পেশকার গজগজ করতে করতে চলে যায়, আমি তো জানলুম। কিন্তু হাকিম কি সেটা জানেন?
জেলখানা থেকে দাদার মালপত্র ছাড়িয়ে বেরোলাম। বেরোবার সময় দাদা জেলারকে বলল, চললাম। সকলেরই খালাস হয়, তোমার আর খালাস নেই। উন্নতি হলে বড় জেল, না হলে এই ছোট জেল। থাকো সারাজীবন।
কলকাতায় দাদাকে নিয়ে এসে পৌঁছলাম। আশ্চর্য, দাদা জীবনবাবু বা তার পায়রাগুলোর ব্যাপারে কোনও কথাই বলল না। শুধু মধ্যে মধ্যে বাঁকাচোখে পায়রাগুলোকে দেখতে লাগল।
পরদিন রবিবার। জীবনবাবু সকালের দিকে স্নান-টান করে প্রত্যেক রবিবার কালীঘাট মন্দিরে পুজো দিতে যান। জীবনবাবু যেই বেরিয়ে গেলেন দাদা মোড়ের মাথার মডার্ন স্টেশনার্সে গিয়ে এক কৌটো লাল আর এক কৌটো কালো রঙের জুতোর কালি কিনে আনল। বুঝতে পারলাম, একটা কিছু মতলব মাথায় আছে। তারপর বারান্দায় বসে এক মুঠো চাল ছিটিয়ে দিল। চাল দেখে আস্তে আস্তে পায়রাগুলো নেমে এল। দাদাও একটু একটু করে হাত বাড়িয়ে এক একটা পায়রা ধরে আর বুরুশে কালি মাখিয়ে সাদা পায়রাগুলোকে কালো রং আর কালো পায়রাগুলোকে লাল রং করে দিল। বাদামি রঙের পায়রাদুটোকে খুব যত্ন করে কোথাও কালো কালি, কোথাও লাল কালি পালিশ করা হল। বাধা দিয়ে কোনও লাভ নেই, আমি কিছু বললাম না।
গোটা দশেক নাগাদ জীবনবাবু কপালে সিঁদুর-টিটুর দিয়ে ফিরে এলেন। কিন্তু ততক্ষণে হুলুস্থুলু কাণ্ড। আঠারোটা পায়রা পাগলের মতো পরস্পর মারামারি আরম্ভ করেছে।
আমার পায়রাগুলো গেল কোথায়, এই বিশ্রী রঙের পায়রাগুলো এল কোত্থেকে? জীবনবাবুর কণ্ঠস্বরে কী ছিল কে জানে, হঠাৎ সেই আঠারোটি হিংস্র পায়রা সমবেতভাবে জীবনবাবুকে আক্রমণ করল। জীবনবাবু প্রথমে ছাতার নীচে গিয়ে বসে পড়ে আত্মরক্ষার চেষ্টা করলেন, কিন্তু কোনও সুবিধা হল না, ঠুকরে ঠুকরে পায়রাগুলো মাংস তুলে নিল। তখন লেপ। লেপের নীচে আশ্রয় নিলেন জীবনবাবু। সন্ধ্যার দিকে পায়রাগুলো কোথায় চলে গেল।
জীবনবাবু উচ্চবাচ্য না করে একটা ঠেলাগাড়ি ডেকে এনে মালপত্র তুলতে লাগলেন। একটি কথাও বললেন না। দাদা তখন নেমে গিয়ে বলল, কী খবর জীবনবাবু, কোথায় যাচ্ছেন?
