তিন সপ্তাহের আগাম নোটিশ লাগিবে।
বর্ষাকালে তিনদিনের নোটিশেও হইবে।
ঠিক এরই নীচে ছোট ছোট অক্ষরে লেখা, গ্রাহকদের প্রতি নিবেদন:
বড় মেঘ প্রতিপালন করা অতি
কষ্টসাধ্য ব্যাপার।
বড় মেঘ পুষিতে যাইবেন না।
ঘর সংসার তছনছ করিয়া দিবে।
ইহা অপেক্ষা বুনো মোষ কিংবা
গণ্ডার পোষা ভাল ॥
সবসুদ্ধ প্রায় তেরো-চোদ্দটি পোস্টার হয়েছে। একটা পুরনো পঞ্জিকা খুলে বিজ্ঞাপন দেখে দেখে ছোটসাহেব প্ল্যাকার্ডগুলো লিখেছেন। তাই যেমন রয়েছে:
সকল প্রকার মেঘের সব রকম দুরারোগ্য
এবং প্রাচীন ব্যাধির চিকিৎসা করা হয়।
ঠিক তেমনিই একটা বিজ্ঞাপনে স্পষ্ট করে বলা আছে, এটা অবশ্য পঞ্জিকা থেকে টুকে নয় বাজারের রাস্তায় কুড়িয়ে পাওয়া একটা হ্যান্ডবিল থেকে ছোটসাহেব বানিয়েছেন:
মেঘশিশুদের নার্সারি বিদ্যালয়।
আর মাত্র অল্প কয়েকটা সিট
খালি আছে।
০৩.
আজ ছোটসাহেবের কথা অক্ষরে অক্ষরে মিলেছে। মেঘেরা তাদের মালিককে এতদিনে চিনতে শিখেছে।
এ কদিন এত মেঘবৃষ্টির পর আজ সারাদিন পরিষ্কার আকাশ। রোদ ঝলমলে দিন।
দুর্গারানী খুব খুশি। কাসুন্দি-আচারের বয়ামগুলো সারাদিন ছাদে খুব ভাল রোদ পেয়েছে। ডালের ধামায় মুগ, ছোলা এসব তোলা ছিল, সেগুলিতে ছোট ছোট কালো বর্ষার পোকা হয়েছে। রোদ্দুরে দিয়ে সেগুলো তাড়ানো হয়েছে। এদিকে ভাড়ার ঘরে ডাল খুঁজতে গিয়ে এক বড় পেতলের কলসি ভর্তি চাল বেরিয়েছে। চাল ভাঙানোর পর কিছুটা দুর্গারানী অদিনের জন্য আলাদা করে সরিয়ে রাখে, তা মনে ছিল না। আজ চালটা পাওয়ায় সে খুব খুশি।
সকালবেলাই সব জামাকাপড়, ধুতি-চাদর, মায় ছোটসাহেবের মশারি গরম জলে সেদ্ধ করে সাবান দিয়ে কেচে দিয়েছে দুর্গারানী। সেগুলো ছাদে পতপত করে উড়ছে। মশারিটা তো নৌকার পালের মতো ফুলে ফুলে বাতাস কাটছে। শরৎকালের নীল আকাশের নীচে সাবেককালের বাড়িটা এক বড় পানসি নৌকোর মতো দেখাচ্ছে।
ছোটসাহেব তাঁর খাটের নীচ থেকে পোস্টারগুলো বার করেছেন।
আজ শনিবার। পুজোর আগে ভাদ্রমাসের শেষ হাটবার। এ সময় হাটে ভিড় বাড়ে।
ইছামতী নদীর ধারে গোপালগ্রামের পুরনো হাট। নদীর এপার ওপার থেকে দুগাঁয়ের মানুষ কেনাবেচা করতে আসে।
সেই হাটের একপাশে একটু উঁচু মতন ফঁকা জায়গা দেখে ছোটসাহেব নরম মাটিতে প্ল্যাকার্ডগুলো পুঁতে দাঁড় করিয়ে দিলেন।
গ্রামের লোকেরা জমিদারবাড়ির ছোটসাহেবকে ভাল করেই জানে। কিন্তু মেঘের ব্যাপারটা জানত না। ধীরে ধীরে ভিড় বাড়তে লাগল। সবাই এসে অন্তত একবার পোস্টারগুলো পড়ে যাচ্ছে। যারা কিছু বুঝতে পারছে না, নিজেদের মধ্যে বলাবলি করছে, কালে কালে আর কত দেখব? মেঘ পর্যন্ত বিক্রি হচ্ছে। আবার কেউ বলছে, মেঘেরা কি মানুষ হয়ে গেল নাকি? এদের খাবার জোগাবে কে?
