আমরা দুজনে একই এলাকার বাসিন্দা হলেও, জটিলেশ্বরবাবু আমার ঠিক প্রতিবেশী নন।
পাড়ার মধ্যখানে একটা ছোট পার্ক। আমাদের এই নব-উপনগর সল্টলেকে এর নাম গ্রিন ভার্জ (Green Verge)।
এই গ্রিন ভার্জের উত্তর-পূর্ব প্রান্তে আমার বাসা। আর, দক্ষিণ-পশ্চিম কোনায় ফ্ল্যাট বাড়ির একতলায় জটিলেশ্বরবাবুর বসবাস।
আমাদের এই পার্কের ঠিক মধ্যখানে একটা বকুল গাছ, বেশ লম্বা-চওড়া। বয়েস বেশি না হলেও ঝাঁপিয়ে বেড়ে উঠেছে। এই গাছটার নীচে বিশেষ বিশেষ দিনে পতাকা উত্তোলন হয়, দোলে-পঁচিশে বৈশাখে জমায়েত হয়, গানবাজনা হয়। কিন্তু মাঠের ঠিক মধ্যখানে হওয়ায় পাড়ার ছেলে মেয়েদের খেলাধুলার, বিশেষ করে ফুটবল খেলার খুবই অসুবিধে হয়।
সে যা হোক বড় রাস্তা থেকে পাড়ার মধ্যে প্রবেশ করতে গেলে, যাঁরা পার্কের পাশে থাকেন তাঁরা সাধারণত পার্কের পাশের রাস্তা দিয়ে না হেঁটে পার্কের মধ্য দিয়ে হেঁটে বকুল গাছটার নীচ দিয়ে শর্টকাট করেন। আমাদের বাড়িতে আসতে অবশ্য পার্ক পেরোতে হয়। পার্কের মুখেই আমাদের বাড়ি।
তবে কোনাকুনি গেলে বড় রাস্তা থেকে বাড়িতে যাতায়াতের পথ জটিলেশ্বরবাবুর জন্য কিছুটা শর্টকাটের সুবিধে হয়।
শর্টকাট প্রসঙ্গেই জটিলেশ্বরবাবুর সঙ্গে আমার প্রথম আলাপ। বেশ কয়েকমাস আগের কথা।
তখন জটিলেশ্বরবাবু সদ্য পাড়ায় এসেছেন। মাত্র দুয়েকবার রাস্তাঘাটে দেখেছি।
লক্ষ করেছি নতুন ভদ্রলোক প্রতিদিনই রাত দশটা-সাড়ে দশটা নাগাদ একটু বেসামাল অবস্থায়। বাড়ি ফেরেন। পা রীতিমতো টলমল করে।
তা আজকাল, বিশেষত আমাদের এই পাড়ায় পানদোষীর কোনও অভাব নেই। আমি নিজেও এ দোষ থেকে সম্পূর্ণ মুক্তি নই। তবে আমার অনেক বেশি আসক্তি গুণ্ডিপানে। প্রতিদিন সন্ধ্যাবেলা ওই গুণ্ডিপান, বাংলাদেশে যাকে বলে দোক্তাপান ফুলবাগানের মোড়ে এসে ওড়িয়া ঠাকুরের দোকান থেকে গোটা চারেক খিলি কিনে নিয়ে যাই।
চুয়া-চন্দন, ছোট এলাচ দেয়া কড়া তামাকের গুণ্ডি তার মেজাজ-মৌতাত আলাদা।
নৈশাহার শেষ করে প্রত্যেকদিনই আমি গুণ্ডিপান নিয়ে বাড়ির বাইরের বারান্দায় ঘুমোতে যাই। যাওয়ার আগে বেশ কিছুক্ষণ বসে থাকি। তারিয়ে তারিয়ে দোক্তামিশ্রিত পানরস উপভোগ করি। আমার বাড়ির সামনে দিয়েই পার্কের মধ্য দিয়ে পায়ে চলার পথ বকুল গাছতলা দিয়ে বিপরীত দিকে চলে গেছে। প্রথম যেদিন জটিলেশ্বরবাবুর সঙ্গে পরিচয় হল সেদিন ওই রাত সাড়ে দশটা নাগাদ দেখলাম টালমাতাল অবস্থায় মাঠের মধ্যে নামলেন রাস্তা থেকে। তারপর টলতে টলতে কোনাকুনিভাবে বাড়ির দিকে রওনা হলেন।
