নিবারণবাবু আমাকে বললেন, যতক্ষণ বাসায় থাকি, এমনকী ঘুমের মধ্যেও হাত মুঠো করে রাখি। কথাটা আমার চেনা, তবু জিজ্ঞাসা করলাম, কেন? এত দুঃখের মধ্যেও নিবারণবাবু বললেন, প্রাণটাকে মুঠোর মধ্যে ধরে রাখি কি না?
শুধু নিজের বাড়ি সম্পর্কে ভয় নয়, আজকাল নিবারণবাবু কোথাও কোনও উঁচু বাড়ি দেখলে তার ধারে কাছে ঘেঁষেন না। যথাসাধ্য এড়িয়ে চলেন, কখনও মাথার ওপর ভেঙে পড়বে কে জানে?
নিবারণবাবুর মাথার ওপর অবশ্য বাড়ি ভেঙে পড়ল না। কিন্তু সত্যি সত্যি যা ঘটল তা অবিশ্বাস্য।
জতুগৃহ হল পাশাপাশি একজোড়া চৌদ্দতলা বাড়ি, একই কম্পাউন্ড, একই গেট, দুটো বাড়ির মধ্যে কুড়ি ফুট ব্যবধান। কী এক নৈসর্গিক কিংবা অনৈসর্গিক কারণে হয়তো বিশেষ পারস্পরিক আকর্ষণেই বাড়ি দুটি পরস্পর পরস্পরের দিকে ক্রমশ হেলতে শুরু করল।
প্রথমে তেমন গুরুত্ব দেয়নি কেউ, তেমন বোঝাও যায়নি কিন্তু অল্প কিছুদিন পরে সকলের নজরেই পড়ল ব্যাপারটা, বাড়ি দুটির ছাদ পরস্পরের খুব কাছে চলে এসেছে।
ওপরের দুই চৌদ্দতলার মধ্যে দূরত্ব কুড়ি ফুট থেকে কমতে কমতে বারো, দশ, আট, অবশেষে দুই ফুটে দাঁড়াল। অবশ্য দুটি বাড়ির মধ্যে ব্যবধান অনিবার্য কারণেই এখন বিশ ফুট।
খবরের কাগজের প্রথম পাতায় বাড়ি দুটোর ছবি ছাপা হল। বি বি সি চ্যানেল চার না পাঁচ থেকে টেলিভিশনের আলোকচিত্রী এসে জতুগৃহের ছবি তুলে সারা পৃথিবীর লোককে দেখাল। ফরাসি খবরের কাগজে অষ্টম আশ্চর্য ক্যাপশন দিয়ে পিসার হেলানো স্তম্ভের এবং হেলানো জতুগৃহের ছবি পাশাপাশি ছাপা হল।
নিবারণবাবুর বিবাহিত কন্যারা প্রবাসে থাকে। তারা টেলিগ্রাম পাঠাল ভ্যাকেট জতুগৃহ, কাম শার্প ছেলে সুদূর টেকসাসে হিউস্টন শহর থেকে ফোন করে বাবাকে জিজ্ঞাসা করল, ওই বাড়িতেই কি তোমরা আছ?
