জয়াবতী প্রথম যখন কলেজে ভরতি হয়, তখন প্রথম দু-তিন মাস তার মনেই থাকত না কোথায় ক্লাস, এমনকী বিষয় আর্টস না সায়েন্স, সেটা খেয়াল রাখতেও তাকে বিশেষ কষ্ট করতে হত।
পুরানো দু টাকার নোট বা নতুন দশ টাকার যে নোট হয়েছে সেটাকে এক টাকার নোট হিসেবে ভুল করে হয়তো অনেকেই খরচ করে ফেলে কিন্তু জয়াবতীই বোধহয় একমাত্র যে সিকি ভেবে বহু আধুলি দিয়েছে।
চটি, ব্যাগ, ছাতা, চশমা এই সব অস্থাবর জিনিস জয়াবতী এই সামান্য বয়সে কত যে হারিয়েছে তার কোনও ইয়ত্তা নেই।
জয়াবতী প্রতিদিন স্নান করে ভেজা চুল এলোখোঁপা করে কাটা দিয়ে গেঁথে আবহাওয়া অফিসে এসে সেখানে চুল শুকোয়। যদিও অফিস, তবুও চুল মেলে দিয়ে শুকিয়ে নিতে জয়াবতীর কোনও অসুবিধা হয় না।
অফিস ঘরের মধ্যে জায়গার খুব অভাব। জয়াবতী কাজে নতুন এসেছে, তাই অফিস ঘরে চেয়ার টেবিল তার জোটেনি। তাতে তার ভালই হয়েছে। বারান্দার একদিকে একটা ছোট ঘরে আবহাওয়া সংক্রান্ত যন্ত্রপাতি রাখা হয়েছে। সেই ঘরেই একটা ছোট টেবিল আর চেয়ার ফেলে সাময়িক স্থান হয়েছে জয়াবতীর।
অফিসে এসেই চুল খুলে ফেলে জয়াবতী। তারপর জানলার পাশে চেয়ারটা টেনে নিয়ে জানলার বাইরের আধা-রোদে চুল শুকিয়ে নেয়। কিন্তু চুল শুকানোর পর আবার যখন খোঁপা বাঁধতে যায়, কিছুতেই আর চুলের কাটাগুলো খুঁজে পায় না সে।
যাতে চুলের কাটাগুলো হারিয়ে যেতে না পারে তার জন্যে চেষ্টার ত্রুটি নেই জয়াবতীর। প্রত্যেক দিনই চুল খোলার পরে খুব যত্ন করে গুছিয়ে রাখে কাটাগুলো এমন জায়গায়, যাতে কিছুতেই হারিয়ে যেতে না পারে। কিন্তু কোথায় যে এত যত্ন করে রাখে, চুল শুকানোর পরে অধিকাংশ দিন আর মনেই থাকে না।
জয়াবতীর একেবারে কিশোরী বয়স থেকে অভ্যাস কাটা গেঁথে খোঁপা শক্ত করে রাখা, ঢিলে বা এলোমেলো খোঁপা হলে তার ভীষণরকম অস্বস্তি হয়। সুতরাং যেসব দিন জয়াবতী তার চুলের কাটা কয়টা খুঁজে বের করতে পারে না, তার খুবই অসুবিধা হয়।
এর মধ্যে একদিন চুলের কাটা খুঁজতে গিয়েই জয়াবতী একটা জিনিস আবিষ্কার করে ফেলল।
আগেই বলেছি যে জয়াবতী যে ঘরটায় বসত সেই ঘরের মধ্যে কিছু যন্ত্রপাতি রাখা ছিল। এর অধিকাংশই নতুন এবং বহুমূল্য যন্ত্র, কিন্তু ব্যবহার কী করে করতে হয় সেটা কারওর জানা না থাকায় এই ঘরে ফেলে রাখা আছে।
এরই মধ্যে একটি যন্ত্র সদ্য চেকোশ্লোভাকিয়া থেকে এসেছে। এটি হল ঝড়-নিরূপক যন্ত্র। কোথায় কখন কী ভাবে ঝড় আসছে অথবা আসবে সবই এই যন্ত্রটায় জানা যাবে।