তারপর আর খেয়াল করিনি। আমি আপন মনে পানরসে নিমজ্জিত হয়ে পাশের বাড়ির টিভিতে তে ‘আজ জ্যোৎস্না রাতে সবাই গেছে বনে’ শুনছিলাম। সেদিন অবশ্য জ্যোৎস্না মোটেই ছিল না, বেশ অন্ধকার। দূরে চারপাশের চারটি টিমটিমে আলোয় পার্কের ভেতরটা খুব আবছায়া। আমি তন্ময় হয়ে পান চিবোচ্ছিলাম এবং গান শুনছিলাম। এমন সময় হঠাৎ একটা আর্ত চিৎকারে পরিবেশ ভেঙে গেল।
বুঝলাম চিৎকারটা আসছে মাঠের মধ্যখানে বকুল গাছটার নীচ থেকে।
কী জানি কোনও ছিনতাই-টিনতাইয়ের ব্যাপার নাকি! এ পাড়ায় যদিও ব্যাপারটা খুব স্বাভাবিক নয়, তবুও কত কী ঘটতে পারে।
তাড়াতাড়ি মাঠের মধ্যে বকুলতলার দিকে ছুটে গেলাম। এদিক-ওদিক আশপাশের বাড়ি থেকে আরও কয়েকজন ছুটে এলেন।
গিয়ে দেখি বকুলতলায় গড়াগড়ি খাচ্ছেন পাড়ায় নবাগত ওই ভদ্রলোক, তাঁর কপাল ফেটে গেছে, দরদর করে রক্ত পড়ছে।
ধরাধরি করে ভদ্রলোককে, পরবর্তীকালে ব্যক্তিগতভাবে আমি যাঁর গোপন নাম রেখেছি সেই জটিলেশ্বরবাবুকে আমরা সবাই মিলে তাঁর বাড়িতে নিয়ে গেলাম।
কপালে আয়োডিন দিয়ে ব্যান্ডেজ করে ভদ্রলোককে বাসায় বিছানায় শুইয়ে দিলাম।
জটিলেশ্বরবাবু বোধহয় অবিবাহিত কিংবা বিপত্নীক, বাড়ি ঘর দেখে তাই মনে হল। বাড়িতে থাকার মধ্যে এক বৃদ্ধ ভৃত্য, সে লোকটি আবার কালা মানে কানে খাটো।
আমরা ইতোমধ্যে বুঝে গেছি যে জটিলেশ্বরবাবুকে কেউ আক্রমণ করেনি, তা হলে অন্তত। পার্কের মধ্যে দিয়ে দৌড়ে পালাতে তাদের বা তাকে দেখা যেত। রক্তাক্ত জটিলেশ্বরবাবু ভূমিশয্যায় একাই পড়েছিলেন। ধ্বস্তাধ্বস্তির যেসব স্বাভাবিক চিহ্ন থাকে, তাও ছিল না।
সে যা হোক, ব্যাপারটা তিনিই খোলসা করলেন।
জটিলেশ্বরবাবু বললেন, পার্কের মধ্যখানে দুটো বকুলগাছ রয়েছে তো। সেই গাছ দুটোর মধ্য দিয়ে তাড়াতাড়ি হেঁটে আসতে গিয়ে কী করে যে একটা গাছের সঙ্গে মাথায় ঠোক্কর খেয়ে পড়ে গেলাম, কপালটা ফেটে গেল।
আমরা একটু অবাক হলাম।
দুটো বকুল গাছ?
দুটো বকুল গাছ দেখলেন কোথায়?
ওখানে তো একটা গাছ।
আমরা একেকজন একেকরকম বললাম।
জটিলেশ্বরবাবু অধিক অবাক হয়ে বললেন, সে কী ওখানে দুটো গাছ নেই!
তারপর একটু থেমে, কিঞ্চিৎ চিন্তা করে আপন মনেই বললেন, কাল সকালে পরীক্ষা করে দেখতে হবে। এতটা ভুল দেখলাম!
জটিলেশ্বরবাবুর মুখ দিয়ে মদের গন্ধ বেরোচ্ছিল। আমরা আর বিরক্ত না করে যে যার বাড়িতে ফিরে এলাম।
ফেরার পথে পার্কের মধ্যে হাঁটতে হাঁটতে আমরা ঘটনাটা পর্যালোচনা করছিলাম। আমরা ভালমতোই বুঝে গিয়েছিলাম যে মদে চুরচুর হয়ে বাড়ি ফেরার পথে তিনি আবছায়া অন্ধকারে একটা গাছকে দুটো গাছ দেখেছেন এবং তারই ফাঁক দিয়ে গলতে গিয়ে এই ভয়াবহ বিপত্তি।
