এ পাড়ায় আমি খুব বেশিদিন আসিনি, বছর আটেক হবে বড় জোর। এখানে এসে প্রথম প্রথম প্রাতঃ ও সান্ধ্যভ্রমণের সময় এই ভ্রমণ বিভেদের ব্যাপারে আমার কিঞ্চিৎ খটকা লেগেছিল। ভিক্টোরিয়াতেও মন্ত্রী থেকে কেরানি হাঁটছেন, ব্রিগেডেও তাই। কিন্তু ভিক্টোরিয়ার মন্ত্রী কখনওই ব্রিগেড়ে হাঁটতে যাবেন না, আবার ব্রিগেডের কেরানি ভিক্টোরিয়ায়? নৈব নৈব চ।
অনেকদিন ধরে ব্যাপারটা অনুধাবন করার পরে এখন বুঝতে পেরেছি, এটা নিতান্ত একটা অভ্যাসমাত্র। এর মধ্যে কোনও গূঢ় সামাজিক মনস্তত্ত্ব বা তথাকথিত আর্থ-রাজনৈতিক কারণ নেই। একেকজনের একেকরকম অভ্যাস ও পছন্দ।
আমি অবশ্য ভিক্টোরিয়ায় এবং ব্রিগেডে, এই দুই জায়গাতেই স্বচ্ছন্দ ও সাবলীলভাবে বিচরণ করি। সকালে ব্রিগেডে হাঁটতে যাই, খোলা মাঠে নীল আকাশের নীচে শিশির ভেজা সবুজ ঘাসের গালিচায় খালি পায়ে হাঁটি। আমার রক্তচাপ কমে, দেহেমনে আরাম হয়।
আর ছুটির দিনের বিকেল, ঠিক বিকেলে নয়, সন্ধ্যায় সন্ধ্যায় ভিক্টোরিয়া মেমোরিয়ালে হাঁটতে যাই। সুবেশ পুরুষ এবং সুন্দরী রমণীদের, তদুপরি অগণিত বেশরম প্রেমিক-প্রেমিকা যুগলদের সঙ্গসুখ লাভ করি।
বলে রাখা ভাল যে আমার এই দুই বেলার দুই রকম ভ্রমণব্যবস্থার কারণটা একটু অন্যরকম। একটি প্রাচীন সারমেয় প্রতিদিন সকালে আমার ভ্রমণসঙ্গী। তাকে ভিক্টোরিয়া ঢুকতে দেয় না, তাই সকালে তাকে নিয়ে ব্রিগেডের মাঠে হাঁটি। আর ছুটির দিনের সায়াহ্নে ভিক্টোরিয়ার বাগানে আমি একা একটু ঘুরি। কাঠের বেঞ্চিতে বসে একটু দেবদারুর হাওয়া খাই, মানুষজন দেখি, তাদের টুকরো কথাবার্তা শুনি।
এই বাগানেই আরও বহু লোকের সঙ্গে যেমন করে নানা সূত্রে আলাপ-পরিচয় হয়েছে, একদিন নিবারণবাবুর সঙ্গেও তাই হল।
দক্ষিণ পশ্চিম প্রান্তের পুকুরের ধারে দেবদারুবীথির মধ্যে একটা কাঠের বেঞ্চিতে বসেছিলাম। এই বেঞ্চটাই অপেক্ষাকৃত নিরাপদ, ঠিক সরাসরি ওপরে কোনও বৃক্ষশাখা নেই তাই পাখিরা বসে কোনও কুকর্ম করতে পারে না আবার ওই জন্যেই একটু খোলামেলা বলে প্রেমিক-প্রেমিকাঁদের এ বেঞ্চটা। তেমন পছন্দ নয়। গাছের আড়াল না হলে তাদের ভালবাসা জমে না।
সে যা হোক, ছুটির দিনের সন্ধ্যা তাই সেদিন শার্টপ্যান্ট নয়, আমার পরনে ছিল ধুতি-পাঞ্জাবি, তাও সাধারণ কোনও ধুতি-পাঞ্জাবি নয়, রীতিমতো রেয়নের ধুতি আর নকশি ফুলতোলা রেশমের পাঞ্জাবি।
কঠোর কার্পণ্যই আমার এই সুবেশের কারণ। আমার নিজের কোনও ভাল জামাকাপড় নেই, ধুতি-পাঞ্জাবির প্রশ্নই ওঠে না। টেরিকটনের দু-একটা প্যান্টশার্ট আছে আর আটপৌরে পোশাক বলতে পাজামা আর হাফশার্ট সম্বল।
ওই রেশমি পাঞ্জাবি আর রেয়নের ধুতি আর সম্প্রতি লাভ করেছি। ব্যাপারটা এ কাহিনিতে প্রক্ষিপ্ত, তবু সূত্রপাত হিসেবে একটু লিখছি।
