খালি পেটে সেই ঝাল শরবত দু-এক চুমুক খেয়েই প্রায় সকলের মাথা ঘুরতে লাগল। অনেকে মণ্ডপেই বমি করে ফেলল। অনেকের বাসায় ফিরে গিয়ে পেটে ভয়ানক যন্ত্রণা হতে লাগল। ডাক্তার এসে বালতি বালতি নুন জল খাইয়ে গলায় আঙুল দিয়ে বমি করিয়ে পেট খালাস করে তাদের রক্ষা করলেন।
পুজো কর্তৃপক্ষ দাদার শরবতের ব্যবসা বন্ধ করে দিলেন। প্যান্ডেলের পাশে দোকান করার জন্যে দাদা পঞ্চাশ টাকা আগাম দিয়েছিল, কর্তৃপক্ষ সে টাকাও বাজেয়াপ্ত করলেন।
ওই কালীপুজোর আগের দিন রাত বারোটা এবং তারপরে পর্যন্ত আমি আর দাদা প্যান্ডেলে কর্তৃপক্ষদের ধরাধরি করছিলাম, ওই আগাম পঞ্চাশ টাকা ফেরত পাওয়ার জন্যে। কর্তৃপক্ষ তাদের সিদ্ধান্তে অবিচল ছিলেন, এক পয়সাও ফেরত দেননি।
অনেক রাতে ব্যর্থ হয়ে ফিরে খাওয়া-দাওয়া শেষ করে আমরা শুয়েছিলাম। ঘুম আসতে না আসতে সদর দরজায় ধাক্কাধাক্কির শব্দে জেগে উঠলাম। আমাদের বাড়িতে কোনও অভিভাবক না থাকায় দাদার বন্ধুরা আজকাল কেউ কেউ মদ খেয়ে গভীর রাতে এসে হল্লা করে, বিরক্ত করে। ঘণ্টা-টণ্টা তারা বাজায় না, দরজা ধাক্কাধাক্কি করা মাতালদের খুব পছন্দ।
একটু পরে ধাক্কাধাক্কির সঙ্গে ঘণ্টাও বাজতে লাগল, বেশ জোরে এবং দ্রুতলয়ে। তাড়াতাড়ি চোখ কচলাতে কচলাতে বারান্দায় এসে দেখি, দরজার কাছে সোয়েটার গায়ে এক ব্যক্তি ধাক্কা দিচ্ছে আর একটু পিছে পাড়ারই একটি বখা ছেলে দড়ি টেনে ঘণ্টা বাজিয়ে তাকে সাহায্য করছে।
দাদাও বারান্দায় আমার পাশে এসে দাঁড়িয়েছে। ওখান থেকে হেঁকে জিজ্ঞাসা করল, কে রে ওখানে?
দাদার গলার আওয়াজ পেয়ে পাড়ার ছেলেটি সরে গেল। দ্বিতীয় ব্যক্তিটি, যার গায়ে সোয়েটার, সে বলল, মামু, আমি তমিজ। মকদমপুরের তমিজ।
আমি সিঁড়ি দিয়ে নীচে নেমে তমিজকে উপরে নিয়ে এলাম। তমিজ মানে তমিজমামু। আমার মামাবাড়ির দেশের লোক। মামাবাড়িতেই কাজ করে। আমার মাকে দিদি বলে, গ্রাম সম্পর্কে আমরাও মামু বলি। তবে আমরা বাবুদের বাড়ির ছেলে বলে, আমরা বয়েসে অনেক ছোট হওয়া সত্ত্বেও তমিজমামু আমাদের নাম ধরে ডাকে না, দাদাকে বলে বড়মামু আর আমাকে বলে মাঝের মামু অর্থাৎ মেজমামু।
হেমন্তের শুরু, বাতাসে একটা হিম হিম ভাব। কিন্তু সোয়েটার গায়ে দেওয়ার সময় কলকাতায় এখনও হয়নি। বারান্দায় উঠে দেওয়ালের পাশে একটা জলচৌকি ছিল, সেখানে তমিজমামু বসল। এ বাড়ি তমিজমামুর চেনা। মামারবাড়ি থেকে গত কয়েক বছর পাকিস্তান হওয়ার পর থেকে জিনিসপত্র নিয়ে সে মাঝেমধ্যেই এখানে আসছে।
বারান্দায় আলোটা জ্বালিয়ে দিতে দেখলাম, সোয়েটার গায়ে দিয়ে তমিজমামু দরদর করে ঘামছে। শরীর থেকে সোয়েটারটা খুলতে খুলতে ভিতরের পকেট থেকে একটা চিঠি বার করে দাদার হাতে দিয়ে তমিজমামু ডুকরে কেঁদে উঠল, সর্বনাশ হয়ে গেছে! শেষরক্ষা করতে পারলাম না!
