ পত্রে আরও বহু সদুপদেশ, ন্যায়বাক্য ও পরামর্শ ছিল। আমাদের পত্র পাঠ করা শেষ হওয়ামাত্র তমিজমামু আবার ডুকরে কেঁদে উঠল, এত বড় সর্বনাশ হয়ে গেল, বড়বাবুকে আমি কী করে মুখ দেখাব?
বড়বাবু মানে আমাদের মাতামহ। দাদা ধমকিয়ে উঠল, তুমি থামো তো তমিজমামু। বড়বাবুকে যা বোঝানোর আমি বোঝাব। তা ছাড়া কাল সকালে তো আমরা বউবাজার থানায় যাচ্ছি টাইপরাইটার নিয়ে আসতে, এখন তুমি ঘুমোওগে।
এই বলে দাদা ভেতরের ঘরে গিয়ে ছাদের টঙ থেকে পরপর তিনটে লেপ নামাল। এই লেপগুলোই গত বছর শীতে তমিজমামু এনে দিয়েছিল।
কিন্তু আজ অতগুলো লেপ দেখে ঘামন্ত তমিজমামু শিউরে উঠল, দাদাকে জিজ্ঞাসা করল, বড়মামু, এত লেপ কী জন্যে?
দাদা বলল, একটায় তুমি শোবে, একটায় তুমি মাথায় দেবে, আরেকটা গায়ে দেবে।
তমিজমামু বলল, এত শীত কোথায়?
দাদা তখন বলল, তাহলে এতক্ষণ সোয়েটার গায়ে দিয়ে ছিলে কী করে?
.
পরদিন সকালে আমরা দুভাই আর তমিজমামু অসীম সাহসে ভর করে বউবাজার থানা অভিমুখে রওনা হলাম। আমাদের দুভাইয়ের ইতিপূর্বে কোনও থানার মধ্যে প্রবেশ করার কারণ বা সৌভাগ্য ঘটেনি। তমিজমামুর পুলিশ সম্পর্কে অভিজ্ঞতা একটু অন্য রকম। প্রথম যৌবনে রক্তের চাঞ্চল্যবশত তমিজমামু কিছুকাল ধলেশ্বরীতে নৌকো ডাকাতি করেছিল, তমিজ মিঞার বীরত্ব ও সাহসের কাহিনি শুনে আমার মাতামহ বহু কৌশলে ও অর্থব্যয়ে তাকে পুলিশের হাত থেকে ছাড়িয়ে এনে আমাদের পাটগুদামের রক্ষণাবেক্ষণের কাজে নিযুক্ত করেন। পরে পাটগুদাম বন্ধ হয়ে গেলেও তমিজমামু মাতামহের কাছে থেকে যায়।
