খবরটা আরও বড় ছিল। জয়গোপাল খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে পড়ল। সে যেখানে ফেলে এসেছিল ঠিক সেই বাসস্টপের পাশের ফুটপাথেই পাওয়া গিয়েছে। এটা যে সেই দগ্ধ বাসের গদি এ বিষয়ে তার বিন্দুমাত্র সন্দেহ নেই, শুধু দুশ্চিন্তা আরও বাড়ল এই ভেবে যে এবার তাকে ঝড় নিরূপক-যন্ত্রের চোর হিসেবে হয়তো জেল খাটতে হবে।
জারিনা বিবি
পাঠিকা ঠাকুরানি নিজগুণে ক্ষমা করবেন। আপনি ঠিকই ধরেছেন, মাতালের গল্প ছাড়া আমার গতি নেই।
মাতাল যেমন বারবার তার ঠেকে ফিরে যায়, তেমনি আমি ঠেকে গেলেই মাতালের গল্পে ফিরে আসি।
এক মদ্যপ মধ্যরাতে রাস্তায় হোঁচট খেয়ে পড়ে গিয়েছিল, তার কপাল কেটে যায়। বাড়িতে এসে আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে কপালের কাটা জায়গায় স্টিকিং প্লাস্টার লাগিয়ে সে শুতে যায়। পরদিন সকালে ঘুম থেকে উঠে দেখে তার কপালে কোথাও স্টিকিং প্লাস্টার লাগানো নেই, বিছানাতেও পড়ে নেই। পরে দাড়ি কামাতে গিয়ে সে দেখে ছোট স্টিকিং প্লাস্টার আয়নার সঙ্গে লেগে আছে। তার মানে তার কপালের কাটা জায়গায় প্লাস্টারটা না লাগিয়ে সে সেটা আয়নায় তার ছায়ার কপালে লাগিয়ে দিয়েছিল।
জগৎ সংসারে মাতালের মতো রহস্যময় জীব আর নেই। সে একাধারে সরল ও জটিল, বশংবদ ও মারকুটে, কৃপণ ও উদার, সনাতন ও আধুনিক। প্রকৃত মদ্যপের কথাকার হতে পারেন চেকভ কিংবা শরৎচন্দ্র।
আমার দৌড় ওই আয়না পর্যন্ত। ছায়ার কপালে স্টিকিং প্লাস্টার লাগানো। রক্ত মাংসের মানুষটাকে আমি মোটেই কায়দা করতে পারি না, আয়নার মধ্যের ছায়াই আমার ভরসা।
জীবনবাবুর পায়রা
সকালবেলা ঘুম থেকে উঠে হিটারটা জ্বালিয়ে দুকাপ চা করতে বসলাম। চা হয়ে গেল, দাদা পাশের ঘর থেকে প্রতিদিন এর আগেই বেরিয়ে আসে, কোনও কোনও দিন একটু দেরি হয় অবশ্য, তবে এই সময়টা আমি দাদার ঘরে যাই না। দাদা মাথাটা নীচের দিকে পা দুটো উপরদিকে দিয়ে আসন করে, কোনও কারণে গেলে ওই উলটো মাথা রেখেই কথা বলে। এইরকম ভাবে কোনও কথাবার্তা সম্ভব নয় বলেই আমার ধারণা, ব্যাপারটা আমার মোটেই সুবিধার মনে হয় না। তাই পারতপক্ষে এই সকালের দিকে আসনের সময়টায় আমি দাদা না উঠে আসা পর্যন্ত অপেক্ষা করি।
কিন্তু দাদা আজ কিছুতেই আসছে না। বড় বেশি দেরি করছে, চা ঠান্ডা হয়ে গেল। বাধ্য হয়ে সেই অপ্রীতিকর অবস্থার মুখোমুখি, ঠিক মুখোমুখি নয় মুখোপায়ে–আমার মুখ আর দাদার পা সামনাসামনি দাদার ঘরে ঢুকলাম। এ কী, ঘর ফাঁকা! আলনায় জামাকাপড় নেই। দাদাও নেই।
এরকম আগেও কয়েকবার হয়েছে। পূর্ব অভিজ্ঞতা থেকে বালিশের নীচে হাত দিলাম, হ্যাঁ একটা চিঠি রয়েছে।
খোকন,
বাড়ির ভাড়াটিয়াদের সহিত জল, আলো এবং দোতলার দুমদাম শব্দ লইয়া তুমি যে গোলমাল করিতেছ আমি তাহা বাড়াইতে চাহি না। জীবনবাবুর অত্যাচারে গৃহত্যাগ করিলাম। ইতিপূর্বে আমি জীবনবাবুকে নিষেধ করিয়াছিলাম, তিনি যেন কখনও বাদামি রঙের পায়রা না কেনেন। কাল বিকালে দেখিলাম জীবনবাবু একটি নহে একজোড়া বাদামি রঙের পায়রা খরিদ করিয়া আনিয়াছেন।
