অবশ্য এই রেয়ন ধুতির চেয়ে অনেক বেশি রোমহর্ষক ইতিহাস আমার রেশমি পাঞ্জাবিটির।
আমার এক অকৃতদার খুল্লতাত আদালতের পেশকারি কাজ থেকে রিটায়ার করার পর যাত্রাদলে প্রম্পটার হয়েছিলেন। যাত্রাপার্টির সঙ্গে যখন তাকে বাইরে যেতে হত না তখন কলকাতায় আমার কাছেই থাকতেন।
গোয়ালপাড়া থেকে বালেশ্বর এবং সুন্দরবন থেকে তরাই কাঁপানো যুগান্তকারী যাত্রাপালা শাখা ভাঙো সিঁদুর মোছো দ্বিসহস্র রজনী অতিক্রম করেছিল তার প্রম্পটিংয়ে। সেই পালার একটি অবিস্মরণীয় দৃশ্য ছিল নায়িকা বিউটিবালা এক রাতে সিল্কের পাঞ্জাবি আর পাজামা পরে চোখে সানগ্লাস লাগিয়ে দুশ্চরিত্র, লম্পট স্বামীর খোঁজে পতিতালয়ে গেছে।
মারমার, কাটকাট সিন সেটা। কিন্তু কোনও এক নির্দিষ্ট কারণে, যাত্রার মালিক ভগবান মাইতির প্রৌঢ়া স্ত্রী সত্যভামা, রথযাত্রার পুণ্যতিথিতে যখন চিৎপুরের গদিতে বিউটিবালার। পাশে বসে ভগবানবাবু নায়েকদের সঙ্গে লেনদেন এবং মিঠে পান, মিঠে হাসি বিনিময় করছিলেন, সহসা প্রবেশ করে গদির নীচ থেকে একটি বঁটা তুলে নিয়ে বিউটিবালাকে। আপাদমস্তক আশীর্বাদ করলেন।
বিউটিবালাকে ভগবান মাইতি ধারণা দিয়েছিলেন যে তিনি বিপত্নীক কিন্তু সেই মুহূর্তে সমুদ্যত বঁটা, হাতের নোয়া,শাখা সেই সঙ্গে সিঁথির সিঁদুর,কস্তাপেড়ে লাল শাড়ি এবং সর্বোপরি অধিকারবোধ ইত্যাদি দেখে সত্যভামাকে বুঝতে বিউটিবালার এক লহমা লাগল। সে দ্রুত চিৎপুরের পথ ধরে পশ্চিমদিকে পালাল।
বিউটিবালা আর ফিরে আসেনি। কিন্তু ভগবানবাবু এরপর যথেষ্ট সাবধান হয়ে যান। বিউটিবালার স্থলাভিষিক্তা হয় শম্পারানী। তিনি তার সঙ্গে নিরাপদ দূরত্বে অবস্থান করতেন।
কিন্তু অন্য একটা অসুবিধে হয়েছিল। বিউটিবালা ছিল প্রকৃত যাত্ৰাসুন্দরী। ওজন ছিল একশো কেজি, দৈর্ঘ্য প্রস্থ এবং গভীরতা ছিল পাঁচ ফুট বাই তিন ফুট বাই আড়াই ফুট। এক কিলোমিটার দুরের সদ্য কাটা ধানখেতের আলের ওপর বসানো পাঁচ টাকার গ্যালারি থেকে জনতা তাকে চোখের সামনে দেখতে পেত।
বিউটিবালার ক অক্ষর ছিল গোমাংস। তার মানে লেখাপড়া শূন্য। সে তুলনায় শম্পা বিদ্যাবিলাসিনী, উত্তর মধ্যমপাড়া বালিকা বিদ্যালয় থেকে সে পর পর চারবার মাধ্যমিক পরীক্ষা দিয়েছে। সে কারণেই কিংবা অন্য কোনও কারণে তার ওজন মাত্র চুয়াল্লিশ কেজি। ফলে শ্রীমতী বিউটিবালার পরিত্যক্ত পোশাক শম্পারানীর পক্ষে ব্যবহার করা সম্ভব হয়নি। তার জন্যে মহানুভব ভগবান মাইতি পয়সা খরচ করে নতুন পাজামা-পাঞ্জাবির সেট বানিয়ে দেয়।
