অনেক কিছু ফেলে এসেছেন জে এন আর, আত্মীয় বন্ধুদের সঙ্গে রীতিমতো বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছেন কিন্তু তার বহুদিনের সুখ-দুঃখের সঙ্গিনী সহধর্মিণী হেমলতার জাল ছিঁড়ে বেরোতে পারেননি। সেই
প্রথম যৌবনে তাদের বিয়ে হয়েছিল, বড়লোকের মেয়ে হেমলতা গৃহশিক্ষক জগদানন্দের হাত ধরে। পিতৃগৃহ পরিত্যাগ করে চলে এসেছেন।
জগদানন্দের উত্থান সেখান থেকেই শুরু। ছেলেপিলে হয়নি, নিঃসন্তান হেমলতা এই মধ্যবয়সে ভারী থলথলে শরীর, দোক্তাপান চিবোনো আতার বিচির মতো কালো দাঁত আর সোনার চশমায় অপরূপা।
কিন্তু হেমলতাকে পরিত্যাগ করার সাহস জগদানন্দের ছিল না, এখনও নেই। যত দিন যাচ্ছে হেমলতার কঠোর শাসনে তার প্রাণ ওষ্ঠাগত হয়ে উঠেছে। তার সবরকম আমোদ ফুর্তিতে হেমলতা বাধা দেবে, গোপনে কিছু করলে রক্ষা নেই, ভয়াবহ গোলমাল শুরু হবে।
সে যা হোক মর্নিং ওয়াক করা জে এন আর সাহেবের একটা পুরনো অভ্যাস। তিনি এটাকে উন্নতির একটা সোপান বলেই গণ্য করেন। সাবেকি শিল্পপতি পরিবারগুলির বংশধরদের মতো অশ্বারোহণ, গলফ খেলা বা হেলথ ক্লাব তার পছন্দ নয়। তিনি সকালবেলা হাঁটেন, হাঁটার পথে বহু ক্ষমতাবান, রইস লোকের সঙ্গে পরিচয় হয়, জীবনে কাজে লাগে।
শনিবার সকালেও, যত দেরি করেই ঘুম থেকে উঠুন, স্নান করে, দাড়ি কামিয়ে, ব্রেকফাস্ট সেরে হাঁটতে বেরিয়ে পড়েন জগদানন্দবাবু। লেকের একটা ছায়া সুশীতল মোড়ে তাকে নামিয়ে দিয়ে ড্রাইভার অপেক্ষা করে, কারণ এর পরে শনিবারের অনেক অন্যরকম কার্যকলাপ আছে তার।
সে যা হোক আজ একটু বেশি বলা হয়েছে, লেকে নিয়মিত পদচারীদের প্রায় কেউই নেই। তা ছাড়া বেশ ঝা ঝা রোদ উঠেছে, চড়া রোদে চারদিক ঝিমঝিম করছে।
এক গাছের ছায়ায় তার প্রিয় বেঞ্চে প্রথমে কিছুক্ষণ বসেন জগদানন্দবাবু। আজ বসতে গিয়ে দেখেন সেখানে আগে থেকেই অন্য একজন লোক বসে রয়েছে।
লোকটার বয়েস হয়েছে, কেমন দীন, দুঃস্থ ভাব। গায়ে সেলাই করা পুরনো ময়লা পাঞ্জাবি, ততোধিক ময়লা ধুতি। পায়ে সুতো দিয়ে স্ট্র্যাপ জোড়া দেওয়া হাওয়াই চপ্পল।
একটু কোনা ঘেঁষে জগদানন্দবাবু বেঞ্চটায় গিয়ে বসলেন। তিনি বসার পর লক্ষ করলেন ওই লোকটা তার দিকে ঘন ঘন তাকাচ্ছে।
একবার মুখ ঘুরিয়ে ভাল করে তাকিয়ে দেখে জগদানন্দবাবুর মনে হল কেমন চেনা চেনা, যেন অনেক দিনের পূর্বপরিচিত। কিন্তু তাকে খুব বেশিক্ষণ সমস্যায় থাকতে হল না। হঠাৎ পাশের লোকটি তাকে বলল, আরে তুমি জগা নও।
জগদানন্দবাবুও ততক্ষণে চিনতে পেরেছেন। সব্যসাচী, সব্যসাচী পাল। চল্লিশ বছর আগে একসঙ্গে দুজনে তীর্থপতি স্কুলে পড়তেন। সব্যসাচী ফার্স্ট হত। জগদানন্দ কোনওরকমে উতরিয়ে যেতেন।