আছেন বটে নিবারণবাবু কিন্তু বড় কঠিন হয়ে গেছে ব্যাপারটা। বাড়ি দুটির মাথা এখন সম্পূর্ণ একত্র হয়ে গেছে। মাতালেরা যেমন পরস্পরকে জড়িয়ে ধরে দাঁড়িয়ে থাকে সেইরকম অবস্থা। দূর থেকে দেখলে মনে হয় দুই অতি দীর্ঘকায় প্রাগৈতিহাসিক জন্তু পরস্পর গুঁতোগুঁতি করছে।
এদিকে বাড়ির মেঝে কাত হয়ে গেছে। চেয়ার, টেবিল, খাট, আলমারি সব কাত। কাত হওয়ার। জন্য লিফট আর উঠছে না, সিঁড়ির গর্তে কোনাকুনি ভাবে আটকিয়ে গেছে।
বাড়িতে বসবাস করা অসম্ভব হয়ে দাঁড়িয়েছে। সব কিছু গড়িয়ে পড়ে যাচ্ছে। টেবিল থেকে চিনেমাটির পেয়ালা, পিরিচ, কাঁচের গেলাস ঝনঝন করে মেঝেতে পড়ে ভেঙে যাচ্ছে। বইয়ের র্যাক বই সমেত গড়াগড়ি খাচ্ছে। আলমারি খুললে তাকের ওপর থেকে ভেতরের জিনিসপত্র নীচে গড়িয়ে পড়ে যাচ্ছে। এমনকী ঘুমন্ত মানুষ হেলানো খাট থেকে পড়ে গিয়ে আহত হচ্ছে, রক্তারক্তি কাণ্ড ঘটাচ্ছে। জেগে থাকা অবস্থায় খাটে শুয়ে থাকতে হলে খাটের বাজু আঁকড়িয়ে থাকতে হচ্ছে।
জতুগৃহের অধিবাসীরা একে একে বাক্স-বিছানা, আসবাবপত্র এবং মূল্যবান প্রাণ নিয়ে যে যার সাধ্যমতো পলায়ন করল। যে যেরকম দামে পারে ফ্ল্যাট বেচে দিতে লাগল। কেনার দাম ছিল সাড়ে আট লাখ টাকা, এখন বেচার সময় দাম পড়তে পড়তে তিরিশ হাজারে নেমে এল।
পাড়ায় থাকি, সব খবরই পাই। কিন্তু নিবারণবাবুর সঙ্গে আর দেখা হয় না। ধরে নিয়েছিলাম তিনিও পলায়ন করেছেন। কিন্তু হঠাৎ সেদিন রাস্তায় মোড়ে দেখা।
দেখা হতে জিজ্ঞাসা করলাম, কী খবর? আপনি এখনও আছেন?
নিবারণবাবু বললেন, আছি মানে কি? চমৎকার আছি। সব ছেড়ে যাওয়া খালি হওয়া ফ্ল্যাট আমি কিনে নিচ্ছি।
আমি বললাম, সর্বনাশ! এসব কী করছেন? আপনার শরীর মানে মাথা ঠিক আছে তো? এ তো জীবন নিয়ে খেলা, আপনার ছেলেকে জানিয়েছেন সব ব্যাপার?
নিবারণবাবু হাসলেন, হেসে বললেন, জানাব কী? ছেলের পরামর্শেই তো সব কিছু করছি।
আমি অবাক হয়ে বললাম, পরামর্শ? আপনার ছেলে এ ব্যাপারে কী পরামর্শ দিয়েছে?
নিবারণবাবু বললেন, এ বাড়ি নিয়ে আমেরিকায় হইচই পড়ে গেছে। আমার ছেলে এ বাড়ির ফ্ল্যাটগুলো আমেরিকায় ধনকুবেরদের কাছে অষ্টম আশ্চর্য কলকাতার হেলানো ফ্ল্যাট (Leaning flats of Calcutta) নামে একেকটা পাঁচ-ছয় লাখ ডলারে বেচছে, যার মানে আমাদের টাকায় প্রায় এক কোটি টাকা।
আমি বললাম, তারপর।
নিবারণবাবু বললেন, তারপর আর কী? কোটিপতি হয়ে যাব। এ বাড়িতে থাকি ভাল, না থাকি যেখানে ইচ্ছে চলে যাব। আর থাকলেই বা অসুবিধে কী? আগেও অবাঙালির সঙ্গে ছিলাম, এখনও তাই থাকব। এরা তবু মন্দের ভাল, খাঁটি সাহেব, কুলীন মার্কিনি সাহেব।
জয়দেবের জীবনযাত্রা
রাত পৌনে দশটার সময় এল জয়দেব। একটু আগে এক পশলা বৃষ্টি হয়ে গেছে, রাস্তায় হালকা জল জমেছে। দুদিন ভরা গুমোটের পর আজ একটু বৃষ্টি হল। তবে আরও বোধহয় হবে, আকাশে মেঘ থমথম করছে, বিদ্যুৎ চমকাচ্ছে, বাতাসও বেশ জোরালো।
এক পশলা বৃষ্টিতে রাস্তায় জল জমেছে, রাতে যদি আরও বৃষ্টি হয় কাল সকালে রাস্তায় অনেক জল থাকবে, দুধ আনা, বাজার করা–কাল সকালের হাঙ্গামাগুলো ভাবতে লাগলেন মহিমাময়।
গুমোট কেটে গিয়ে জোলো বাতাসে একটা আরামের ভাব। সেইসঙ্গে কাল সকালের চিন্তা জয়দেবের কথা প্রায় ভুলতেই বসেছিলেন মহিমাময়।
