তবে আলুভাজা, বাদাম ইত্যাদি চাট জাতীয় জিনিস বিয়ারের সঙ্গে যা এল তার ভালই সদ্ব্যবহার করলেন সব্যসাচী। বোঝা গেল তার বেশ খিদে লেগেছে, যদিও আপাতত সেটা কিছুটা উপশম হল।
জগদানন্দ পুরনো বন্ধুকে সিগারেট এগিয়ে দিলেন, মহামূল্যবান বিলিতি ডানহিল সিগারেট। সঙ্গে সঙ্গে সব্যসাচী হাত নেড়ে তা প্রত্যাখ্যান করলেন, কিছু মনে করো না জগা, কোনও নেশা আমার নেই, কোনওদিনই কোনও নেশা করিনি।
এই ক্লাবে জগদানন্দের নিয়মিত বন্ধুবান্ধবেরা যথারীতি অন্য টেবিলে হল্লা করছিল। তারা জগদানন্দের সাথে অন্য বাইরের লোক, বিশেষত ওই রকম দুঃস্থ একজনকে দেখে আর ঘটায়নি, তবে বিস্মিত হয়েছে।
এদিকে জগদানন্দ আপনমনে বিয়ার খেতে খেতে এবং সব্যসাচীকে খুঁটিয়ে দেখতে দেখতে সহধর্মিণী হেমলতার কথা ভাবছিলেন। মেয়েছেলেটা আজকাল রাতদিন জ্বালাতন করে, সিগারেট খেলে বাধা দেয়, মদ খেলে বাধা দেয়, সব কিছুতে বাধা দেয়, আবার কিছুই হেমলতার কাছে গোপন করা যায় না, সব কিছুই সে কী করে যেন টের পেয়ে যায়।
কিছুক্ষণ পরে বিয়ারের পাত্র নিঃশেষ হল। তখন সব্যসাচী উঠে দাঁড়ালেন, জগদানন্দকে বললেন, মনে হচ্ছে তুমি আরেকটু খাবে। তুমি থাক, আমি যাই। তারপর ঘুরে দাঁড়িয়ে বললেন, দশটা টাকা যদি ভিক্ষা দিতে দুপুরের খাওয়াটা কোথাও সেরে নিতাম। আজকের দিনটা কাটত।
জগদানন্দ বললেন, তুমি আমার বাল্যবন্ধু, তোমাকে আমি ভিক্ষা দিতে যাব কোন দুঃখে, তুমি আমার সঙ্গে চলো আমি তোমাকে টাকা ধার দেব সেই টাকা দিয়ে নিজে উপার্জন করবে, আমার টাকা শোধ দেবে, নিজেরও দুপয়সা থাকবে।
এবার গন্তব্যস্থল রেসকোর্স। গাড়িতে উঠে যেতে যেতে জগদানন্দ পার্স খুলে একটা একশো টাকার নোট সব্যসাচীর হাতে দিয়ে বললেন, আমরা ময়দানে রেসের মাঠে যাচ্ছি। প্রথম বাজির টিপ হল। হ্যানি বয়, ও ঘোড়া না জিতে যায় না, জিতবেই, জিতলে টাকা তোমার, আর যদি ভাগ্য খারাপ হয়…
ততক্ষণে শিউরে উঠে একশো টাকার নোটটা জগদানন্দের মুঠোর মধ্যে খুঁজে ফেরত দিয়েছেন সব্যসাচী, মুখে প্রতিবাদ জানালেন, না, না, রেসের মাঠে যাব না। জুয়া আমি কোনওদিন খেলিনি, খেলব না।
বিমূঢ় জগদানন্দ বুক পকেটে দোমড়ানো একশো টাকার নোটটা রেখে অবাক হয়ে সব্যসাচীর দিকে তাকিয়ে রইলেন।
সব্যসাচী তখন জগদানন্দকে বললেন, দ্যাখো, তোমার আমোদ প্রমোদে আমি বাধা দিতে চাই না। গাড়িটা থামাও, আমি কোথাও নেমে যাই, আর সেই দশটা টাকা যদি দিতে…
জগদানন্দ বললেন, দশ টাকায় কি খাওয়া হবে তোমার। বরং তুমি আমার সঙ্গে চলো।
সব্যসাচী জিজ্ঞাসা করলেন, কোথায়?
