আরামে হেলান দিয়ে বসেছিলাম বেঞ্চিটায়। এমন সময় মেরুন রঙের সাফারিসুট পরিহিত শীর্ণকায় এক ভদ্রলোক এসে হাত জোড় করে নমস্কার করে বিনীত হিন্দিতে রাম, রাম, পণ্ডিতজি বলে আমার অনুমতি চাইলেন আমার পাশে বসার জন্যে।
বুঝতে পারলাম খুবই খানদানি লোক, তা না হলে সরকারি বাগানের বারোয়ারি কাঠের বেঞ্চের শূন্য আসনে বসার জন্যে কেউ কারও কাছে অনুমতি প্রার্থনা করে?
আমি আর অনুমতি কী দেব, একটু সরে বসে আমার নিশব্দ অনুমোদন জানালাম। ভদ্রলোক আমার পাশে বসে দিনশেষের ক্ষীণ আলোয় প্যান্টের পকেট থেকে একটা প্রাপ্তবয়স্কদের জন্য বাংলা যৌনরহস্যের পত্রিকা বার করে পড়তে লাগলেন। পত্রিকাটির প্রচ্ছদটি খুব চটকদার, একটি অতিরিক্ত স্বাস্থ্যবতী এলোচুল রমণী বিবস্ত্র বসনে কোলবালিশ বুকে জড়িয়ে বিছানায় শুয়ে আছে, তার পাশে বড় বড় রক্তাক্ষরে লেখা আছে এবারের প্রচ্ছদকাহিনিঃ ব্যভিচারের বলি বিশাখা।
তা হলে ভদ্রলোক বাঙালি, কিন্তু আমাকে ঠাউরেছেন অবাঙালি, একেবারে পণ্ডিতজি। কয়েকদিন আগে কইরা শেঠজি বলেছিল। আজ এই ভদ্রলোক পণ্ডিতজি বললেন। মনে মনে ঠিক করলাম বিউটিবালার রেশমি পাঞ্জাবি পরে আর রাস্তায় বেরোব না।
তবে ভদ্রলোক যেহেতু বাঙালি এঁকে একটু আত্মপরিচয় দেওয়া অনুচিত হবে না এই ভেবে তাকে আমি সাদা বাংলায় বললাম, আপনি কি নতুন? আপনাকে তো এর আগে ভিক্টোরিয়া মেমোরিয়ালে দেখেছি বলে মনে হয় না।
আমার কথা শুনে ভদ্রলোক আনন্দে হাততালি দিয়ে উঠলেন এবং সেই সঙ্গে অতি দ্রুত এবং সন্তর্পণে যৌন রহস্যের কাগজটি প্যান্টের পকেটে চালান করলেন। তারপর কিঞ্চিৎ ধাতস্থ হয়ে বললেন, আরে, বড়দা, আপনি বাঙালি? কলকাতায় তা হলে এখনও বাঙালি আছে?
ভদ্রলাকের সঙ্গে আলাপ হল, নাম নিবারণ দত্ত। দুই মেয়ের বিয়ে হয়ে গেছে, এক ছেলে সেও বিদেশে, হিউসটনে অয়েল কোম্পানির একজিকিউটিভ।
দত্তমশায় বড় সরকারি কাজ করতেন, বহুদিন প্রবাসে ছিলেন, এখন রিটায়ার করে কলকাতায় বসবাস করতে এসেছেন। অনেকদিন আগেই টাকা জমা দেওয়া ছিল ক্যামাক স্ট্রিটের এক বহুতল বাড়ির ফ্ল্যাটের জন্যে, টাকাটা বিদেশ থেকে ছেলেই পাঠিয়েছিল। কী সব আইনঘটিত গোলমালে ফ্ল্যাটটা পেতে বেশ দেরি হয়, মাত্র কিছুদিন আগে হাতে পেয়েছেন এবং স্বামী-স্ত্রী সেখানে এসে উঠেছেন। সংসারে আর কেউ নেই।
দিল্লি থেকে কলকাতার খবরের কাগজে বিজ্ঞাপন দেখে সরল বিশ্বাসে ফ্ল্যাটের টাকা পাঠিয়েছিলেন নিবারণবাবু, তখন বুঝতে পারেননি ফ্ল্যাট কেনা আর ফ্ল্যাটে ঢোকা এক জিনিস নয়। তার চেয়েও বড় কথা তিনি জানতেন না যে এসব অঞ্চলে আজকাল বাঙালি প্রায় থাকেইনা, বিশেষত এসব অঞ্চলের ফ্ল্যাটে যাদের কালো টাকা বা বিদেশি অর্থ নেই তাদের পক্ষে মাথা গলানো অসম্ভব।
