একটু আগে শেয়াল ডাকছিল, এখন আর ঘণ্টাতিনেক ডাকবে না। এখন শুধু ঝিঁঝি পোকার ডাক। দূরে ইটখোলার এদিকটায় একটা তক্ষক সারা সন্ধ্যা ডাকছিল, সেটাও আর ডাকছে না।
ঠিক এই মুহূর্তে মাত্র দেড় গেলাসের মাথায় ছোটকাকা মাতাল হয়ে গেলেন। হঠাৎ উঠে দাঁড়িয়ে পুকুরের ওপারে রাধু পাগলার দিকে অঙ্গুলি নির্দেশ করে বললেন, আজ রাধুকে আমি ঠান্ডা করব, ওর অত্যাচার আর সহ্য হচ্ছে না।
বাবা এবং সোনাকাকা বাধা দিলেন, রাধু তো প্রত্যেকদিনই এ রকম করে। তোর কী? মাতলামি করিস না। চুপ করে বোস।
ঠাকুমা অল্প দূরে অন্ধকারে ঘরের মধ্যে বসে তার ছেলেদের অধঃপতনের দৃশ্য অভিনিবেশ সহকারে অবলোকন করছিলেন। মাতলামি শব্দটা শুনে কিংবা ছোটকাকার এই মারমূর্তি দেখে তিনি ডুকরে কেঁদে উঠলেন, ওরে বিশ্বম্ভর, তুই আমার এত বড় সর্বনাশ করে গেলি! ছাব্বিশ দিন বাথরুম ব্যবহার করার এই তোর প্রতিদান।
ঠাকুমার এই আর্ত চিৎকারে চারদিকে সোরগোল পড়ে গেল। লম্ফ, হ্যারিকেন হাতে আশেপাশের বাড়ি থেকে পাড়া-প্রতিবেশী ছুটে এল। এমনকী পুকুরের ওপার থেকে লাঠি ঘোরাতে ঘোরাতে রাধু পাগলাও আজ তোর একদিন কি আমার একদিন বলতে বলতে দৌড়ে এল।
হই-হট্টগোলে ঠাকুরদা আচমকা কঁচা ঘুম ভেঙে ভাবলেন যে, বুনো শুয়োর কিংবা পাগল শেয়াল বাড়িতে ঢুকেছে। তিনি বার বার চেঁচাতে লাগলেন, ওটার মুখে টর্চ ফোকাস কর, তা হলেই পালিয়ে যাবে।
সেদিন সেই পারিবারিক কেলেঙ্কারির তুঙ্গ মুহূর্তে দুজন মাত্র ঠান্ডা মাথার পরিচয় দিয়েছিলেন। একজন আমার মা, তিনি কেউ কিছু দেখবার বা বুঝবার আগে নিষিদ্ধ বোতলটি বারান্দা থেকে সরিয়ে ফেলেছিলেন। আর দ্বিতীয় জন আমার সোনাকাকিমা, তিনি তেওয়ারি ঠাকুরকে চার আনা পয়সা বখশিশ দিয়ে রাঙামামাকে ডেকে পাঠিয়েছিলেন।
পাড়ার সবাই সন্দেহজনক মুখ করে কিছুক্ষণ পরে চলে গেল। মা আসল বোতলটা লুকিয়েছিলেন, কিন্তু সোডার বোতল আর গেলাসগুলো তখনও শীতলপাটির ওপরে ছিল। তা ছাড়া ঠাকুমা যে হঠাৎ বাতের ব্যথায় ওরকম ডুকরে কেঁদে উঠেছিলেন, সেকথা কেউ বিশ্বাস করেনি।
সমস্ত লোকজন চলে যাওয়ার পরে রাঙামামা এলেন। সব শুনে তিনি তো স্তম্ভিত। তিনি যত ব্যাখ্যা করার চেষ্টা করেন যে, তাঁর মনে কোনও রকম কুমতলব ছিল না, ঠাকুমা ডুকরে ডুকরে কেঁদে ওঠেন, বিশ্বম্ভর, শেষ পর্যন্ত এই তোমার মনে ছিল!