জাহান্নামে! জীবনবাবু খেঁকিয়ে উঠলেন।
সেটা আমরা না পাঠালে আপনি যেতে পারেন না। আপনাকে সুদ্ধ আমরা এই বাড়ি কিনেছি। আপনাকে ছাড়লে তো যাবেন! দাদা বলল, তারপর যোগ করল, আচ্ছা ঠিক আছে! যাও বীর, তুমি মুক্ত।
পরদিন সকালে খবরের কাগজ কিনতে গিয়ে হাজরার মোড়ের দক্ষিণ কোণের ল্যাম্পপোস্টে একটি বিজ্ঞাপন নজরে পড়ল–
বিজ্ঞাপন
নির্ঝঞ্ঝাট মধ্যবয়সি ভদ্রলোকের জন্য ঘরভাড়া চাই–দেয়াল বা ছাদ না থাকিলেও চলিবে। যদি কোনও পরোপকারী ভদ্রলোক ঘরের সন্ধান দিতে পারেন চিরকৃতজ্ঞ থাকিব। এই ল্যাম্পপোস্টের নীচে প্রতিদিন সন্ধ্যায় আটটা হইতে নয়টা নীল জামা গায়ে দিয়া দাঁড়াইয়া থাকিব, দয়া করিয়া যোগাযোগ করিবেন।
বিনীত
জীবনলাল দাস।
ঠিকানা–নাই।
জীবনযাপন
শনিবারের সকালে ঘুম থেকে উঠতে একটু দেরি হয়ে যায়। কিংবা সঠিকভাবে বলা উচিত শনিবারের সকালে স্বেচ্ছায় দেরি করে ওঠেন জগদানন্দবাবু। জগদানন্দ রাহাচৌধুরী।
জগদানন্দবাবু কথাটার আমাদের অনেকের কাছেই কোনও মানে নেই, কিন্তু যদি সরাসরি বলি মিস্টার জে এন আর চৌধুরী সবাই চিনতে পারবেন।
খবরের কাগজে তাঁর নাম ভদ্রবাড়ির বাইরের ঘরে পর্দা বা পাপোশের মতো থাকবেই। তাঁর নামে প্রশ্ন উঠবে বিধানসভায় লোকসভায় এমনকী রাজ্যসভায়। দূরদর্শনে, বেতারে তার নিয়মিত উপস্থিতি প্রায় অনিবার্য।
কিন্তু মাননীয় রাহাচৌধুরী মশায় রাজনীতির নোক নন, রাজনীতির কিছুটা সাইড বিজিনেস তার এক সময়ে ছিল, যথেষ্ট নিরাপদ নয় বলে এখন সেটাও করেন না। কিন্তু সবরকম ঘরানার লোক এখন। তাঁকে খাতির করে কারণ তিনি একজন সফল ও কৃতবিদ্য কর্মযোগী, একালের ভাষায় শিল্পপতি।
শনিবার পরপর দুদিন হেডঅফিস বন্ধ থাকে। তার কোম্পানির কলকারখানা সমূহের দিকে খুব একটা ঘেঁষেন না রাহাচৌধুরী সাহেব। দিতে হবে, দিতে হবে, জবাব চাই, জবাব চাই, সেসব ভারি ঝামেলা। তিনি যথাসাধ্য হেড অফিসের নিরাপত্তার মধ্যেই নিজেকে নিবদ্ধ রাখেন, সেটাই নিরাপদ। ঝুটঝামেলা ম্যানেজারেরা সামলায়।
শনি-রবির ছুটির সুযোগে শুক্রবারের সন্ধ্যায় রাহাচৌধুরী সাহেবের আমোদ প্রমোদ একটু বেশি হয়ে থাকে, ফলে শনিবারের সকালে দেরি করে শয্যাত্যাগ করাটা সেই অর্থে খুব অস্বাভাবিক বলা যাবে না।
জগদানন্দ রাহাচৌধুরী নামটি বাংলায় খুবই জবরদস্ত। কিন্তু ইংরেজিতে জে রাহাচৌধুরী কেমন ম্যাটমেটে শোনায় সেইজন্যে জগদানন্দবাবু জগদা এবং নন্দ আলাদা করে ধরে জগদা থেকে জে, নন্দ থেকে এন, রাহা থেকে আর নিয়ে এবং চৌধুরী অটুট রেখে জে এন আর চৌধুরী হয়েছেন।
এতে নামটাই যে শুধু খোলতাই হয়েছে তা নয় আরও একটা সুবিধে হয়েছে পুরনো চেনাজানা লোকেরা সহজে ধরতে পারে না মহামহিম জে এন আর চৌধুরী, পশ্চিমবঙ্গের শিল্পোন্নয়নে নবযুগের। ভগীরথ, তাদেরই জগা বা জগদানন্দ।
জে এন আর অতি সামান্য অবস্থা থেকে উন্নতির চরম শিখরে উঠেছেন। আরোহণের বাঁকাচোরা চড়াই উত্রাইয়ের পথে তিনি তার অতীত জীবনের অনেক কিছু ফেলে এসেছেন এবং কার্যকারণ বশত কিছু কিছু গর্হিত দোষ অর্জন করেছেন।
