মহিমাময় জয়দেকে অনন্তকাল ধরে জানেন, তিনি জানেন, এখন জয়দেবের সঙ্গে তর্কে প্রবেশ করা বোকামি। তাই সঙ্গে সঙ্গে কথার মোড় ঘুরিয়ে বললেন, না না, আনারসের চাটনি তাহলে করবি। এতে আপত্তির কিছু নেই। ভালই হবে।
জবাব শুনে জয়দেব বেরিয়ে গেলেন, ঠকাইয়ের রিকশায় উঠে হাত তুলে গুডনাইট বলে চলে গেলেন। ধীরে ধীরে রিকশার টুং টাং শব্দ গলির মোড়ে মিলিয়ে গেল।
আধ ঘণ্টাখানেক বাদে সবে খাওয়া-দাওয়া সেরে মহিমাময় শুতে যাবেন এমন সময় গলির মোড় থেকে একটা রিকশার টুং টাং শব্দ এগিয়ে এসে মহিমাময়ের সদর দরজার সামনে থামল। কড়া নাড়তে দরজা খুলে মহিমাময় দেখলেন জয়দেব।
মহিমাময়কে দেখে জয়দেব বললেন, প্রায় বাড়ি পর্যন্ত গিয়ে ফিরে এলাম। ঠিক করে বল তো আনারসের চাটনি করব কি করব না!
মহিমাময় বললেন, সে তো আগেই বলে দিলাম। অসুবিধা যদি না হয় আনারসের চাটনি হলে তো ভালই।
জয়দেব আহত হলেন, সুবিধা অসুবিধার কথা আসছে কোথায়? ঠিক করে বল আনারসের চাটনি করব কি করব না।
কথা না বাড়িয়ে মহিমাময় বললেন, আনারসের চাটনি করবি।
জয়দেব আবার সেই ঠকাইয়ের রিকশায় উঠে চলে গেলেন। এবার দরজা বন্ধ করে মহিমাময় শুতে গেলেন। একতলাতেই পাশের ঘরে শোবার ঘর। রাস্তার ধারে মাথার কাছে জানলা। রাতে সে জানলাটা বন্ধ করে শোন মহিমাময়।
তখন আবছাতন্দ্রা মতো ঘুম এসেছে মহিমাময়ের। পাশে স্ত্রী গভীর নিদ্রায় নিমগ্ন, হঠাৎ রিকশার টুং টুং এবং জানলায় ঠুকঠুক শুনে মহিমাময় জানলাটা একটু ফাঁক করলেন, আবার জয়দেব এসেছেন জানলার নীচে ফুটপাথে দাঁড়িয়ে রয়েছেন, বোধহয় কাছেপিঠে কোথাও একটা চোলাইয়ের আড্ডা পেয়েছেন, সেখান থেকেই ঘুরেফিরে আসছেন।
জানলার ওপাশে অন্ধকারে মহিমাময়ের আবছা মুখটা দেখে জয়দেব জানতে চাইলেন, তাহলে শেষ পর্যন্ত কথাটা কী ঠিক হল? অনারসের চাটনি হবে কি হবে না?
ঘুম-চোখে মহিমাময় বললেন, আর জ্বালাস নে জয়দেব। আনারসের চাটনি হবে, হবে, হবে। আবার রিকশায় উঠে জয়দেব বিদায় নিলেন। কিন্তু পুরোপুরি বিদায় নয়। তিরিশ-চল্লিশ মিনিট পরপর ওই ঠকাইয়ের রিকশায় চড়ে ঘুরে ঘুরে আসতে লাগলেন, সঙ্গে ওই একই জিজ্ঞাসা, আনারসের চাটনি হবে কি হবে না?
