মিসেস সেন পা নাচানো থামিয়ে বললেন, আপনার ওই মহাভারত-টহাভারতের ব্যাপার নেই এর মধ্যে। আমাদের কোম্পানির কেউ কোনওদিন মহাভারত পড়েনি। সময় কোথায়? এমনকী টিভিতে দ্রৌপদীর বস্ত্রহরণের দৃশ্য দেখার সময় পাওয়া যায়নি। মিস্টার আগরওয়ালা সেসব সিন ভিডিয়োতে তুলে রেখেছেন, সময় পেলে অবসরমতো দেখবেন। বুকের আঁচল আরেকবার ফেলে দিয়ে আবার পা নাচানো আরম্ভ করে মধুর হেসে মিসেস সেন যোগ করলেন, মিস্টার আগরওয়ালা বলেছেন তখন আমাকেও দেখাবেন।
বস্ত্রহরণের পরিপ্রেক্ষিতে দাঁড়িয়ে নিবারণবাবু থতমত খেয়ে গেলেন, এবার আর মিসেস সেনের পদপ্রান্তে নয়, মেঝেতে চোখ রেখে নিবারণবাবু জিজ্ঞাসা করলেন, তবে জতুগৃহ নাম কী জন্যে?
মিসেস সেন বললেন, আমাদের মালিক, মিস্টার আগরওয়ালা, জে এল আগরওয়ালা সাহেব, ওঁর পুরো নাম হল জতুলাল আগরওয়ালা। জতুলাল সাহেবের বাড়ি, তাই নাম দেওয়া হয়েছে জতুগৃহ।
বাড়ির নামকরণের কারণ বোঝা গেল। কিন্তু নিবারণবাবু আশ্বস্ত হতে পারলেন না।
ইতিমধ্যে তার সঙ্গে আমার ঘনিষ্ঠতা বেড়েছে। আমি একদিন তার বাড়িতে গেছি। তিনি দুদিন আমার বাড়িতে এসেছেন। এবং আজকাল প্রায় প্রত্যেক সকালেই ব্রিগেড়ে প্রাতঃভ্রমণে তিনি আমার সঙ্গী। ছুটির দিনের সন্ধ্যায় ভিক্টোরিয়ায়ও তাকে পাশে পাই।
যখনই তাঁর সঙ্গে দেখা হয় তিনি তার ফ্ল্যাট নিয়ে গজগজ করেন, বলেন, আগে জানলে কলকাতায় বাস করতে আসতুম না। সেই যদি অবাঙালিদের সঙ্গেই থাকব, তাহলে তো দিল্লিতে বা বোম্বাইতেই থাকতে পারতুম।
শুধু বাঙালির অভাবই নয়, জতুগৃহে অন্যান্য সমস্যাও আছে। লোডশেডিংয়ের সময় লিফটের জেনারেটার চালু থাকার কথা কিন্তু তা থাকে না। একদিন নীচের তলায় পৌঁছাতে যখন মাত্র দেড় ফুট বাকি, লোডশেডিংয়ে লিফট আটকিয়ে যায়, নিবারণ দত্ত পাকা দেড় ঘণ্টা বন্দি থাকেন সেই আলোবাতাসহীন অন্ধকূপে, নিজের আবাস থেকে নিতান্ত দেড় ফুট দূরত্বে।
আরেকদিন জলের পাম্প খারাপ হয়ে ছত্রিশ ঘণ্টা জল পেলেন না। একেক বালতি জল দশ টাকা করে কিনতে হল তার তেরোতলার ফ্ল্যাটে তুলে দেওয়ার জন্যে। জতুগৃহের কড়া আইন জলের বালতি নিয়ে লিফটে ওঠা যাবে না। সুতরাং দশ টাকা মজুরি বালতি প্রতি বেশি বলা চলে না।
সামনের দরজার শৌখিন মৎস্যমুখী ছিটকিনি একদিন রাতে দরজা বন্ধ করতে গিয়ে খুলে গেল। সদর দরজা বন্ধ করতে পারা গেল না, সদর দরজা খোলা রেখে তো আর রাতে ঘুমোনো যায় না। অবশেষে স্বামী-স্ত্রী দুজনে ঠেলাঠেলি করে একটা সোফা এনে দরজায় ঠেকা দিয়ে সেই সোফার ওপর শুয়ে রাত কাটালেন।
পরদিন সকালে প্রতিবেশীদের একথা জানাতে তারা সমস্বরে নিবারণবাবুকে বললেন, এখানে তো আমরা সবাই নিজের ছিটকিনি, কড়া, এমনকী কেউ কেউ জানলা, দরজা, বাথরুম পর্যন্ত নিজের মতো করে নিয়েছি। আপনারও তাই করা উচিত ছিল, প্রমোটার আর কত করবে?