পরেও মাঝেমধ্যে দু-এক জায়গায় দেখা হয়েছে তবে সেও অনেককাল আগে। যতদূর মনে পড়ে, গত বিশ পঁচিশ বছর আর মোটেই দেখা হয়নি। তবু পুরনো সহপাঠী বন্ধু, চিনতে অসুবিধে হল না।
কিছুক্ষণে মধ্যে দুজনের সুখ-দুঃখের আলোচনা শুরু হল। এসব ক্ষেত্রে যেমন হয় কিছুটা স্মৃতিকথা অল্পবয়েসের মধুর দিনের প্রসঙ্গ আর সেই সঙ্গে বর্তমান জীবনের গ্লানি–এই নিয়ে টুকটাক কথাবার্তা।
কথায় কথায় প্রায় স্বাভাবিক ভাবেই জগদানন্দবাবু সব্যসাচীকে জিজ্ঞাসা করলেন, তোমার এ হাল হল কী করে? আমতা আমতা করে সব্যসাচী প্রশ্নটা এড়িয়ে গেলেন, জগদানন্দবাবুও খুব জোর করলেন না জবাবের জন্য।
একটু পরে যখন জগদানন্দবাবু উঠছে খুব সংকোচের সঙ্গে সব্যসাচী জগদানন্দকে বললেন, দ্যাখো জগা, খুব লজ্জা হচ্ছে বলতে, এতদিন পরে দেখা, তবু পেটের দায়ে বলতে হচ্ছে, কাল রাত থেকে কিছু খাইনি কলের জল ছাড়া, খিদেয় মাথার ঘুরছে, পা কাঁপছে তাই লেকের বেঞ্চে এসে বসেছিলাম, তুমি যদি দশটা টাকা দাও তাহলে অনেকদিন পরে একটা ভাতের হোটেলে গিয়ে পেট পুরে একবেলা খেতাম।
শনিবারের দুপুরে ক্লাবে একটা আচ্ছা আছে। জগদানন্দ প্রত্যেক শনিবার দুপুরে সরাসরি লেক থেকে সেখানেই চলে যান। আজ সব্যসাচীর কথা শুনে তার মনে হল একটু উদারতা দেখাই, ক্লাবের বন্ধুদের সব্যসাচীকে নিয়ে গিয়ে দেখাই, গরিব, অসফল, হতদরিদ্র বাল্যবন্ধুকে আমি ফেলি না, তাকেও সমান খাতির করি।
জগদানন্দ উদারভাবে বললেন, সব্য, তুমি আমার বাল্যবন্ধু তোমাকে ভাতের হোটেলে খাওয়ার টাকা আমি দিতে যাব কেন, তুমি আমার সঙ্গে চলো, ভাত খেতেই হবে এমন কোনও কথা নেই, আরও কত ভাল ভাল পেট ভরানোর জিনিস আছে সংসারে, তুমি আমার সঙ্গে চলো৷
সব্যসাচী কী বুঝলেন কী জানি, একটু ইতস্তত, একটু দোনামনাভাবে তিনি জগদানন্দের সাথে রওনা হলেন।
জগদানন্দের গন্তব্য মাত্র আধ কিলোমিটার দূরে রবীন্দ্রসরোবরের এক প্রাচীন ক্লাবে। তিন মিনিটের মধ্যে জগা আর সব্য দুই বাল্যবন্ধু, একজন সফল অন্যজন অসফল দুজনে ক্লাবের দোতলায় পৌঁছে গেলেন।
জগদানন্দবাবু এক প্লেট বাদাম, দুই প্লেট আলুভাজা আর দুটো বিয়ার অর্ডার দিলেন। সঙ্গে সঙ্গে প্রতিবাদ করলেন সব্যসাচী, একটা বিয়ার নাও, আমার জন্যে বিয়ার লাগবে না।
জগদানন্দবাবু বললেন, সে কী, কেন? সংকোচ করছ কেন?
সব্যসাচী শুকনো মুখে জবাব দিলেন, না আমি ড্রিঙ্ক করি না, কোনও দিনই করিনি। জগদানন্দ বোঝাতে চেষ্টা করলেন বিয়ার ঠিক মদ নয়, কিন্তু সব্যসাচী বিয়ার পান করতে কিছুতেই রাজি হলেন না।