যন্ত্রটা দেশে এসে গেছে কিন্তু যন্ত্রটা চালানো শেখবার জন্যে যে বৈজ্ঞানিকটিকে চেকোশ্লোভাকিয়ায় পাঠানো হয়েছিল তিনি কাজ শিখে দেশে ফেরার পথে লন্ডনে হঠাৎ ভাগ্যক্রমে একটা মদের দোকানে বয়ের কাজ পেয়ে যাওয়ায় আর ফিরলেন না। সরকার এই ঘটনার পর আর কোনও দ্বিতীয় বৈজ্ঞানিককে পাঠানোর সাহস পাননি, বরং আয়োজন করা হয়েছে যে চেকোশ্লোভাকিয়া থেকে একজন যন্ত্রবিদ এসে এখানেই কয়েকজনকে ওই যন্ত্র পরিচালনা শিখিয়ে যাবেন।
চেকোশ্লাভাকিয়ার সেই যন্ত্রবিদ এখনও এসে পৌঁছাননি, তাই যন্ত্রটা জয়াবতীর ঘরে পড়ে রয়েছে।
চুলের কাঁটা খুঁজতে খুঁজতে একদিন জয়াবতী ওই ঝড় নিরূপক-যন্ত্রের মধ্যে হাত গলিয়ে দিল। যন্ত্রটার মাঝামাঝি জায়গায় একটা সবুজ এবং একটা নীল রঙের ছোট বালবের মধ্যে একটা ড্রয়ারের মতো ছিল, জয়াবতী একদিন ওখানে কাটা রেখেছিল। তাই আজও কাটা খুঁজতে গিয়ে ভাবল ওইখানে থাকতে পারে কিন্তু হাত দিয়ে পেল না। আরেকটু আরেকটু করে হাত গলিয়ে দিতে শেষে হাতে যেন চুলের কাটাগুলো ঠেকল। এতটা ভিতরে চলে গেছে ভাবেনি জয়াবতী, সে হাত দিয়ে টেনে বার করে আনতেই দেখল চার-পাঁচটা কাটা স্টেনলেস স্টিল বা ওই জাতীয় কোনও ধাতু দিয়ে তৈরি। চুলের কাটা নয়, ওই যন্ত্রেরই কোনও অংশ হবে, কিন্তু চুলের কাটার কাজ অনায়াসেই। চালানো যায়।
বলা বাহুল্য এই আকস্মিক আবিষ্কারে জয়াবতীর অশেষ উপকার হল। কয়েকদিনের মধ্যেই সে বাড়ি থেকে চুলে কাটা গেঁথে আনা ছেড়ে দিল, কেননা সে দেখল এই যন্ত্রের মধ্যে যেখানেই হাত গলাচ্ছে, ছোট বড় নানা আকারের সুদৃশ্য কাটা বেরিয়ে আসছে। সে ক্রমশ এখান থেকে কাটা নিয়ে আত্মীয়, বান্ধবী এবং প্রতিবেশিনীদের মধ্যে, চুলের আয়তন দৈর্ঘ্য এবং বিস্তার অনুসারে ছোট বড় মাঝারি কাটা বিলিয়ে রীতিমতো জনপ্রিয় হয়ে উঠল।
সপ্তাহ তিনেকের মধ্যে সেই নীল আর সবুজ রঙের বালব দুটি ছাড়া সেই ঝড়-নিরূপক যন্ত্রটির আর কিছুই অবশিষ্ট রইল না।
এখানে বলে রাখা ভাল যে, জয়াবতী কখনওই জানত না বা কখনও ভাবেওনি যে তার ওই। কণ্টকপ্রসূ যন্ত্রটি আসলে কী? আর যেকোনও মেয়ের মতোই এতটা ভাবার মতো ক্ষমতা তার ছিল না।
ইতিমধ্যে অফিস ঘরের মধ্যে একটা চেয়ার খালি হয়ে যাওয়ায় জয়াবতী সেখানে চলে গেল। এবং এই যন্ত্রের ঘরে তালা পড়ল।
তারপর একদিন চেকোশ্লোভাকিয়া থেকে যন্ত্রবিদ এসে পৌঁছলেন। সেই বিদেশি তার শিক্ষার্থীদের নিয়ে প্রথমে সেই ঘর এবং তারপর সারা আবহাওয়া অফিস তন্ন তন্ন করে অনুসন্ধান। করলেন, কিন্তু তখন কোথায় সেই ঝড়-নিরূপক যন্ত্র?