আমরা খুব ঘাবড়িয়ে গেলাম। দেশে কেউ মারা-টারা গেল নাকি, বুড়ো-বুড়ি বেশ কয়েকটা রয়েছে।
চিঠি পড়ে এবং তমিজমামুকে জেরা করে অবশ্য বোঝা গেল যে, ব্যাপারটা সত্যিই তেমন মারাত্মক কিছু নয়, অন্তত সর্বনাশ হওয়ার মতো নয়।
চিঠিটা আমার মাতামহের। দাদাকে এবং আমাকে যুগ্মভাবে লেখা। দীর্ঘ চিঠি, সে বিষয়ে পরে যাচ্ছি, আগে তমিজমামুর ব্যাপারটা বলি।
গ্রাম থেকে একটা পুরনো টাইপরাইটার যেটা আমার মাতামহ তাঁর পাটের অফিসের চিঠিপত্র লেখার কাজে ব্যবহার করতেন, আমাদের দুভাইকে পাঠিয়েছেন তিনি তমিজের মারফতে। বর্ডারে চেকপোস্ট দিয়ে এই টাইপরাইটার নিয়ে আসা যাবে না বলে তমিজমামু বর্ডারের কয়েক স্টেশন আগে ট্রেন থেকে নেমেছে। তারপরে সেখান থেকে ঘোড়ার গাড়িতে সাতক্ষীরা। সাতক্ষীরা থেকে নৌকোয় ভোমরা, বসিরহাট হয়ে কলকাতায়। কলকাতায় মানে কেষ্টপুরের খালে, এখন যেখানে সল্টলেক তারই পাশে। এরপর কেষ্টপুর থেকে কিছুটা পায়ে হেঁটে, তারপরে রিকশায়, শেষে বাসে।
সবশেষে নিরাপদে টাইপরাইটার নিয়ে ধর্মতলার মোড়ে নেমে যখন বাস বদলিয়ে কালীঘাটের বাসে উঠতে যাবে, তখন রাত প্রায় এগারোটা। এসপ্ল্যানেডের চারদিকটা কালীপুজোর মরশুম সত্ত্বেও নিঝুম হয়ে এসেছে। এসপ্ল্যানেডের বাসস্ট্যান্ডে যখন হাজরার বাসের জন্য তমিজমামু অপেক্ষা করছে, তিনজন সাদা পোশাকের পুলিশ এসে তাকে ধরে।
টাইপরাইটার ফুটপাতে নামানো ছিল। এদের মধ্যে একজন লাথি মেরে জিজ্ঞাসা করে, এ জিনিসটা কী?
যখন তমিজমামু জানায় যে এটা টাইপরাইটার, তারা বলে, চোরাই মাল, চলো থানায়, যেতে হবে। তমিজমামু অনেক অনুনয়-বিনয় করে কিন্তু তারা তাকে জোর করে বউবাজার থানার কাছে নিয়ে যায়, তারপর থানার সামনে থেকে গলাধাক্কা দিয়ে তাড়িয়ে দেয়, বলে যে, এখন ভাগো। তোমার যা বলার আছে কাল সকালে এসে বড়বাবুকে বলবে।
তমিজমামুর বৃত্তান্ত শুনে আমরা খুব একটা বিচলিত হলাম না। পার্টিশনের পর বর্ডার পার করে জিনিস আনতে গিয়ে কত লোকের কত কিছু খোয়া গিয়েছে, এ তো সামান্য একটা পুরনো টাইপ-রাইটার! তাও ইংরেজি নয়, ফরাসি টাইপরাইটার!
ফরাসি টাইপ-রাইটারের ব্যাপারটা বলি। ফরাসি টাইপ-রাইটার ইংরেজি টাইপরাইটারের চেয়ে তেমন কিছু আলাদা নয়। যন্ত্রপাতি, অক্ষরাদি সবই প্রায় একরকম, তবে কিছু কিছু ফরাসি অক্ষরের মাথায় একরকম চিহ্ন আছে, যা ইংরেজি অক্ষরে অনুপস্থিত।
