দুপুরে অফিসে এসেছিলেন জয়দেব। চোখ লাল, এলোমেলো চুল, হাত পা টলমল, ভর দুপুরেই নেশা করেছেন। এসে দাঁড়াননি, বিশেষ বিরক্তও করেননি, শুধু বলেছিলেন, কাজের কথা আছে। এখানে হবে না, সন্ধ্যাবেলায় বাসায় থাকিস, যাব।
তা জয়দেব বলুন আর না বলুন, সন্ধ্যাবেলা মহিমাময় এমনিতেই কোথাও যান না। অফিস থেকে বেরিয়ে সোজা বাসায় চলে আসেন, বাসায়ই থাকেন।
আজও বাসায়ই ছিলেন মহিমাময়। জয়দেব আসবে বলেছে, সাধারণত নেশার মধ্যে কেউ কিছু বললে, যতক্ষণ নেশার ঘোর মাথার মধ্যে থাকে কথাটা তার মাথায় থাকে। সুতরাং জয়দেবেরও থাকতে পারে, এরকম একটা আশংকা সন্ধ্যা থেকেই মহিমাময় করছিলেন। কাজের কথা না কী বলবে জয়দেব, সেটা অবশ্য ধর্তব্যের মধ্যে নয়, তার পুরনো বন্ধু আসবে বলেছে, আসুক।
আলমারির পেছনে কয়েকটা আধ-খাওয়া মদের বোতল আছে। ধুলো ঝেড়ে সেগুলো বার। করেছেন মহিমাময়, মদ পচে যায় না বরং যত পুরনো হয় ততই তার স্বাদ বাড়ে, জোর বাড়ে।
আগে মহিমাময় মদ খেতেন প্রায় প্রত্যেক সন্ধ্যাবেলা বাসায় বসে একা একা। এখন আর খুব একটা খান না। সন্ধ্যাবেলা খুব খিদে পায়। অফিস থেকে ফিরে তাই তাড়াতাড়ি ভাত খেয়ে নেন। তারপর আর মদ খেতে ইচ্ছে করে না, আর তা ছাড়া ভরপেট খেলেই মহিমাময়ের ঘুম পায়। তিনি শুয়ে পড়েন এবং ঘুমিয়ে পড়েন।
আজ জয়দেব আসবে বলে খুঁজে খুঁজে আলমারির পিছন থেকে তিনটে বোতল বেরিয়েছে। একটার মধ্যে অল্প একটু জিন আছে, সেটা রাতের বেলায় চলবে না। মদ ব্যাপারটা ফুলের ঠিক উলটো। কথাটা কোথায় যেন শুনেছিলেন মহিমাময়। সাদা ফুল ফোটে রাতের বেলায় আর দিনের বেলায় রঙিন ফুল। কিন্তু মদের বেলায় দিনে সাদা মদ, জিন, ভদকা ইত্যাদি, আর রাতে রঙিন মদ হুইস্কি, রাম, ব্র্যান্ডি। এটাই হল নিয়ম। এ নিয়ম যে মানতেই হবে এমন কোনও কথা নেই, কিন্তু মোটামুটি সবরকম মদ্যপই এই নিয়মটা মান্য করে। কেন করে কে জানে?