আমার প্রম্পটার খুল্লতাত প্রায় আমার মতোই স্থূলবুদ্ধি, স্ফীতোদর এবং কৃপণ ছিলেন। তিনি ভগবানবাবুকে বিশেষ অনুরোধ করে বিউটিবালার ওই পাঞ্জাবিটি নিজের জন্যে চেয়ে নেন।
কিন্তু এর অব্যবহিত পরেই কোলাঘাটের কাছে এক গ্রামে একই রাতে শাঁখা ভাঙো সিঁদুর মাছে পালার পরপর দুবার অভিনয় হয়। দ্বিতীয়বার অভিনয়ের শেষদিকে প্রম্পটিং করতে করতে অকস্মাৎ হৃদরোগে আমার খুল্লতাত মহোদয় আক্রান্ত হন এবং পরের দিন কলকাতার একটি হাসপাতালে দেহত্যাগ করেন।
অকৃতদার খুল্লতাত মহোদয়ের মৃত্যুর পর উত্তরাধিকারী হিসেবে যাত্রাপালার কয়েকটি মলিন হাতে লেখা পাণ্ডুলিপি,এক জোড়া হাই-পাওয়ার চশমা, সামান্য তৈজসপত্র এবং তৎসহ জামাকাপড়ের সঙ্গে ওই সিল্কের পাঞ্জাবিটা আমি পেয়েছি।
ছুটির দিনের সায়াহ্নে গজেন্দ্রর দেওয়া রেয়নের ধুতি এবং বিউটিবালার রেশমের পাঞ্জাবি গায়ে দিয়ে বেড়াতে বেরোই। বিউটিবালার পাঞ্জাবি আমাকে চমৎকার ফিট করেছে। তবে আমার এই হৃষ্টপুষ্ট, নধরকান্তি, ভুড়িওলা শরীরে ওই রেশমি পাঞ্জাবি পরলে কেমন একটা অবাঙালি, বেওসায়ি সুলভ চেহারা হয়। সেদিন নিউমার্কেটে মাংস কিনতে গিয়েছিলাম, অচেনা সব দোকানদার, তারা সমস্বরে আমাকে আইয়ে শেঠজি, আইয়ে শেঠজি বলে ডাকতে লাগল। শেঠজিরা যে মাংসাশী নয় সে কথা বুঝিয়ে আমি তাদের জানালাম যে আমি বাঙালি। তারা আমার কথা শুনে মিটমিট করে হাসতে লাগল। বোধ হয় মনে মনে ধরে নিল যে লোকটা মাংস খাওয়ার লোভে নিজেকে বাঙালি বলছে।
০২. মূল কাহিনি
এ গল্প তো নিবারণবাবুকে নিয়ে, অথচ আমি আমার নিজের কথাই বেশি বলে ফেললাম।
অনেক পুষ্করিণীতে সিঁড়ি বাঁধানো ঘাট থাকে। যখন জল গভীর থাকে টইটম্বুর বর্ষাকালে, সিঁড়িগুলো জলের নীচে থাকে। কিন্তু খর গ্রীষ্মে চৈত্র-বৈশাখে যখন জল ফুরিয়ে দিঘির নীচে নেমে যায় তখন দেখা যায় লম্বা সিঁড়ির ধাপ নেমে গেছে বহুদূর পর্যন্ত। আমার এই মূল কাহিনি খুবই সামান্য, গ্রীষ্মের দিঘির জলের মতোই অগভীর তাই অবতরণিকার সিঁড়িটা এত লম্বা।
যা হোক জলের কাছে এসে গেছি, এবার নিবারণবাবুর কাহিনিতে প্রবেশ করছি।
যা বলছিলাম, সময়টা ছিল বোধহয় আশ্বিনের কাছাকাছি। একটু আগে জোর একপশলা বৃষ্টি হয়ে গেছে। ভিক্টোরিয়ার পুকুরধারে কাঠের বেঞ্চিতে বসে আছি। দিন প্রায় শেষ, এখন মেঘ বা বৃষ্টি কিছু নেই। আকাশ সনাতন শারদীয় নীল আভায় ঝলমল করছে। সারা দুপুর গুমোট ছিল, এখন বৃষ্টির পর ঝিরঝিরে হাওয়া দিচ্ছে, সেই হাওয়ায় একটু ঠান্ডার আমেজ মিশে আছে, টের পাওয়া যাচ্ছে শীতকাল আর খুব বেশি দূরে নয়।