পরের দিন সকাল সাতটায় স্টিমার, বাড়ি থেকে রাঙামামাকে অন্তত পাঁচটা সাড়ে পাঁচটায় বেরোতে হবে ঘোড়ার গাড়িতে স্টিমারঘাটে পৌঁছনোর জন্যে। নতুন কাজে যাবেন, জিনিসপত্র কিছু গোছানো হয়নি তখনও। কিন্তু সেদিন রাঙামামা রাত বারোটার আগে আমাদের বাসা থেকে পরিত্রাণ পেলেন না।
টমাটো সস জিনিসটা কী? মদের সঙ্গে তার তফাত কী? এসব দুরূহ প্রশ্নের উত্তর, সেই সঙ্গে টমাটো সসের ব্যবহার কী, এটা যে সোডা দিয়ে খেতে নেই, এটা যে কাসুন্দির মতো ভাজা জাতীয় খাবারের সঙ্গে মাখিয়ে খেতে হয়–সব কথা রাঙামামা গুছিয়ে বললেন। তিনি একথাও বললেন যে, ওই ব্র্যান্ডির খালি বোতলটা টমাটো সস ভাগ করে দেওয়ার জন্যে আজ সকালেই সাহেবদের বাবুর্চির কাছ থেকে নগদ এক আনা দিয়ে কিনেছেন। তিনি নিজে ব্র্যান্ডি-ট্যান্ডি কিছুই খান না, বোতল পাবেন কোথায়! রাঙামামার কথা কে কী বুঝল, কে জানে? পরদিন সকালবেলা ঘুম থেকে উঠে মা প্রথমেই বোতলটা উপুড় করে যা কিছু অবশিষ্ট ছিল রান্নাঘরের সিঁড়ির পাশে ফেলে দিলেন। ওই সিঁড়ির পাশে আমরা প্রতিদিন ভাত খেয়ে মুখ ধুয়ে আঁচাতাম।
সেই রান্নাঘরের পাশে আঁচানোর জায়গায় কিছুদিন পরে একটা চনমনে পেঁপেগাছ একা একাই জন্মাল। সেই গাছে কী চমৎকার বড় বড় পেঁপে হল, সংখ্যায় রাশি রাশি। সেগুলো গাছেই পাকল, গাছেই পাখিরা ঠুকরিয়ে খেয়ে নিল, আমাদের ঠাকুমা কোনওদিন বাড়ির কাউকে ওই মদ্যপ গাছের একটি পেঁপেও খেতে দেননি। কিছুদিন পরে লোক দিয়ে কাটিয়ে ফেলে দিলেন গাছটা।
টাইপ-রাইটার
তখন আমার বন্ধুদের মধ্যে দু-একজন সবে সিগারেট-টিগারেট খায়, সেও মোটামুটি লুকিয়ে-চুরিয়ে। দাদার বন্ধুরা কিন্তু মদ ধরেছে।
অনেকদিন আগের কথা। কলেজে পড়ার বয়স সেটা। আমি পড়তাম, দাদা কলেজ-টলেজে পড়েনি। লেখাপড়ায় দাদার মোটেই আস্থা ছিল না।
আমরা থাকতাম সেই কালীঘাটের পুরনো বাড়ির দোতলায়–পাশাপাশি দুটো ছোট ঘরে। ঘরের সামনে একটা একচিলতে পূর্বমুখী বারান্দা। সেই বারান্দায় দড়ি দিয়ে ঝোলানো ছিল একটা ঘণ্টা। ঘন্টাটা পিতলের বা কাসার, ঠাকুমার পুজোর সামগ্রীর মধ্যে ওটা আমরা পেয়েছিলাম। বেশ ভারী, পুজো করার সময় পুরোহিতেরা যেরকম ঘণ্টা হাতে দুলিয়ে বাজান–সেই জাতের ঘণ্টা, তবে অপেক্ষাকৃত বড় সাইজের। আর শব্দটাও একটু গম্ভীর প্রকৃতির। ছোটবেলায় আমরা শুনেছি, দেশের বাড়িতে এ ঘণ্টাটাকে বলা হত কাঠমাণ্ডুর ঘণ্টা। কবে কোনকালে কে যেন চৈত্র মাসে পশুপতিনাথের মেলায় গিয়ে কিনে এনেছিল। সেসব আমাদের জন্মের ঢের আগের কথা।
তবে একটা কথা বলে রাখি, শুধু এ কাঠমান্ডুর ঘণ্টাই নয়–এইরকম আমাদের বাড়ির অনেক জিনিসের গায়েই–সেগুলো যেখানে থেকে এসেছে–সে জায়গার নামের ছাপ দেওয়া ছিল। কাশীর কলসি ছিল, ছিল পুরীর লাঠি, হরিদ্বারের থালা। আর শুধু জিনিসপত্রের কথা নয়, জীবজন্তু, গাছপালা–তার পরিচয়ও আমাদের জায়গা দিয়ে। দেওঘরের পেয়ারা বা ধামরাইয়ের কুলগাছ– সেও আমাদের দেশের বাড়িতেই ছিল এবং শুধু তাই নয়, আরও ছিল সরাইলের কুকুর আর ঢাকার বেড়াল।
