টমাটো নামক তরকারি কিংবা ফলটি তখনও জলচল হয়নি, অন্তত আমাদের ওই অঞ্চলে। পুজোপার্বণে টমাটোর চাটনি চলত না, ঠাকুরদালানে টমাটো ছিল নিষিদ্ধ। লোকে কাঁচা টমাটো বিশেষ খেত না, তরকারিতে মাছ-মাংসে টমাটো দেওয়ার রীতিও প্রচলিত হয়নি।
বাজারে সামান্যই উঠত টমাটো, চাষও হত কম। যেটুকু টমাটো বাজারে উঠত, তার প্রায় সমস্তটাই পাটের সাহেবরা কিনে নিয়ে যেত। বাকি অল্প কিছু কারা কিনত কে জানে, আমরা তো কখনও কিনিনি। সত্যি কথা বলতে কী, জিনিসটাকে আমরা টমাটো বলতাম না। আমরা বলতাম বিলিতি বেগুন। রং এবং আকারের পার্থক্য বাদ দিলে, টমাটো গাছের পাতার এবং ফুলের আশ্চর্য সাদৃশ্য আছে বেগুনের সঙ্গে, তাই হয়তো এই নাম। যেভাবে একদা বিলিতি কুমড়ো কিংবা বিলিতি আমড়ার নামকরণ হয়েছিল।
এই সামান্য আখ্যানে টমাটো সম্পর্কে এত কথা বলার প্রয়োজনই পড়ত না, যদি না রাঙামামা চাকরি নিয়ে চলে যাওয়ার আগে আমাদের আধ-বোতল টমাটো সস দিয়ে যেতেন।
যুদ্ধ-বিধ্বস্ত বিলেত থেকে রাঙামামা ফেরার সময় প্রায় কিছুই কারও জন্যে আনতে পারেননি। কোনও রকমে নিজের পৈতৃক প্রাণটি নিয়ে ফিরেছিলেন। তাঁর নিজের দিদি অর্থাৎ আমাদের সোনাকাকিমাকে একটা মাফলার দিয়েছিলেন, আর আমার সাহেবি-ভাবাপন্ন ঠাকুরদাকে দিয়েছিলেন। একজোড়া জার্মান সিলভারের কাটা-চামচ।
আমাদের সকলেরই ধারণা ছিল যে, এই দুটো উপহারের জিনিসই পুরনো, আগে ব্যবহার করা। বিশেষ করে জার্মান সিলভারের ব্যাপারটায় সবাই ধরে নিয়েছিল, এ নিশ্চয় যুদ্ধের আগে কেনা। কারণ যুদ্ধের পরে আর জার্মান সিলভার আসবে কোথা থেকে? সোনাকাকিমার আশকারাতে এসব নিয়ে যৎকিঞ্চিৎ গুজগাজ, ফিসফিস হয়েছিল, কিন্তু সোনাকাকিমা মনে আঘাত পেতে পারে এই ভেবে তার সামনে এ নিয়ে বিশেষ উচ্চবাচ্য কেউ করেনি।
যাওয়ার আগের দিন সন্ধ্যাবেলা রাঙামামা এলেন। তাকে দেখেই আমার ঠাকুমা যথারীতি ব্যস্ত হয়ে পড়লেন, এই বিশ্বম্ভর এসেছে, তাড়াতাড়ি বাথরুমে জল দে, আলো দে! জনৈক পরিচারিকা নির্দেশ শুনে সঙ্গে সঙ্গে একটা লম্ফ নিয়ে বাথরুমে রাখতে গেল।
একটু বিব্রত হয়ে রাঙামামা বললেন, না, বাথরুমে যাব না। কাল তো চলে যাচ্ছি নতুন কাজে, তাই একটু দেখা করতে এলাম।
সোনাকাকিমা পাশের বাড়িতে আড্ডা দিতে গিয়েছিলেন, তাড়াতাড়ি ভাইয়ের গলা শুনে ছুটে এলেন। কিছুক্ষণ গল্পগুজব করে রাঙামামা উঠবার সময় তার হাতের ব্যাগ থেকে একটা আধভরতি বোতল–যার মধ্যে একটা লাল রঙের ঘন তরল জিনিস রয়েছে, সেই বোতলটা সোনাকাকিমাকে দিয়ে গেলেন। বললেন, এটা জামাইবাবুকে দিস, মাছভাজার সঙ্গে খাবে, খুব ভাল জিনিস। আমারটা থেকে অর্ধেক দিয়ে গেলাম।
আমরা কাছেই এসে বসেছিলাম। রাঙামামা উঠে যাওয়ার আগেই লণ্ঠনের আলোয় আমরা বোতলটা নিয়ে ঘুরিয়ে ফিরিয়ে দেখছিলাম, ভেতরে লঙ্কাবাটার মতো ঘন লাল কী একটা জিনিস, আর বোতলটার গায়ে ইংরেজিতে কী সব লেখা, সুপক্ক দ্রাক্ষাগুচ্ছের ছবি আঁকা বোতলের গায়ে লাগানো রয়েছে। দেখলেই কেমন লোভ হয়, বোঝা যায় মহার্ঘ্য সুস্বাদু পানীয়।
আসলে একটা খালি বিলিতি ব্র্যান্ডির বোতলে কৃপণ রাঙামামা নিজের টমাটো সসের বোতল থেকে কিছুটা উপহার দিয়েছিলেন।
টমাটো সস সম্পর্কে আমাদের তখন কোনও রকম ধারণাই ছিল না। আমরা শিশুরা কেন, বড়রাও ধরতে পারল না জিনিসটা কী?
