জীবজন্তু বা গাছপালা দেশের বাড়ি থেকে নিয়ে আসা সম্ভব ছিল না, কিন্তু পাকিস্তান হওয়ার পরে জিনিসপত্র কিছু কিছু আমরা কলকাতায় কালীঘাটের বাড়িতে নিয়ে এসেছিলাম তার মধ্যে পুজোর জিনিসপত্র ছিল। বোধ হয় চিন্তাটা ছিল এরকম যে, পাকিস্তানে পুজোআচ্চা চলবে না, তাই পুজোর সামগ্রীই সবচেয়ে আগে আনা হয়েছিল। যার একটি ছিল ওই কাঠমাণ্ডুর ঘণ্টা।
কাঠমাণ্ডুর ঘণ্টাটাকে আমরা দিশি কলিংবেল হিসেবে বারান্দায় টাঙিয়ে ছিলাম। বুদ্ধিটা ছিল দাদারই। ছাদের সঙ্গে দড়ি দিয়ে ঘণ্টাটাকে ঝুলিয়ে লম্বা পাটের দড়ির অন্য প্রান্ত সদর দরজার চৌকাঠের মাথায় একটা ফুটো করে রাস্তার দিকে বার করা ছিল। ওই দড়ি ধরে টানলেই দোতলায় ঘণ্টা বেজে উঠত। অনিবার্য কারণে সদর দরজায় দড়িটা যেখানে বার করা ছিল, ঠিক সেখানে দাদা আলকাতরা দিয়ে বড় বড় কাঠের পাল্লায় ওপরে লিখে দিয়েছিল, দোতলায় ঘন্টা বাজাইবার জন্য দড়ি একবার টানিবেন। বেশি টানিবেন না। ইহা গৃহস্থের বাড়ি, ফায়ার ব্রিগেড নহে। সাবধান!
বলা বাহুল্য, এই নির্দেশনামাটি যথেষ্টই প্ররোচনামূলক ছিল। ফলে এটা পড়ে অনেকেই, অনেক ভাল লোক পর্যন্ত, দড়ি ক্রমাগত টেনে যেত, যতক্ষণ পর্যন্ত দোতলার বারান্দায় কারও আবির্ভাব না হত। ফায়ার ব্রিগেডের মতো উচ্চ নাদে না হলেও ঢং ঢং করে বেজে যেত কাঠমাণ্ডুর ঘণ্টা।
সেদিনটা ছিল কালীপুজোর আগের দিন কিংবা আগের আগের দিন। আমাদের বাড়ির সামনেই ছিল পাড়ার কালীপুজোর মণ্ডপ। দুর্গাপুজো হত বড় রাস্তায় ট্রামলাইনের কাছে, কালীপুজোটা পাড়ার মধ্যেই আমাদের বাড়ির উলটোদিকের খালি তেকোণা জায়গায় হত। এখনও বোধ হয় তাই হয়।
সে যা হোক, সেদিন মণ্ডপে প্রতিমা নিয়ে আসা হয়েছে। আমি আর দাদা সেখানে দাঁড়িয়েছিলাম রাত বারোটা পর্যন্ত কিংবা তারও বেশি। দুর্গাপুজোর সময় দাদা ব্যবসা করতে গিয়ে সর্বস্বান্ত হয়েছিল। পুজোমণ্ডপে দাদা শরবতের দোকান দিয়েছিল–রায় স্পেশাল ড্রিঙ্ক। লেমন জুসের সঙ্গে রোজ সিরাপ মিশিয়ে তিন রকম শরবত হার্ড ড্রিঙ্ক মিডিয়াম এবং সফট। কঁচালঙ্কা বেটে রস করে একটা কাঁচের শিশিতে রাখা ছিল। হার্ড ড্রিঙ্কে দশ ফোঁটা, মিডিয়ামে পাঁচ ফোঁটা আর সফটে মাত্র এক ফোঁটা। হার্ডের দাম চার আনা, মিডিয়ামে সাড়ে তিন আনা আর সফট তিন আনা। অষ্টমীর দিন এক দুর্ঘটনায় সে শরবত বিক্রি বন্ধ হয়ে যায়। তবে তার আগেই বোঝা গিয়েছিল, জিনিসটা পাবলিক নেবে না। তখন খাঁটি কোকাকোলা চার আনা, লেমনেড, অরেঞ্জ তিন আনা। লোকে কেন দাদার এই গোলমেলে শরবত খেতে যাবে! তা ছাড়া সে বছর পুজোর সময় কাঁচালঙ্কার দাম দারুণ চড়া, পাঁচসিকে দেড় টাকা সের। তখন এক সের মাংসের দাম আড়াই টাকা, তার মানে দেড় টাকা সেরের লঙ্কা ভয়াবহ ব্যাপার। পাইকারিতে সস্তায় পাওয়া যাবে বলে একসঙ্গে পাঁচ সের কাঁচালঙ্কা সাত টাকায় কিনে দাদা রস করিয়েছিল।
