রাঙামামা ছিলেন আমার সোনা কাকিমার আপন দাদা, সোনা কাকিমা বলতেন ফুলদা। সেই সোনা আর ফুল দুইয়ে মিলেমিশে কী করে রাঙা হয়েছিল, সে এক কঠিন সমস্যা, এখন আর। সমাধান করা সম্ভব নয়, কিন্তু সেকালে এমন হত।
পৃথিবী থেকে রাঙাদা আর সোনাদা কিংবা ফুলদা-রা নিশ্চিহ্ন হয়ে যাওয়ার মুহূর্তে, হাম দো। হামারা দো সভ্যতার এই মর্মান্তিক সংকটে গল্পের দরজায় দাঁড়িয়ে সোনা, ফুল আর রাঙাদের কথা কিঞ্চিৎ উল্লেখ করে রাখি।
সবচেয়ে যে বড়, সে বড়দা বা বড়কাকা বা বড় মাসিমা। বড়-র পর মেজো, তারপর সেজো, তারপরে বা কোথাও কোথাও প্রয়োজনমতো রাঙা, সোনা, নোয়া, ফুল এবং সর্বশেষ ছোড়দি বা ছোটপিসি। এর পরেও যদি কেউ থাকে তাকে নাম ধরে সঙ্গে দাদা বা পিসি যোগ করে সম্বোধন। করা ছাড়া গতি নেই।
অবশ্য এসব ঝামেলা থেকে এখন আমরা প্রায় মুক্ত হতে চলেছি। রাঙাদা, সোনাদা বহু দিন গেছে, ছোড়দা বড়দাও যায়-যায়। এর পরে মামা কাকা, মাসি-পিসি খুঁজে পাওয়া অসম্ভব হবে।
এসব অবান্তর কথা থাক। আমরা আমাদের মূল গল্পে ফিরে যাই। রাঙামামার গল্প।
আমি রাঙামামাকে আগে দেখিনি। আমার খুব ছোটবেলায় তিনি বিলেত গিয়েছিলেন। সেটা সেই দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের একটু আগে। তাকে আমি সেই সময় দেখে থাকলেও, অত অল্প বয়েসের। কিছু মনে নেই আমার।
খনিবিদ্যার অর্থাৎ মাইনিংয়ের কী একটা উচ্চমানের অধ্যয়নের জন্যে রাঙামামার বিলেতযাত্রা, তিনি গিয়েছিলেন নিউ ক্যাসেলে।
বাংলা কথায় আছে, তেলা মাথায় তেল দেওয়া, তেমনই ইংরেজিতে বলা হয় নিউ ক্যাসেলে কয়লা নিয়ে যাওয়া। ওই নিউ ক্যাসেলেই রাঙামামা গিয়েছিলেন।
পরে শুনেছি, রাঙামামা যখন বিলেত যাওয়ার পূর্বাহ্নে আমাদের বাড়িতে দেখা করতে আসেন, তখন তার নিজের জামাইবাবু ফুলকাকা একটা খুব ছোট বাক্সে খুব ভাল করে বাঁশ কাগজ দিয়ে প্যাকিং করে মানে রাঙামামাকে কী একটা জিনিস উপহার দেন। ফুলকাকা তার শালাকে বলেছিলেন, নিউ ক্যাসেলে গিয়ে খুলে দেখবে, খুব ভাল লাগবে।
সেই প্যাকেটের মধ্যে নাকি কয়েক টুকরো কয়লা পোরা ছিল। জানি না, নিউ ক্যাসেল পর্যন্ত সেই কয়লা বহন করে নিয়ে রাঙামামা কতটা কৌতুকান্বিত বোধ করেছিলেন সেই মোক্ষম বিদেশে, কিন্তু এই ঘটনাটা আজ এই প্রায় অর্ধেক শতাব্দী পরেও আমাদের বাড়িতে অনেকেরই মনে আছে। এই নিয়ে সেই আমলের আমরা যারা দু-চারজন এখনও আছি, দেখা হলে হাসাহাসি হয়।
মাত্র দু বছরের জন্যে বিলেত গিয়েছিলেন রাঙামামা। সেখানে গিয়ে যুদ্ধের মধ্যে আটকে পড়েন। যুদ্ধ শেষ হলে ফিরলেন, সে প্রায় সাত বছর পরে।