সবচেয়ে অসুবিধা হয়েছে নিবারণবাবুর সব ফ্ল্যাট একই রকম দেখতে বলে। একদিন ভুল করে একতলা বেশি উঠে হনহন করে নিজের ফ্ল্যাট ভ্রমে এক প্রমত্তা গুজরাটি যুবতীর শয়নকক্ষে ঢুকে পড়েছিলেন। যুবতীটি মুডে না থাকলে সেদিন নির্ঘাৎ শ্লীতাহানির চেষ্টায়, অন্তত বেআইনি প্রবেশের দায় নিবারণবাবুর ঘাড়ে ঠিক চাপত।
অবশ্য নিবারণবাবু নিজের ভুল বুঝতে পেরে সঙ্গে সঙ্গে জিব কেটে সরি, ভেরি সরি বলে দৌড়ে পালিয়ে এসেছিলেন, তবে এখনও লিফটে, সিঁড়িতে বা উঠোনে সেই সদাহাস্যময় গুজরাটি বধূটির সঙ্গে দেখা হলে নিবারণবাবুর বুক ঢিপঢিপ করে।
তাতেও কোনও রকমে চলে যাচ্ছিল, ইতিমধ্যে সেই ভয়াবহ দুর্ঘটনা ঘটল। ভবানীপুরের নবনির্মিত বহুতল ফ্ল্যাটবাড়ি নিমেষের মধ্যে তাসের বাড়ির মতো ভেঙে পড়ল। বহু লোক হতাহত হল। খবরের কাগজে, দূরদর্শনে, বেতারে হইচই, কেলেঙ্কারি। পুলিশ, করপোরেশন, সরকার সবাই মিলে তুমুল শোরগোল, কাদা মাখামাখি।
ব্যাপার-স্যাপার দেখে নিবারণ দত্তমশায় কেমন যেন ঘাবড়িয়ে গেলেন। দেখা হলেই জিজ্ঞাসা করেন, আমাদের জতুগৃহ ভেঙে পড়বে না তো মশায়? শেষে আপনাদের কলকাতায় এসে ধনেপ্রাণে বিনাশ হব মশায়? এসব প্রশ্নের আমি আর কী উত্তর দেব? কিন্তু দত্তমশায়ের মাথায় জটিলতর জিজ্ঞাসা উঁকি দিল। তিনি থাকেন চৌদ্দতলা বাড়ির তেরোতলায়। তার জ্ঞাতব্য হল, বাড়ি যদি সত্যিই
ধ্বসে বা ভেঙে পড়ে তবে ওপরের দিকের লোকদেরই বেশি বিপদ, বেশি জীবনসংশয় নাকি নীচের দিকের লোকদের।
আমি নিবারণবাবুকে পাঠালাম আমার পরিচিত এক স্থপতি মানে আর্কিটেক্টের কাছে। তার অভিজ্ঞতা আছে এ ধরনের বাড়ি বানানোর, তিনি যদি কিছু বলতে পারেন। ৫৭০
কিন্তু তাকে পাওয়া গেল না। অন্য এক গৃহপতনের মামলায় আদালত থেকে অগ্রিম জামিন নিয়ে তিনি কিছুদিন হল নিরুদ্দেশ হয়েছেন। পুলিশই তাকে খুঁজে পাচ্ছে না, নিবারণবাবু আর তাকে পাবেন কী করে?
আজকাল নিবারণ দত্ত সস্ত্রীক যথাসম্ভব বাড়ির বাইরে থাকেন। দৈনিক নুন শো থেকে নাইট শো চারটে করে সিনেমা দেখছেন। গভীর রাত পর্যন্ত চোর ডাকাত, ছিনতাই পার্টি অগ্রাহ্য করে দত্ত দম্পতি ময়দানে, পার্কে ফাঁকা রাস্তায় ঘুরে বেড়ান। গভীর রাতে ঘুমের জন্যে প্রাণ হাতে করে কয়েক ঘণ্টার বাসায় ফেরেন। খাওয়া-দাওয়া পর্যন্ত বাড়ির বাইরে সারেন।