তোমার হয়তো মনে আছে, ক্লাস সেভেনে পড়িবার সময় বলরামদের একটি বাদামি রঙের পায়রা আমার ডান গালের আঁচিলটা ঠুকরাইয়া দিয়াছিল, এখনও পূর্ণিমা অমাবস্যায় আঁচিলটি টনটন করে। জীবনবাবুর অন্যান্য পায়রাগুলিকে তবু সহিয়াছিলাম, কিন্তু একই বাড়িতে দুইটি ঐরূপ কুৎসিত রঙের পায়রার সঙ্গে বসবাস আমার পক্ষে সম্ভব নহে বুঝিতেই পারিতেছ।
আমি চলিলাম। খুঁজিবার চেষ্টা করিও না, অন্যান্যবারের মতোই জব্দ হইবে। ভালভাবে থাকিও। আমার লাল মাফলারটি শালকরের নিকট রহিয়াছে, শীতকালে ব্যবহার করিও।
ইতি
১৭ই বৈশাখ, বুধবার
আঃ দাদা
এ রকম বছরে এক-আধবার ঘটেই। খুব ঘাবড়াবার কিছু নেই, প্রায় অভ্যাস হয়ে গেছে। কোনও কোনও কারণে দাদা বাড়ি ছেড়ে চলে যায়। তারপরে একদিন একা একাই ফিরে আসে। ফুটপাথে থাকা যায় না, দিনের বেলায় জুতো পালিশ করে সেখানে, রাত্তিরে ঘুমোলে মনে হয় সারা শরীরটা কে যেন ব্রাউন রঙের জুতোর কালি দিয়ে পালিশ করছে। ভীষণ অসুবিধে, ফুটপাথে কি থাকা যায়, ভিখিরিরা ঘুম থেকে ধাক্কা দিয়ে তুলে ভিক্ষা চায়। ফিরে এসে এই সব উলটোপালটা কথা বলে–যেন আমরাই তাকে ফুটপাথে বসবাস করতে পাঠিয়েছিলাম।
তবু একটা চিন্তা হয়,–কোথায় গেল, কী করবে? চায়ের কথা ভুলেই গিয়েছিলাম। এতক্ষণে নিশ্চয় জুড়িয়ে বরফ হয়ে গেছে। তাড়াতাড়ি নিজের ঘরে ফিরে আসি। এসে যা চোখে পড়ল–গা জ্বলে যায়। সেই বাদামি রঙের পায়রা দুটো চায়ের পেয়ালা থেকে চুচুক করে চা খাচ্ছে। মাথা গরম হয়ে গেল। দেয়াল থেকে ব্যাডমিন্টনের র্যাকেটটা তুলে ছুঁড়ে মারলাম। দিদিমার দেওয়া জাপানি পাম গাছের নীচে নদীতে নৌকো, পাখি এইসব আঁকা আমাদের বড় শখের কাঁচের পেয়ালা দুটো চুরমার হয়ে গেল। এতদিন যত্ন করে রাখা শিয়ালকোটের র্যাকেটটা দুখানা হয়ে গেল। রাঙাকাকা এনে দিয়েছিল, এখন আর এসব র্যাকেট পাওয়া যায় না। কিন্তু পায়রা দুটোর কিছুই হয়নি। তারা নিশ্চিন্তে উড়ে গিয়ে পাশের বাড়ির কার্নিশে বসে বকম বকম করতে লাগল।
ভয়ংকর রাগ হল জীবনবাবুর ওপর। এই কালীঘাটের পুরনো বাড়িটা আমরা কেনার অনেক আগে থেকে এই বাড়ির একতলার ভাড়াটে জীবনবাবু। আমরা খালি বাড়িই চেয়েছিলাম, কিন্তু জীবনবাবু উঠলেন না। এক কথায় আমরা ভাড়াটে সুদ্ধ বাড়ি কিনলাম। এই কথাটা দাদা মাঝেমধ্যেই জীবনবাবুকে বলত, দেখুন, আপনাকে সুদ্ধ আমরা এই বাড়ি কিনেছি। আপনি আমাদের কেনা, আমাদের কথামতো চলবেন। জীবনবাবু লোক খারাপ নন, কিন্তু ভীষণ খুঁতখুঁতে। কলে জল কম আসছে, ইলেকট্রিকের তার পুরানো হয়ে গেছে, ছাদে দুমদাম শব্দ হচ্ছে এইসব নানা আপত্তি। আর তার ওপরে এই পায়রা পোষা। এই বাদামি দুটো নিয়ে বোধ হয় সতেরো আঠারোটা পায়রা হল তার। কিন্তু এই নিয়ে কিছু বলবার জো নেই। দাদা একবার শায়েস্তা করার জন্যে একটা বিড়াল ধরে এনেছিল, কিন্তু একটা গোদা পায়রা বিড়ালটাকে এমন ঠুকরে দিল যে সেইদিন রাত্রে বিড়ালটা আমাদের কামড়ে-খামচে একাকার, রক্তারক্তি কাণ্ড।
