কিন্তু এর পরেই ঘটল ভয়াবহ মারাত্মক এক ঘটনা এবং সেই সঙ্গে যবনিকাপতন। কী যে সঠিক হয়েছিল কেউ ভাল করে জানে না, বোঁচা ডাক্তার এবং তার বাড়ির লোকেরাও কখনও কাউকে বলেনি। একদিন শেষরাত্রে বোঁচা ডাক্তারের বাড়ির দিক থেকে প্রচণ্ড হইচই, চিৎকার, চেঁচামেচি শোনা গেল। বামা কণ্ঠে ইংরেজি গালাগাল রাস্কেল, স্টুপিড, বাস্টার্ড, বিচ, সান অফ এ বিচ… বাইরের উঠোনে দাঁড়িয়ে মেম তার ভাষায় অকল্পনীয় অকথ্য শব্দগুলি চেঁচিয়ে বলে আর থুথু ফেলে। ডাক্তারবাড়ির উঠোনটা থুথুতে ভিজিয়ে হাতে হান্টার কাঁধে সুটকেস, ব্রিচেস জাতীয় প্যান্ট পরা রণরঙ্গিনী মূর্তিতে মহিলা পতিগৃহ থেকে বেরিয়ে গট গট করে বাজারের রাস্তায় গিয়ে একটা টমটম গাড়ি ভাড়া করে স্টিমারঘাটের দিকে চলে গেল। পড়ে রইল তার শাখাসিঁদুর, লালপাড় শাড়ি, পান-দোকতা। সে আর ফেরেনি।
পুরো শহরটা থমকে গিয়েছিল সেদিন। ওই ছোট শহরের ইতিহাসে অনুরূপ উত্তেজনাময় প্রভাতকাল এর আগে আর কখনও আসেনি।
সুতরাং রাঙামামা বিলেত থেকে যদি মেমবউ নিয়ে আসে, তবে কী হবে এই আশঙ্কা স্বভাবতই ছিল। সবাই বলাবলি করত, যুদ্ধে সব সাহেব তো মরে ভূত হয়ে গিয়েছে, মেম সাহেবেরা বর পাবে কোথায়, তারা কি সুপাত্র পেলে ছেড়ে দেবে, ঝুলে পড়বে না!
কিন্তু যে কারণেই হোক মেমসাহেবরা রাঙামামাকে রেহাই দিয়েছিল। তার ঘাড়ে ঝুলে পড়েনি। রাঙামামা বিলেত থেকে একাই ফিরেছিলেন। মেম জুটিয়ে আনেননি। ফলে নিঃসঙ্গ রাঙামামা ফিরে আসায় হিতৈষীরা বেশ একটু স্বস্তিই পেলেন।
বিলেত থেকে মেম আনেননি বটে, তবে একটা খারাপ অভ্যেস সঙ্গে করে নিয়ে এসেছিলেন। সেটা নিতান্ত ব্যক্তিগত ব্যাপার, বাথরুম সংক্রান্ত।
ব্যাপারটা সত্যি গোলমেলে। সাত বছরে রাঙামামার অভ্যেস সম্পূর্ণ বদলে গিয়েছিল। তাদের নিজেদের বাড়িতে বাথরুম ইত্যাদির যা বন্দোবস্ত ছিল তা প্রাগৈতিহাসিক, কোনও রকমে আবরু রক্ষা।
ফিরে এসে এই দিশি ব্যবস্থায় রাঙামামার খুবই অসুবিধে হচ্ছিল। খবরটা তাঁর দিদি অর্থাৎ আমাদের সোনাকাকিমার কানে ওঠে দু-একদিনের মধ্যেই।
আমাদের বাড়িতে আমাদের ঠাকুরদার ঘরের সঙ্গে লাগানো একটু চলনসই গোছের বাথরুম ছিল, সেটায় আমাদের প্রবেশাধিকার ছিল না। শুধু ঠাকুরদা ব্যবহার করতেন সেটা, আর যদি কখনও কোনও অভিজাত অভ্যাগত থাকতেন, তাঁকে ওই বাথরুমটা ব্যবহার করতে দেওয়া হত।
ওই বাথরুমে অবশ্য জলের কল ছিল না। শুধু ওই বাথরুমে কেন, আশেপাশে পঞ্চাশ মাইলের মধ্যে কোথাও জলের কল ছিল না। সিমেন্ট বাঁধানো টব ছিল বাথরুমের একপাশে, ইদারা থেকে বালতি বালতি জল তুলে সেটা কাজের লোকেরা ভরে রাখত।