জগদানন্দ বললেন, চলোই না। আশমানি বলে আমার এক গার্লফ্রেন্ড আছে। আমার ক্লায়েন্টদের দেখাশুনা করে। চমৎকার ঠুংরি গায় মেয়েটা। এই তো কাছেই ইলিয়ট রোডে ফ্ল্যাট। চলো আশমানির ওখানে যাই। তোমাকে আসল মোগলাই খানা খাওয়াব আজ দুপুরে।
এবারেও প্রতিবাদ করলেন সব্যসাচী, ওসব আশমানির ফ্ল্যাট-টল্যাটে খারাপ জায়গায় আমি যাব। টাকা দশটা যদি দাও, এখানে নেমে যাই।
কী চিন্তা করে জগদানন্দ বললেন, মাত্র দশ টাকা নয়, আমি তোমাকে এক হাজার টাকা দেব, আর সেটা ভিক্ষাও নয় সেটা তোমার উপার্জন। শুধু তোমাকে একটা ছোট কাজ করতে হবে।
আশঙ্কিত হয়ে সব্যসাচী বললেন, কী কাজ? আমি কিন্তু কোনও খারাপ কাজ করতে পারব না।
জগদানন্দ বললেন, না হে, খারাপ কাজ কিছু নয়। তোমাকে শুধু একবার আমার সঙ্গে আমাদের বাড়িতে যেতে হবে।
সব্যসাচী বললেন, কিন্তু কেন? তোমার বাড়িতে গিয়ে আমি কী করব?
জগদানন্দ বললেন, তোমাকে কিছুই করতে হবে না। আমি শুধু তোমাকে নিয়ে গিয়ে আমার বউ হেমলতাকে একটু দেখাব?
বিপন্ন সব্যসাচী জগদানন্দকে শেষ প্রশ্ন করলেন, হেমলতাকে কী দেখাবে? আমি দর্শনীয় কীসে?
জগদানন্দ বললেন, হেমলতাকে দেখাব, সিগারেট না খেলে, মদ না খেলে, কোনও নেশা না করলে, জুয়া বা রেস না খেললে, আশমানির ফ্ল্যাটে কখনও না গেলে মানুষের কী দশা হয়।
টমাটো সস
অনেকে হয়তো বিশ্বাস করবেন না, কিন্তু কথাটা রীতিমতো সত্যি।
আমি প্রথম টমাটো সস দেখি কলকাতা আসার ঢের আগে, কলকাতা থেকে অনেক দূরে এক নিতান্ত পাড়াগেঁয়ে মফসসল শহরে। সে বহুকাল আগে।
ঠিক শহর নয়, বলা উচিত গণ্ডগ্রাম। স্থানীয় লোকেরা মুখে বলত টাউন। তখন সবে যুদ্ধের শেষ হয়েছে, ডামাডোলের বাজার। আমাদের শহরে তখনও ইলেকট্রিসিটি আসেনি, রেললাইন নদীর ওপারে। তিরিশ মাইল দূরে, কয়েকটা টিনের লম্বা চারচালার নীচে একটা সিনেমা হল রয়েছে, সেখানে ছবির প্রত্যেক রিলের শেষে একবার ইন্টারভ্যাল, প্রোজেকটরে রিল বদলিয়ে তারপর পরের কিস্তি। একালের দূরদর্শনের ধারাবাহিক তেরো ভাগের বহু আগে সেখানে অনিবার্য কারণে শুরু হয়েছিল সেই কিস্তিমালা।
সেই ১৯৪৫-৪৬, যুদ্ধ শেষ, দুর্ভিক্ষ শেষ। তখনও পার্টিশানের ধাক্কা এসে লাগেনি আমাদের সেই ভাঙা দালানে আর পুরনো আটচালা ঘরে। সেই দালান আর টিনের ঘর দুটো মহাযুদ্ধ, কয়েকটা ঘূর্ণিবাত্যা আর কিছু বন্যা আর খরা আর দুর্ভিক্ষ কোনও রকমে পার হয়ে তখনও টিকে ছিল।
সেই সময়ে আমাদের রাঙামামা ফিরলেন বিলেত থেকে। রাঙামামা আমাদের নিজের মামা নন, আমাদের নিজেদের কোনও মামা ছিল না কস্মিনকালে, অর্থাৎ আমার মার কোনও ভাই ছিল না। আমার বাবা প্রকৃত শালা বলতে কী বোঝায় তা জানতেন না।