সে যা হোক, মহিমাময় জিনের বোতলটা আবার আলমারির পিছনে রেখে দিলেন। বাকি দুটো বোতলের একটায় সামান্য পরিমাণ রাম হয়েছে, প্রায় তলানিই বলা চলে, এক ঢোকের বেশি হবে না। তবে দ্বিতীয় বোতলটায় হুইস্কি বেশ কিছুটা আছে।
টেবিলের নীচে চেয়ারে পায়ের কাছে বোতল দুটো রেখে বাইরের ঘরে বসে জয়দেবের জন্য অপেক্ষা করছিলেন মহিমাময়। জয়দেবের অবশ্য আসার কোনও ঠিকঠিকানা নেই, রাত দেড়টা এমনকী ভোর চারটেতেও আসতে পারে। সন্ধ্যা থেকে প্রতীক্ষা করতে করতে ধৈর্য হারিয়ে ফেললেন মহিমাময়। সাড়ে আটটা নাগাদ প্রতিদিনের মতো খিদেটা যখন জোর পেয়ে বসল তখন তিনি খিদের বদলে তৃষ্ণা নিবারণের দিকে জোর নিলেন। প্রথমে এক ঢেকে রামের তলানিটুকু নিট গিলে ফেললেন। অনেকদিন খাননি, একটা বড় হেঁচকি উঠল, তারপর কিছুটা বাদে ক্রমাগত হেঁচকির পর হেঁচকি, বিলম্বিত লয়ে হেঁচকি শুরু হল।
প্রথমে দু-চার গেলাস জল খেয়ে হেঁচকি কাটানোর ব্যর্থ চেষ্টা করার পর হুইস্কির বোতলটা খুললেন মহিমাময়। ইচ্ছে ছিল না খেতে, জয়দেব আসবে, তাকে কি শুকনো মুখে বসিয়ে রাখবেন? খাওয়া আরম্ভ করলে মহিমাময় খুব তাড়াতাড়ি খান, এখনই ফুরিয়ে যাবে সামান্য পানীয়টুকু।
তাই ফুরোল, নটা পঁচিশ নাগাদ শেষ বিন্দুটুকু গলাধঃকরণ করে যখন হেঁচকির টানটা সবে ছেড়েছে আর একটা গুমভাব এসেছে মনের মধ্যে সেই সময় জয়দেব এলেন। জয়দেবের সঙ্গে সঙ্গে এল জোর বৃষ্টি। মহিমাময়ের বাড়িটা রাস্তার উপরে, একতলায় তিন কোনাচে বাইরের ঘরটা। নেশা করলে জয়দেব রিকশায় যাতায়াত করেন। একলাফে বৃষ্টি বাঁচিয়ে জয়দেব রিকশা থেকে সরাসরি বাইরের ঘরে ঢুকলেন।
নেশা আরম্ভ করার প্রথম দিকে যেটুকু মাথা ঘোরে কিংবা পা টলে জয়দেবের, তারপর তিনি যত খান বেহুশ না হওয়া পর্যন্ত স্টেডি থাকেন। সেই স্টেডি ভাবটা এখন জয়দেবের মধ্যে এসেছে। জয়দেবকে লাফ দিতে দেখে মহিমাময়ের ভয় হয়েছিল ছিটকিয়ে পড়ে-উড়ে গিয়ে জখম না হয়। এরকম জখম হওয়া জয়দেবের পুরনো অভ্যেস। কিন্তু এখন জয়দেব সত্যিই স্টেডি।
ঘরে ঢুকে টেবিলের সামনের চেয়ারে বন্ধুর মুখোমুখি বসলেন জয়দেব। তারপর জিজ্ঞাসা। করলেন, কীরে, নেই কিছু?
মহিমাময় এ প্রশ্নে একটু অস্বস্তি বোধ করলেন। বললেন, তুই এত দেরি করলি! সামান্য একটু ছিল, তোর জন্যে অপেক্ষা করতে করতে শেষে আমি নিজেই খেয়ে ফেললাম। তারপর একটু থেমে বললেন, একটু জিন আছে, খাবি?
জয়দেব ভুরু কুঁচকিয়ে বললেন, জিন? জিন আবার ভদ্রলোকে খায় নাকি? তোর পাল্লায় যখন পড়েছি, সন্ধ্যাবেলা বাসায় আসতে বললি অথচ কিছু বন্দোবস্ত রাখিসনি!
মহিমাময় বলতে যাচ্ছিলেন, আমি তো তোকে আসতে বলিনি। তুই-ই আসতে চেয়েছিস। তা বলে চেয়ার থেকে উঠে গিয়ে আলমারির পিছন থেকে জিনের বোতলটা বার করে নিয়ে এলেন।
বোতলটার মধ্যে পানীয়ের পরিমাণ স্বল্প। বড়জোর চারভাগের এক ভাগ হবে। তবে একজনের পক্ষে সেটা কম নয়। একে জিন, তারপরে সিকি বোতল-মহিমাময়ের এরকম ব্যবহারে জয়দেব উত্তেজিত হয়ে বললেন, এসব চলবে না। পঞ্চাশটা টাকা বার করো, রিকশাওয়ালাকে দিয়ে একটা ছোট হুইস্কি আনাই।
মহিমাময় এরকম অবস্থার জন্য মোটামুটি প্রস্তুত ছিলেন। কিন্তু এই বৃষ্টির মধ্যে রিকশাওয়ালা কোথায় যাবে, এত রাতে সব দোকান বন্ধ হয়ে গেছে, কোথায় পাবে মদ, তা ছাড়া পঞ্চাশ টাকাও কম কথা নয়!