সোনাকাকিমা ঠাকুরদাকে বলে তার বিলেত-ফেরত ভাইয়ের জন্যে বাথরুমটার বন্দোবস্ত করলেন।
প্রতিদিন সকালবেলা খেয়া নদী পার হয়ে ছাতা মাথায় দিয়ে রাঙামামা দেড় মাইল হেঁটে আমাদের গাঁয়ে স্নান-প্রাতঃকৃত্যাদি করতে আসতেন। তখনও কাঁধের ঝোলা ব্যাগ চালু হয়নি, একটা বিলিতি পোর্টফোলিয়ে ব্যাগে তোয়ালে, পাজামা ইত্যাদি ভরে সঙ্গে নিয়ে আসতেন তিনি।
ক্রমে রাস্তাঘাটে, পাড়ায় লোকজন সবাই জেনে গিয়েছিল রাঙামামার এই প্রাত্যহিক আগমনের কারণ। কোনও কোনও দিন হয়তো অন্য কাজেই রাঙামামা বিকেল বা সন্ধ্যায় আমাদের বাসায় এসেছেন। কিন্তু আমরা ধরেই নিয়েছিলাম, ইনি বাথরুমে যাবেন বলে এসেছেন। সঙ্গে সঙ্গে চিৎকার, চেঁচামেচি শুরু হয়ে যেত, এই, কে আছিস! বিশ্বম্ভর এসেছে, তাড়াতাড়ি দ্যাখ, বাথরুমে জল আছে। নাকি?
বিশ্বম্ভর বলা বাহুল্য, রাঙামামার প্রকৃত নাম। কখনও কাজের লোকের সাড়া না পেলে ঠাকুমা রাঙামামাকে চিন্তিত হয়ে প্রশ্ন করতেন, বাবা বিশ্বম্ভর, তোমার তাড়াতাড়ি নেই তো?
ব্যাপারটা ক্রমশ অতিশয় হাস্যকর হয়ে দাঁড়িয়েছিল। রাঙামামাকে আমাদের বাড়ির দিকে আসতে দেখলেই রাস্তার লোকেরা হাসাহাসি করত, বলত, বিলেত-ফেরত কাজে যাচ্ছে।
শুধু রাস্তার লোক কেন, আমাদের বাড়ির লোকেরা, এমনকী গুরুগম্ভীর মুহুরিবাবুরা পর্যন্ত মুখ টিপে হাসতেন। আমাদের রান্নার ঠাকুর ছিল তেওয়ারি। সে একদিন বলেছিল, শালাবাবুর একদম শরম নাহি আছে। সেকথা শুনে সোনাকাকিমার সে কী রাগ। তেওয়ারি কিন্তু কাউকে পরোয়া করত না, বিশেষ করে সোনাকাকিমা জাতীয় নতুন বউদের যারা মাত্র দু-দশ বছর এ বাড়িতে এসেছে তাদের ধর্তব্যের মধ্যে আনত না তেওয়ারি ঠাকুর, তার তখন পঁচিশ বছর পূর্ণ হয়ে গেছে আমাদের বাসায়।
এসব যা হোক, রাঙামামার এই হাস্যকর পর্যায় খুব বেশিদিন চলেনি। সপ্তাহ তিন-চারেকের মধ্যেই তিনি ধানবাদ না আসানসোলে কোথায় যেন কয়লাখনিতে কাজ নিয়ে চলে গেলেন। তখন কয়লাখনিগুলোর অধিকাংশ ম্যানেজারই সাহেব। সেই ম্যানেজার সাহেবদের বাংলোতে আর যাই হোক, বিলিতি প্রিভিওয়ালা বাথরুম অবশ্যই ছিল। ফুটবল খেলার মাঠের মতো বিশাল বিশাল সেই সব বাথরুমের বর্ণনা দিয়ে রাঙামামা চাকরিতে জয়েন করে সোনাকাকিমাকে বিশদ চিঠি দিয়েছিলেন।
বাথরুমের ব্যাপারটা ইচ্ছায়-অনিচ্ছায় অনেকটা গড়িয়ে গেল।
কিন্তু এ গল্প বাথরুমেব নয়। এ গল্প টমাটো সসের। এতক্ষণ শুধুই ভণিতা হল, এবার আসল বিষয়ে যেতে হচ্ছে।