নিবারণবাবুর ফ্ল্যাটবাড়িটা আমি চিনি, আমার বাড়ির কাছেই। কী এক অজ্ঞাত কারণে বাড়িটার নাম জতুগৃহ। যাঁরা কিংবা যিনি এই নামকরণ করেছিলেন তাঁরা বা তিনি অবশ্যই অতি প্রতিভাবান, কল্পনাশক্তিসম্পন্ন লোক। কিন্তু জতুগৃহ নামক বাড়িতে নিবারণবাবুর মতো যাঁরা ফ্ল্যাট কিনেছেন তারাও অবশ্যই অসমসাহসী। তাদের প্রত্যেককে প্রজাতন্ত্র দিবসে পরমবীর চক্র দেওয়া উচিত।
নিবারণবাবুর সঙ্গে ক্রমে ক্রমে আলাপ হল। খুব বিষয়ী এবং সাবধানী লোক। তবে তার সঙ্গে কথাবার্তা বলার একটা অসুবিধে এই যে তার প্রায় সব কথাবার্তাই ওই ফ্ল্যাটবাড়ি নিয়ে।
কয়েকদিন আগে দূরদর্শনে জ্বলন্ত চিত্র দেখিয়েছে দিল্লির একটি বহুতল বাড়িতে আগুন লাগার দৃশ্য। ফায়ার ব্রিগেডের ঘণ্টা, ভীত সন্ত্রস্ত মানুষের দৌড়োদৌড়ি, লেলিহান অগ্নিশিখা–সেসব দেখে দারুণ ভয় পেয়ে গেছেন নিবারণবাবু, জতুগৃহ নামটা নিয়ে মাথা ঘামাতে আরম্ভ করেছে।
এই ফ্ল্যাটবাড়ির প্রমোটর হলেন মেসার্স জে এল আগরওয়ালা অ্যান্ড কোম্পানি। আমার পরামর্শমতো আগরওয়ালা কোম্পানির কাছে বাড়ির নামবদলের জন্যে নিবারণবাবু দরখাস্ত পাঠালেন। তার চিঠি পেয়ে আগরয়ালা কোম্পানি একদিন নিবারণবাবুকে অফিসে দেখা করতে অনুরোধ করল।
নির্দিষ্ট দিনে গিয়ে নিবারণবাবু জে এল আগরওয়ালা অর্থাৎ কোম্পানির কর্ণধারের দেখা পেলেন বটে, তবে তার প্রাইভেট সেক্রেটারির দেখা পেলেন। সুখের বিষয় প্রাইভেট সেক্রেটারিটি বাঙালি, বিশদভাবে বলা উচিত মধ্যবয়সিনী, লাস্যময়ী বাঙালিনী। হাই হিল, বব চুল, গোলগাল শক্তসমর্থা, আদ্যনাম অফিসে কেউ জানে না, সেখানে সবাই মিসেস সেন বলে জানে।
মিসেস সেনকে নিবারণবাবু জতুগৃহনামে তার আশঙ্কা ও আপত্তির কারণ বিশদভাবে জানালেন। মিসেস সেন তাঁর সুচিক্কণ আঁকা ভুরু নাচাতে নাচাতে এবং বুকের ওপর থেকে লাল জর্জেট শাড়ির আঁচল পাঁচবার ফেলে এবং চারবার তুলে অতিশয় মনোযোগ দিয়ে শুনলেন।
নিবারণবাবু জতুগৃহ নামের মহাভারতীয় উপাখ্যান এবং তৎসহ সাম্প্রতিক দিল্লির অগ্নিকাণ্ডের কাহিনি সবিস্তারে বললেন।
বিনিময়ে মিসেস সেন একটা দীর্ঘ হাই তুলে শেষ বারের মতো বুকের আঁচলটা তুলে বললেন, আপনি গোড়াতেই ভুল করেছেন।
মাঝে মাঝে হাইহিল জুতোসুদ্ধ চরণকমলদ্বয় নাচাচ্ছিলেন মিসেস সেন, সেদিকে অর্থাৎ গোড়ার দিকে অচঞ্চল দৃষ্টি রেখে নিবারণবাবু প্রশ্ন করলেন, মানে?