রাত দুটো-আড়াইটা নাগাদ ব্যাপারটার একটা প্যাটার্ন দাঁড়িয়ে গেল। মহিমাময় আর জানলা বন্ধ করছেন না, জয়দেবও আর রিকশা থেকে নামছেন না। জানলার কাছে এসে ঠকাই ঘণ্টা টুং টুং করছে, রিকশা না নামিয়ে উঁচু করে ধরে রেখেছে সে, সেখানে হেলান দিয়ে বসে আছেন জয়দেব। টুং টুং শব্দ শুনে দুপাশ থেকে দুই বন্ধুতে প্রশ্নোত্তর হচ্ছে। ক্রমশ প্রশ্ন এবং উত্তর দুটোই সংক্ষিপ্ত হয়ে এসেছে। জয়দেব প্রশ্ন করছেন, আনারস…? মহিমাময় উত্তর দিচ্ছেন, হবে।
সকাল সাড়ে চারটে নাগাদ সামান্য পটপরিবর্তন হল। রিকশায় টুং টুং শব্দ শুনে যথারীতি বিছানায় উঠে বসে মহিমাময় অবাক হয়ে দেখলেন, রিকশার সিটে ঠকাই বসে রয়েছে আর রিকশাটা চালাচ্ছেন জয়দেব। এখন অবশ্য চালাচ্ছেন না, পঁড়িয়ে রয়েছেন, তবে হাতের ঘন্টিটা খুব টুং টুং করে যাচ্ছেন।
মহিমাময়কে বিছানার ওপরে উঠে বসতে দেখে ঠকাই দাঁত বার করে হাসল, তারপর দেহাতি হিন্দিতে জিজ্ঞাসা করল, আনারসকা চাটনি হোগা কি নেহি হোগা?
হতভম্ব মহিমাময় কী জবাব দেবেন বুঝতে পারছিলেন না। এর মধ্যে একটা অন্য রকম কাণ্ড ঘটল। ক্লান্তির জন্যেই হোক অথবা অনভ্যাসের জন্যেই হোক রিকশার হাতলটা হঠাৎ ছেড়ে দিলেন। জয়দেব। রিকশাটা উলটে দূরে ছিটকে গিয়ে পড়ল ঠকাই। তার বিশেষ কিছু হয়নি। সে তাড়াতাড়ি ধুলো ঝেড়ে নিয়ে রিকশাটা সোজা করে নিয়ে জয়দেবকে ফেলেই দৌড়ে রওনা হল। জয়দেব পিছু পিছু চেঁচাতে লাগলেন, এই ঠকাই। দাঁড়া, দাঁড়া, তোর ভাড়া নিয়ে যা।
ঠকাই আর দাঁড়ায়। সে তখন রীতিমতো ছুট লাগিয়েছে। তার পেছনে ছুট লাগাতে লাগাতে জয়দেব একটু ঘুরে দাঁড়িয়ে জানলার ওপ্রান্তে বিছানার উপর বসে থাকা বিস্ময়বিমূঢ় মহিমাময়কে বললেন, এখনও শেষবারের মতো অন্তত বলে দে মহিমা, আনারসের চাটনি হবে কি হবে না? তারপর উত্তরের অপেক্ষা না করে ঠকাইয়ের রিকশার পেছনে প্রাণপণ দৌড় দিলেন জয়দেব।
মহিমাময় বিছানায় বসে বসে ভাবতে লাগলেন, তাহলে আনারসের চাটনি হবে কি হবে না?
জয়াবতী ও জয়গোপালের কাহিনি
০১.
এই সামান্য কাহিনির নায়ক-নায়িকা শ্রীযুক্ত জয়গোপাল দাশগুপ্ত এবং শ্রীমতী জয়াবতী বসু পরস্পর নিতান্তই অপরিচিত। এই কাহিনির বাইরে বা ভিতরে তাদের দুজনের মধ্যে কোনও সংশ্রব, আলাপ-পরিচয় পর্যন্ত নেই।
শ্রীমতী জয়াবতী বসু আবহাওয়া অফিসের করণিক, বয়স চব্বিশ, চেহারা তেমন নয় বটে তবে জয়াবতী সুকেশী।
শ্ৰীযুক্ত জয়গোপাল দাশগুপ্ত মধ্য কলকাতার একটা বয়স্ক শিক্ষণ নৈশ বিদ্যালয়ে প্রকৃতি বিজ্ঞানের শিক্ষক, বয়স পঁচিশ, চেহারা প্রয়োজন নেই (এই কাহিনিতে)।
০২.
জয়াবতী সব বিষয়েই যেকোনও সাধারণ বাঙালি যুবতীর মতো। কিন্তু তার একটি প্রধান ত্রুটি হল যে বড়ই ভুলো মন তার। কোনও সফল বা ব্যর্থ প্রেমই এই জন্যে দায়ি কিনা তা বলা কঠিন এবং এই কাহিনিতে তা আমাদের না জানলেও চলবে।
