মহিমাময় জয়দেবকে বললেন, পঞ্চাশটা টাকা যে দেব, তোর রিকশাওয়ালাকে বিশ্বাস কী?
মহিমাময়ের অবিশ্বাসী প্রশ্নে জয়দেবের আঁতে ঘা লাগল। জয়দেব চেঁচিয়ে উঠলেন, দ্যাখ মহিমা, তুই বড় নীচ। রিকশা চালায় বলে, গরিব বলে চুরি করবে? মদের টাকা মেরে দেবে?
মহিমাময় গম্ভীর হলেন। বললেন, এই রিকশার লোকটাকে চিনিস? নাম জানিস?
সঙ্গে সঙ্গে জয়দেব উঠে ঘর থেকে বেরিয়ে গেলেন, রিকশাওয়ালার প্রসঙ্গ তাঁর বোধহয় সহ্য হল না। মহিমাময়ও স্বস্তির নিশ্বাস ফেললেন, যাক খুব সহজে আপদ গেছে।
কিন্তু আপদ এত সহজে যাওয়ার নয়, দু মিনিটের মধ্যে জয়দেব ফিরলেন সঙ্গে রিকশাওয়ালা। তাকে একেবারে ঘরের মধ্যে নিয়ে এসেছেন। রিকশাওয়ালাকে মহিমাময়ের টেবিলের সামনে দাঁড় করিয়ে জয়দেব বললেন, মহিমা, ভাল করে দ্যাখ লোকটাকে। বিকেল থেকে আমার সঙ্গে আছে। এর চেহারার মধ্যে একটা অনেস্টি রয়েছে। তোর মতো চোর চোর চেহারা নয়। আমি একবার দেখেই লোক চিনতে পারি। পঞ্চাশ, শুধু পঞ্চাশ কেন পঞ্চাশ হাজার টাকা দিয়েও এরকম লোককে বিশ্বাস করা যায়।
হাঁটুর ওপরে তোলা খাটো ময়লা ধুতি, খালি গা, কোমরে ঘন্টি, দেহাতি লোকটিও বোধহয় জয়দেবের সঙ্গে তাল দিয়ে দিয়ে বেশ নেশা করেছে, সে হাসিহাসি মুখে মহিমাময়ের মুখের দিকে তাকিয়ে রইল।
মহিমাময় লোকটিকে জিজ্ঞাসা করলেন, তোমার নাম কী?
সুখের বিষয় লোকটি বাংলা বোঝে, বোধহয় অনেকদিন কলকাতায় আছে, সে বলল, হুজৌর, মেরা নাম ঠকাই, ঠকাই সিং।
নাম শুনে মহিমাময় আতংকিত বোধ করলেন, লোকটিকে বললেন, তুমি বাইরে দাঁড়াও। লোকটি বেরিয়ে যেতে জয়দেবকে বললেন, দ্যাখ, জয়, আমি আর যাই করি এই এত রাতে ঠকাই। নামে এরকম একটা লোককে পঞ্চাশ টাকা দিয়ে বিশ্বাস করতে পারি না।
এবার জয়দেব ক্ষেপে গেলেন, উত্তেজিত অবস্থায় দাঁড়িয়ে পড়ে চেয়ারের ওপর বাঁ পাটা তুলে দিলেন, তারপর ধীরে ধীরে প্যান্টের ঝুলটা হাঁটু পর্যন্ত টেনে তুললেন। চাপা প্যান্ট নয়, আধুনিক ফ্যাশানের ঢোলা প্যান্ট, তাই বিশেষ অসুবিধা হল না। প্যান্ট তুলতে দেখা গেল হাঁটুর কিছু নীচে পায়ের সঙ্গে মোটা রবারের গার্ডার দিয়ে একটা একশো টাকার আর একটা পঞ্চাশ টাকার নোট বাঁধা।
একশো টাকার নোট যথাস্থানে রেখে, পঞ্চাশ টাকার নোটটা গার্ডার থেকে খুলে বার করে প্যান্টটা আবার নামিয়ে দিলেন জয়দেব, মুখে গজগজ করতে লাগলেন, দিনরাত মাতালদের সঙ্গে ওঠাবসা, ভদ্রলোকের মতো পকেটে টাকা রাখার জো আছে! গজগজ করতে করতে কটমট করে তাকাতে লাগলেন মহিমাময়ের দিকে।