সে ফেরাও খুব সহজ হয়নি। অনেক অপেক্ষা করে তারপর ঘুরপথে দেশে এসেছিলেন। এডেনে এসে জাহাজ বদলিয়ে এবং আরও মাসখানেক আটকিয়ে থেকে তিনি যে জাহাজে উঠলেন, সেটা যখন বোম্বে পৌঁছাল, তখন সেখানে ধর্মঘট চলছে কিংবা অন্য কী একটা গোলমাল।
রাঙামামার বহুবিধ দুর্দশার বিস্তারিত বিবরণে না গিয়ে বলি, অবশেষে তিনি দেশে মানে তার নিজের গ্রামে, এসে পৌঁছালেন যাত্রা শুরু করার প্রায় ছয় সাত মাস পরে।
আমাদের টাউন আর রাঙামামাদের গ্রাম খুব কাছাকাছি ছিল, মধ্যে মাত্র একটা ছোট নদী। নদীর ওপারের ঘাটে স্নান করতে দেখে আমার ঠাকুমা নিজে পছন্দ করে রাঙামামার বোন সোনাকাকিমাকে নিয়ে এসেছিলেন বাড়ির বউ করে।
সে যা হোক, রাঙামামা যখন গ্রামে ফিরে এলেন তখন তার ঘাড় পর্যন্ত ছড়ানো রুক্ষ আ-তেলা চুল, পরিধানে গরম কোট-প্যান্ট, পোড়ামাটির পুতুলের মতো গায়ের কালচে রং। বাড়ির লোকেরা কিন্তু এ সমস্ত দেখেও মোটেই বিচলিত বোধ করেনি। তারা সবাই আশঙ্কা করেছিল, এতদিন পরে রাঙামামা নিশ্চয় মেমসাহেব বউ নিয়ে ফিরবে।
তখনও মেমসাহেব বউ ব্যাপারটার খুব চল হয়নি দেশে, বিশেষ করে সেই অজ মফস্সলে। মেমসাহেব সম্পর্কে এর কিছুদিন আগেই একটা গোলমেলে ব্যাপার ঘটে গিয়েছিল আমাদের টাউনেই।
চক্রবর্তীদের বাড়ির বড় ছেলে, শহরের মধ্যে ডাকনামে তাঁর পরিচয় ছিল বোঁচা ডাক্তার। তিনি ডাক্তারি পাশ করে বাজারের পাশে একটা ফার্মেসিতে এসে বসেন এবং ভালই প্র্যাকটিস করছিলেন। এই সময় যুদ্ধ। যুদ্ধে নাম লিখিয়ে তিনি আর্মির ডাক্তার হয়ে চলে যান। তারপর যুদ্ধ শেষ হলে নামের পাশে অবসরপ্রাপ্ত মেজর উপাধি অর্জন করে আবার শহরে ফিরে এলেন।
কিন্তু তিনি একা এলেন না। সঙ্গে নিয়ে এলেন বিবাহিতা স্ত্রী, এক ইঙ্গ-ভারতীয় মেমসাহেব। যুদ্ধের সময় একই হাসপাতালে মহিলা নাকি নার্স ছিলেন, সেখানেই কাজ করতে করতে আলাপ, পরিচয়, প্রণয় ও পরিণয়।
বাড়ির লোক এসব কথা আগে জানতে পারেনি। সবাই মেমবউ দেখে হতচকিত হয়ে পড়ল। কৌতূহল, উৎকণ্ঠা সব কিছু মিলিয়ে ওই মফসলের শহরে সেই মেমকে নিয়ে হাটে-বাজারে, পুকুরঘাটে, বার লাইব্ররিতে হঠাৎ নানাবিধ গুঞ্জন শুরু হল।
কিন্তু মেম যখন লালপাড় শাড়ি পরতে আরম্ভ করল, তারপর অল্প অল্প করে পান-দোকতা খেতে শুরু করল, অবশেষে একদিন পুকুরের ঘাটে রীতিমতো ডুব দিয়ে স্নান করল, এমনকী বোঁচা ডাক্তারের গোরু পর্যন্ত মেম নিজেই দুইতে লাগল–সকলেই স্বীকার করল যে, বোঁচা ডাক্তারের স্ত্রীভাগ্য ভাল। মেম সন্ধ্যাবেলা ঘোমটা টেনে সিঁথিতে সিঁদুর দিয়ে শাশুড়ির সঙ্গে এরপর যেদিন কালীবাড়িতে প্রণাম করতে গেল, সেদিন অতি বড় নিন্দুকেরাও স্তব্ধ হয়ে গিয়েছিল।