সন্ধ্যার পরে বাজারের চায়ের স্টল থেকে আড্ডা দিয়ে সোনাকাকা ফিরলেন, বোতলটাকে ঘুরিয়ে ফিরিয়ে, তারপর লেবেলটা পড়ে উচ্ছ্বসিত হয়ে পড়লেন, বললেন, শালা তো খাঁটি বিলিতি জিনিস দিয়ে গেছে। যাই জিনিসটা দাদাকে দেখিয়ে আনি।
তখনও পর্যন্ত মদ জিনিসটা আমাদের বাড়িতে প্রবেশাধিকার পায়নি। মদ ব্যাপারটা খুব চালু ছিল না। শহরে সিনেমা হলের সামনে প্রতিদিন সন্ধ্যাবেলা চক্রবর্তী বাড়ির বোঁচা ডাক্তারের এক কাকা শূন্য বোতল হাতে লাফালাফি দাপাদাপি করে খুব মাতলামি করতেন। এতদিন পরে মনে হয়, ব্যাপারটা সম্পূর্ণ মদমত্ততা ছিল না, ওর মধ্যে অনেকটা অভিনয় ছিল।
এ ছাড়া আগের বছর লক্ষ্মীপূর্ণিমার রাতে দুজন পাটের সাহেব মাতাল অবস্থায় পাটগুদামের মাঠে মল্লযুদ্ধ করেছিল। শহরসুদ্ধ নোক পরিষ্কার ঝকঝকে জ্যোৎস্নার আলোয় সে লড়াই উপভোগ করেছে।
আমার বাবাকে বোতলটা নিয়ে সোনাকাকা দেখালেন। আদালত থেকে ফিরে একটু বেড়িয়ে এসে তখন বাবা বারান্দায় ইজিচেয়ারে শুয়ে বিশ্রাম করছিলেন। বোতলটা দেখে বাবা খুশিই হলেন, হ্যারিকেনের ফিতেটা একটু উসকিয়ে দিয়ে ভাল করে বোতলটা দেখলেন, তারপর বললেন, কলকাতার হার্ডিঞ্জ হোস্টেলে আমার পাশের ঘরে রংপুরের একটা ছেলে, কী রায়চৌধুরী যেন নাম ছিল, সে প্রত্যেকদিন সন্ধ্যাবেলা সোড়া আর বরফ কিনে এনে সেগুলো মিশিয়ে এই সব জিনিস খেত। আমাকে বেশ কয়েকবার খাওয়ার জন্যে সেধেছে। সাহস পাইনি। এর পরে বোতলটা খুব যত্ন নিয়ে দেখে বললেন, তবে রায়চৌধুরী যে জিনিসটা খেত, সেটা লাল ছিল না আর এত ঘনও ছিল না।
সোনাকাকা বললেন, তোমার বন্ধু সস্তার জিনিস খেত, তাই অত হালকা। এটা হল আসল জিনিস, সলিড অ্যালকোহল। বিশ্বম্ভর সোজা বিলেত থেকে নিয়ে এসেছে, কম কথা নাকি!