এদিকে মহিমাময়ের ঠকাই সম্পর্কে আশংকা কিন্তু ঠিক মিলল না। দশ টাকা বখশিশের প্রলোভন দেখানো সত্ত্বেও ঠকাই এত রাতে এত বৃষ্টিতে মদ আনতে যেতে রাজি হল না। তা ছাড়া সে বলল, এসব খারাপ জিনিস কোথায় পাওয়া যায়, সেসব সে কিছু জানে না। আজ এই বড়বাবুর। পাল্লায় পড়ে জীবনে প্রথম নেশা করেছে। সে অত্যন্ত সাধু লোক, দৈনিক হনুমান পুজো করে, খইনি-বিড়ি পর্যন্ত খায় না।
অতঃপর বাধ্য হয়ে জয়দেব নিজেই বেরোতে গেলেন, কিন্তু বৃষ্টি ক্রমশ বাড়ছে, বেরোনোর সাহস করলেন না। একটু নরম হয়ে মহিমাময়কে বললেন, তা হলে দে–জিনটুকু দে, ওটাই খেয়ে নিই।
মহিমাময় বন্ধুকে একটু বেশি করে এবং নিজে একটু কম করে জিন নিয়ে দুটো গেলাসে জল ঢেলে নিলেন। আস্তে আস্তে জয়দেবের মন খুশি হতে লাগল।
কিছুক্ষণ পর বৃষ্টি ধরে এসেছে, জিনও শেষ। চুপচাপ দুজনে পান শেষ করেছেন। এবার জয়দেব। উঠলেন, বললেন, অনেক রাত হয়েছে, এগারোটা বাজে। বৃষ্টিটা থেমেছে, এই ফাঁকে যাই।
বেরোনোর মুখে জয়দেবকে মহিমাময় প্রশ্ন করলেন, কী একটা কাজের কথা আছে বলেছিলি?
ঘুরে দাঁড়িয়ে জয়দেব বললেন, ভাল কথা মনে করেছিস। আসল কাজটাই ভুলে গিয়েছিলাম। কাল তো আমাদের বিবাহবার্ষিকী। তোরা রাতে আমাদের ওখানে খাবি।
মহিমাময়ের স্ত্রী ভিতরের ঘরে আনাগোনা করছিলেন। জয়দেবের নিমন্ত্রণ শুনে বাইরের ঘরে এসে বললেন, গতবারের মতো হবে না তো?
গতবারের ব্যাপারটা একটু গোলমেলে। বেশি বর্ণনা না করে সংক্ষেপে বলা যায় গতবার নিমন্ত্রণ করে নিমন্ত্রণকর্তা জয়দেব নিজেই নিরুদ্দেশ হয়েছিলেন। সে এক অস্বস্তিকর অবস্থা, রাত বারোটা পর্যন্ত জয়দেবের জন্যে অপেক্ষা করে সকলে ফিরে আসে।
মহিমাময়ের স্ত্রীর প্রশ্নে জয়দেব বললেন, আরে না না। লজ্জা দেবেন না। আপনাদের বাড়ি থেকে বেরিয়ে এখন সোজা বাড়ি যাব। কাল আর বাড়ি থেকে বেরোব না।
মহিমাময় বললেন, বাড়ি থেকে বেরোবি না? তবে খাওয়াবি যে বাজার করবি না?
জয়দেব বললেন, হবে তো খিচুড়ি-মাংস আর আনারসের চাটনি। মাংস পাড়াতেই পাওয়া যাবে। আর আনারসটা বউ একসময়ে নিউমার্কেটে গিয়ে নিয়ে আসবে।
মহিমাময় মৃদু আপত্তি করলেন। ওই মাংস-খিচুড়িই যথেষ্ট। আমি এক বোতল হুইস্কি নিয়ে যাব। বউদিকে নিউ মার্কেটে গিয়ে আনারস কিনতে হবে না। আর এখন আনারসের খুব দাম, বাজারে ভাল করে ওঠেইনি।
খুব দাম কথা দুটো জয়দেবের কানে খট করে লাগল, সঙ্গে সঙ্গে তাঁর প্রতিক্রিয়া হল, তিনি ঘরের মধ্যে দু পা এগিয়ে এসে অভিযোগের ভঙ্গিতে বললেন, খুব দাম? আমি মদ খেয়ে পয়সা নষ্ট করি বলে তোরা ভাবি আমার আনারস কেনারও ক্ষমতা নেই?
