এই নিয়ে সারা দেশে খুবই চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হল। বিধানসভা থেকে একদিন এবং লোকসভা থেকে পরপর দুদিন বিরোধী সদস্যেরা একজোটে বেরিয়ে গেলেন। বহুলক্ষ টাকা বৈদেশিক মুদ্রা ব্যয়ে যে দুর্লভ যন্ত্রটি আনা হয়েছিল সেটি এইভাবে অন্তর্হিত হওয়ায় এটাকে অনেকে অন্তর্ঘাতী কার্যকলাপের অন্তর্গত বলে মনে করতে লাগলেন। একটি সংবাদপত্র ধারাবাহিক সম্পাদকীয় নিবন্ধ লিখলেন এই ঘটনার উপরে, ঝড়ের পূর্বাভাস নামে সেই নিবন্ধ পড়ে এ দেশের আবালবৃদ্ধবনিতা অশ্রুসম্বরণ করতে পারেননি। শুধু আবহাওয়া দপ্তরের ভার ঠিক কোন মন্ত্রীর, সেটা ধরতে না পেরে সংবাদপত্রটি সেই মন্ত্রীর পদত্যাগ দাবি করতে পারলেন না। তাই খুব গোলমাল হল। জোর পুলিশি তদন্ত চলতে লাগল।
০৩.
আজ কিছুদিন হল জয়গোপালের মনের মধ্যে একটা ধারণা ঢুকেছে যে তাকে পুলিশ খুঁজছে।
ধারণাটা তার মনের মধ্যে যাকে বলে বেশ বদ্ধমূল হয়ে বসেছে। কেন যে পুলিশ তাকে খুঁজছে, এ বিষয়ে জয়গোপালের নিশ্চিত কোনও ধারণা নেই। তবে জয়গোপাল একটু লোভী স্বভাবের যুবক। প্রায় বছর খানেক আগে জয়গোপাল রাস্তায় কুড়িয়ে পাওয়া একটা দশটাকার নোট চালানোর। চেষ্টা করেছিল। পর পর কয়েকজন দোকানদার নোটটা জালি বলে ফিরিয়ে দেয়। তাদেরই কেউ সন্দেহ করে পুলিশে কোনও খবর দিয়ে রাখতে পারে, অথবা সেবার যখন কলেজ স্ট্রিটে গোলমাল হয় সে একটা স্টেট বাসের গদি তুলে নিয়ে বাড়ি চলে আসে।
এগুলো যে পুলিশ পিছনে লাগবার মতো কারণ নয় সেটা জয়গোপাল বোঝে। কিন্তু তার মন থেকে সন্দেহ দূর হওয়ার নয়।
শেষে ভয়ে ভয়ে একদিন জয়গোপাল ঘরের দরজা বন্ধ করে, হাতের কাছে কেরোসিন তেল না থাকায় নারকেল তেল ঢেলে ওই দশ টাকার নোটটায় আর বাসের গদিটায় আগুন লাগিয়ে দিল। দশ টাকার নোটটা অচিরেই ভস্মীভূত হয়ে গেল, কিন্তু বড় কষ্ট দিল ওই বাসের গদিটা। এটা কিছুতেই জ্বলতে চায় না, আবার পরমুহূর্তেই ছাদের সিলিং পর্যন্ত দাউ দাউ করে আগুন লাফিয়ে ওঠে। আর পোড়া গদির সে কী দুর্গন্ধ, মড়া পোড়ার গন্ধের চেয়েও বিকট। এবং শব্দ–কেন যে এত শব্দ, এইটুকু গদির মধ্য থেকে কী করে এত শব্দ ধূপধাপ, ধুম-ধাম, ফট-ফটাস! জয়গোপাল কানে আঙুল দিয়েও রক্ষা পায় না, আবার ঘর থেকে বেরোতেও সাহস পায় না, পাছে ঘরের অন্য জিনিসেও আগুন লেগে যায়। সে যে কী কঠিন সমস্যা, এই রকম অবস্থায় যিনি কখনও পড়েছেন। তিনিই শুধু হয়তো বুঝতে পারবেন।
একটা পুরানো তিনপায়া টেবিল, লোহার আলমারির মাথায় বসানো শীতকালে ব্যবহারের জন্য লেপ, ঘরের কোনায় গাদা করা পুরানো খবরের কাগজ এবং ডান হাতের কনুই থেকে যোবলা। স্কোয়ার ইঞ্চি জায়গা কিছুতেই আগুনে পোড়ার থেকে রক্ষা করতে পারল না জয়গোপাল।