দাম বেশি ছিল বটে, কিন্তু সে যে কী ঝঝ ছিল সেই কঁচালঙ্কাগুলোর! ছাদে হামানদিস্তা দিয়ে লোক লাগিয়ে হেঁচানো হয়েছিল সেই লঙ্কা, এর পর যাবতীয় চড়ুই, পায়রা আর কাক এক মাস বর্জন করেছিল আমাদের ছাদ। এমনকী লঙ্কার জ্বালায় পাড়ার বেড়ালগুলো পর্যন্ত আমাদের বাড়িমুখো হয়নি বেশ কয়েক সপ্তাহ।
আমাদের পিছনের বাড়ির এক বৃদ্ধ প্রতিদিন ভোরবেলা ছাদে উঠতেন সূর্যপ্রণাম করার জন্যে। ঘেঁতো লঙ্কার খোসাগুলো আমাদের ছাদের এক পাশে উঁই করে রাখা ছিল। চতুর্থ না পঞ্চমীর শেষরাতে একটু ঘুর্ণিঝড়ের মতো–এখনও কোনও কোনও বছর যেরকম হয় আর কী–ভোরবেলা মেঘ কেটে গিয়েছে কিন্তু তুমুল হাওয়া বইছে, দাদা হঠাৎ ছাদে উঠে গেল, আমাকে বলে গেল, বেদম হাওয়া উঠেছে, এবার লঙ্কার খোসাগুলো হাওয়ায় উড়িয়ে দিই, সব কালীঘাট আদিগঙ্গায় গিয়ে পড়বে, বিজনেস সিক্রেট গোপন করে ফেলি।
মিনিট পাঁচেকের মধ্যে ভয়াবহ আর্ত চিৎকারে পুরনো কালীঘাটের ঘুমন্ত পাড়া চমকিয়ে জেগে ওঠে। সেই কাঁচালঙ্কার জ্বলন্ত খোসার ঝড় বয়ে গিয়েছিল বৃদ্ধ সূর্যপ্রণামকারীর ওপরে। তারপর ডাক্তার, হাসপাতাল। কাঁচালঙ্কার জ্বালায় আমাদের নিজেদেরও বেশ জ্বলতে হয়েছিল। দাদার কথা ছেড়ে দিচ্ছি, দাদার শোধবোধ ছিল না, আমার নিজের মুখ চোখ লাল হয়ে গিয়েছিল। একসঙ্গে কয়েকশো পিঁপড়ে কামড়ালে যেমন যন্ত্রণা হওয়া সম্ভব, তাই হয়েছিল।
দাদার শিক্ষা হয়েছিল মহাষ্টমীর দিন। সপ্তমীর দিন শরবত ভাল বিক্রি হয়নি। পুজোর মেজাজ কোনও বছরই সপ্তমীতে বিশেষ জমে না। জমাটি পুজো শুরু হয় অষ্টমীর সন্ধ্যা থেকে। শহর, শহরতলি, গ্রাম, গঞ্জ থেকে দলে দলে কাতারে কাতারে লোক এসে উপচিয়ে পড়ে কলকাতার পুজোর প্যান্ডেলে। তখনই বেড়ে যায় খাওয়া-দাওয়া, ফুর্তির সওদা, কেনাবেচা।
দাদাও অষ্টমীর সন্ধ্যার জন্যে অপেক্ষা করে ছিল। কিন্তু গোলমাল হয়ে গেল দুপুরে।
কালীঘাট পাড়ায় চিরাচরিত রীতি অনুসারে মহিলারা অষ্টমীর দিন উপোস করেন। ঠিক নির্জলা উপোস নয়, ফল-শরবত এসব খাওয়া চলে। দুপুরবেলা সন্ধিপুজোর পরে যে মহিলারা অঞ্জলি দিতে এসেছিলেন, তাদের সবাইকে দাদা বিনি পয়সায় এক গেলাস করে শরবত উপহার দিলেন, বেশি করে লঙ্কার রস মেশানো স্পেশাল হার্ড ড্রিঙ্ক।