বল্লভপাড়া গ্রামীণ সমবায় ব্যাঙ্কের কর্মকর্তা খন্দকার আলাউদ্দিন খান আমার বন্ধু, পুরনো ক্লাসফ্রেন্ড। অনেককাল আগের কথা, আলাউদ্দিন আর আমি একই বছরে দুজনে একই বিষয়ে একসঙ্গে এম. এ পরীক্ষায় ফেল করেছিলাম। আজকাল কী হয় জানি না, কিন্তু অনন্তকাল আগে সেই পঞ্চাশের দশকে যখন সামান্য আট আনায় ভাত-ডাল-তরকারি-মাছের ঝোল পাইস হোটেলে ভরপেট খাওয়া যেত, এমনকী দামটা বেশি বলে অনেকে মাছটা বাদ দিয়ে সাড়ে পাঁচ আনায় ভরপেট খেত, সেই সময় কেউই বোধ হয় এম. এ. পরীক্ষায় ফেল করত না। কদাচিৎ এক-আধজন, সেই প্রথম একসঙ্গে দুজন এম. এ. ফেল করল, আমি আর আলাউদ্দিন।
বলা বাহুল্য, এর পর থেকে আলাউদ্দিনের সঙ্গে আমার হৃদ্যতা প্রচণ্ড বেড়ে যায় এবং সেই হৃদ্যতা আজও অব্যাহত রয়েছে। আমি আর জীবনে বিশেষ কিছু করতে পারিনি, সম্প্রতি হাসির গল্প লিখে (বেশিটাই বিলিতি হাসির গল্প থেকে বাংলায় টুকে) সামান্য নাম ও পয়সা হয়েছে, কোনও রকমে গ্রাসাচ্ছাদন চলে যাচ্ছে। এদিকে নানা ঘুরপথ ধরে অবশেষে আলাউদ্দিন এখন ব্যাঙ্কের কর্মকর্তা হয়েছে।
আলাউদ্দিনের ব্যাঙ্ক থেকে পঞ্চাশ হাজার টাকার একটা কুচো চিংড়ি চাষের লোন পাইয়ে দিয়েছিলাম গজেন্দ্রকে। ফলতার কাছে একটা গ্রামে একটা শ্যাওলা ভরা কুঁচো চিংড়ির পুকুর এক। বছরের জন্যে ইজারা নিয়েছিল গজেন্দ্র, সে আমার পিসতুতো ভাইয়ের দূর সম্পর্কের শালা। সে হিসেব করেছিল ওই কুঁচো চিংড়িগুলো তিন মাসে বাগদা চিংড়ি হবে এবং এক বছরের মধ্যে গলদা চিংড়ি হবে, এতে লাভ হবে দশ গুণ। তা অবশ্য হয়নি কারণ পরে জানা গিয়েছিল কুঁচো চিংড়ি কখনও বাগদা চিংড়িতে কিংবা বাগদা কখনও গলদায় পরিণত হয় না। এর একেকটার একেক জাত, তা ছাড়া ওই পুকুরে সবটাই কুঁচো চিংড়ি ছিল না অনেকগুলোই ছিল ব্যাঙাচি, যথাসময়ে তারা লেজ পরিত্যাগ করে চারপায়ে জল থেকে লাফ দিয়ে ডাঙায় উঠে অদৃশ্য হয়ে যায়।
আলাউদ্দিনের ব্যাঙ্ক থেকে পঞ্চাশ হাজার টাকার লোনের পুরোটা অবশ্য গজেন্দ্র হাতে পায়নি। আলাউদ্দিনকে ফিফটি-ফিফটি মানে পঁচিশ হাজার তদুপরি কেরানি, ক্যাশিয়ার, পিয়ন, দারোয়ান এমনকী ব্যাঙ্কের দরজায় যে নেড়ি কুকুরী শুয়ে থাকে তার লেড়ে বিস্কুট, ধারে ফর্মের ফোটো, এফিডেভিট ইত্যাদি বাবদ সবসমেত একচল্লিশ হাজার চারশো বত্রিশ টাকা বাইশ পয়সা ব্যয় করতে হয়। অবশেষে পঞ্চাশ হাজার টাকার মধ্যে যখন সাকুল্যে তার হাতে হাজার সাড়ে আট টাকা আসে। এবং সেই সঙ্গে কুঁচো চিংড়িগুলো বাগদা বা গলদা না হয়ে ব্যাঙ হয়ে পালিয়ে যায় সে মরিয়া হয়ে ওঠে এবং দুটি কাজ করে বসে। এক, একটি দুর্মূল্য রেয়ন ধুতি কিনে আমাকে উপহার দেয় এবং দুই, নিজে আত্মগোপন করে, এরপর থেকে তার আর কোনও খোঁজ পাওয়া যাচ্ছে না।