দগ্ধ কনুই, জয়গোপাল তবুও দুশ্চিন্তার হাত থেকে অব্যাহতি পেল না। কারণ সেই বাসের সিটের দগ্ধাবশেষ।
কোথায় ফেলবে? সিটের ফ্রেমের লোহার শিকগুলো আগুনের তাপে গলে বাঁকা হয়ে গিয়েছে, কিন্তু তবুও দেখলে কি একেবারেই অনুমান করা যায় না যে এগুলো দিয়েই একটা বাসের সিট তৈরি হয়েছিল, যে বাসের সিটটি কিনা ছিল লুটের মাল।
কেন যে মরতে জয়গোপাল ওই সিটটা তুলে আনতে গিয়েছিল, আজ তাই ভাবে। ওই সিটটা তার কোনও কাজে লাগেনি। একদিনের জন্যও আরাম করে বসার মতো মনোবল সংগ্রহ করতে পারেনি। তার জীবনে কালগ্রহের মতো দেখা দিয়েছে ওই বাসের গদি।
এই তো গতকাল বিকেলে দুটো মোটামতো লোক মোড়ের পাশের দোকানের সামনে দাঁড়িয়ে কেমন বাঁকা বাঁকা চোখে তাকে পর্যবেক্ষণ করছিল। নিশ্চয় পুলিশের লোক। এই রকম ঘটনা জয়গোপাল প্রতিদিনই লক্ষ করছে। সবই ওই সিটটার জন্যে–দশটাকার নোটটার জন্যেও হতে পারে। কিন্তু জাল নোটটা নিয়ে আর ভয় নেই, তার সমস্ত চিহ্ন ভস্ম হয়ে লুপ্ত হয়ে গিয়েছে।
এইবার বাসের সিটের পোড়া কঙ্কালটুকু কোথাও ফেলে দিতে পারলেই নিশ্চিন্ত চিত্তে জয়গোপাল আবার রাত্রে শান্তিতে ঘুমোত পারে।
বাজার থেকে চট কিনে আনল। সঙ্গে সুঁচ আর সুতো। সুঁচ-সুতো দিয়ে ভাল করে মুড়িয়ে রাতের অন্ধকারে এটাকে নিয়ে কোথাও ফেলে আসতে হবে।
কিন্তু কীসে করে নিয়ে যাবে এই বস্তুটা। জয়গোপালের নিজের কোনও যানবাহন নেই। রিকশাই। হোক আর ট্যাক্সিই হোক, তার চালক তো নিশ্চয় সন্দেহ করবে।
অনেক বুদ্ধি খাটিয়ে জয়গোপাল স্থির করল, বাড়ি থেকে সন্ধ্যার দিকে একটা রিকশায় করে জিনিসটা নিয়ে বেরোবে, তার পরে মোড়ে গিয়ে রিকশা ছেড়ে ট্যাক্সিতে উঠবে। তারপরে ট্যাক্সি থেকে আবার রিকশা আবার ট্যাক্সি এই ভাবে চলে অবশেষে যখন নিরাপদ বোধ করবে, মালসুদ্ধ রাস্তায় নেমে, মালটা যেন ভুল করে ফেলে যাচ্ছে এই রকম ভাবে যে কোনও বাসে উঠে চলে আসবে।
যত দুশ্চিন্তা করেছিল, তা দেখা গেল নিরর্থক। অতি অনায়াসেই জিনিসটাকে ফুটপাথে ফেলে চলে আসতে পারল জয়গোপাল।
শুধু পরের দিন প্রতিটি সংবাদপত্রে একটা খবর দেখে সে আবার হতাশ হল এবং আরও দুশ্চিন্তায় পড়ল। সংবাদটি এই–আবহাওয়া অফিসের ঝড়-নিরূপক যে যন্ত্রটি কিছুকাল আগে চুরি গিয়েছিল, তাহা গতকল্য দগ্ধ অবস্থায় চটে মোড়ানো প্যাকেটে পাওয়া গিয়াছে। বোধহয় দুষ্কৃতকারীরা উহা কাজে লাগাইতে না পারিয়া ফেলিয়া গিয়াছে। পুলিশ দুষ্কৃতকারীদের অনুসন্ধান করিতেছে।