দুর্গারানী সংসারের সাপ্তাহিক তেলমশলা, আনাজপাতি কিনতে হাটে এসেছিল। ফেরার পথে দেখে এক জায়গায় বিরাট ভিড়। ভিড় ঠেলে ভিতরে ঢুকে অবাক হয়ে দেখে ছোটসাহেব প্ল্যাকার্ডগুলো নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে।
দুর্গারানী যখন জামাকাপড়, আচারকাসুন্দি নামাতে ছাদে উঠেছিল তখন বিজ্ঞাপনগুলো ঘাড়ে করে ছোটসাহেব বেরিয়ে এসেছে।
প্ল্যাকার্ডগুলোয় কী লেখা আছে সেটা সবটা না বুঝলেও দুর্গারানী কিছুটা বোঝে। ছোটবেলায় বিয়ের আগে ছাত্রবৃত্তি পরীক্ষায় পাশ করেছিল সে।
ছোটসাহেবের প্ল্যাকার্ডের ব্যাপারটা যে এতদূর গড়াবে সেটা সে কল্পনাও করতে পারেনি।
দুর্গারানীকে দেখে ছোটসাহেব খুশিই হবেন, কী দুর্গাদি, কেমন বুঝছ?
দুর্গারানী জিজ্ঞেস করল, তুমি এখানে কী করছ?
ছোটসাহেব বললেন, উপার্জন। তুমি বলেছিলে না উপার্জন করতে।
মাটির ওপর থেকে খুঁটিপোঁতা প্ল্যাকার্ডগুলো তুলতে তুলতে দুর্গারানী বলল, উপার্জনের নিকুচি করেছে। তুমি করবে উপার্জন?
ছোটসাহেব চারদিকে তাকিয়ে বললেন, এই তো কত ভিড় হয়েছে। এরা কি কেউ একটা মেঘ কিনবে না? একটা মেঘের চিকিৎসা করাবে না? একটা মেঘের বাচ্চার লেখাপড়া করাবে না?
দুর্গারানী ততক্ষণে সব প্ল্যাকার্ডগুলো গুটিয়ে ফেলেছে। এবার ছোটসাহেবকে কড়া গলায় ধমক দিল, চলো। বাড়ি চলো। মেঘের কদর বোঝে এমন একটাও লোক এখানে নেই।
ছোটসাহেব কী বুঝলেন কে জানে। গুটি গুটি দুর্গাদির পিছুপিছু বাড়ি রওনা হলেন। সবগুলি প্ল্যাকার্ডই দুর্গারানী কাঁধে তুলে নিয়েছে। শুধু একটা রয়েছে ছোটসাহেবের হাতে। তাতে লেখা:
যত হবে উদ্বেগ।
কালো হবে সাদা মেঘ ॥
যত যাবে উদ্বেগ।
সাদা হবে কালো মেঘ ॥
জটিলেশ্বর
আমি ভদ্রলোকের নাম দিয়েছি জটিলেশ্বর। অবশ্যই মনে মনে নিজের কাছেই এই গোপন নামকরণ।
জটিলেশ্বর নামে মুখোপাধ্যায় পদবির এক বিখ্যাত গায়কের প্রতি সম্পূর্ণ শ্রদ্ধা রেখেই এই নামকরণ।
ভদ্রলোকের অবশ্যই রাম-শ্যাম, আজিজ বা সিরাজ এই রকম কোনও সাধারণ নাম আছে, কিন্তু তাঁর চিন্তা, কথাবার্তা এবং চালচলনের বিচিত্র জটিলতাই আমাকে এই নামকরণে বাধ্য করেছে।
.
এই জটিলেশ্বরবাবুর সঙ্গে খুব ঘনিষ্ঠ পরিচয় এখনও আমার গড়ে ওঠেনি। কখনও গড়ে উঠবে কি না সে বিষয়েও যথেষ্ট সন্দেহ আছে। তাঁর মতো লোকের ঘনিষ্ঠ হওয়া শুধু কঠিন নয়, বিপজ্জনক।
আমি আর জটিলেশ্বরবাবু একই পাড়ার অধিবাসী। বড়জোর বছরখানেক হল তিনি আমাদের এলাকায় এসেছেন। খুব সম্ভব সরকারি চাকুরে, মফসসলের কোথাও থেকে বদলি হয়ে কলকাতায় এসেছেন।
